Breaking news
সাহিত্য

সাহিত্যালোচনা

বন্ধুত্বের করকমলে

ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
ড. শাখাওয়াৎ নয়ন অধ্যাপক সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
জুলাই ১৯, ২০২৬ • 0
বন্ধুত্বের করকমলে
বন্ধুত্বের করকমলে

(প্রথম পর্ব)

একদিন সম্পর্কের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারটা অদ্ভুত! সেখানে আলু-পেঁয়াজ, কাপড়-চোপড়, সোনা-রুপা কিছুই বিক্রি হয় না। শুধু সর্ম্পক। ছোট ছোট দোকানে সাজানো আছে মানবতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব, আত্মীয়তা, স্বার্থ, ক্ষমতা, যেন মানুষের জীবনকে টুকরো টুকরো করে তুলে রাখা হয়েছে।

 

একজন দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মাথা তুলে তাকাল—

কী চাই?

আমি বললাম—

একটু সর্ম্পক।

সে হেসে বলল—

কোনটা? মানবতার, না ভালোবাসার? বিশ্বাসের, না ব্যবসার?

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম—

বন্ধুত্বের।

লোকটা তখন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। যেন বহুদিন পরে কোনো বিলুপ্ত শব্দ শুনেছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল—

জনাব, পৃথিবী এখনো যে কটা কারণে টিকে আছে, বন্ধুত্ব তার মধ্যে একটা। কিন্তু দুঃখিত, এই জিনিসি বিক্রির জন্য নয়।

 

সেদিন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে হচ্ছিল, লোকটা বোধহয় সত্যি কথা বলেছে।

 

চারপাশে কত মানুষ! বিমানবন্দরে মানুষ, রেলস্টেশনে মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ, অফিসে মানুষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ। মানুষ আর মানুষ। কিন্তু বন্ধু?

বন্ধু যেন বর্ষার দিনে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একা কদমগাছ। আছে কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না।

 

প্রবাসে এসে এই অভাবটা আরও বেশি টের পাই। একেক দিন শরীর ভালো থাকে না; একেক দিন মন। আবার কোনো কোনো দিন দুটোই ভালো থাকে না।

 

সেই দিনগুলোতে খুব ইচ্ছে করে পাশে বসে কেউ নির্বিকার মুখে এক কাপ চা খেতে খেতে বলুক—

তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর শেষ দিন আজ। তারপর দুজন মিলে হাসতে হাসতে পৃথিবীর শেষ দিনটাও পার করে দেয়া যেত।

 

এখানে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে খয়েছি, গল্প করেছি, লং ড্রাইভে গিয়েছি, ইউরোপের পুরোনো শহরে হাঁটাহাঁটি করেছি, আমেরিকার সরল রেখার মতো দীর্ঘ মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্ত দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পরিচয় হয়েছে অনেক, বন্ধুত্ব হয়নি তেমন।

 

আজকাল সর্ম্পকগুলো কেমন যেন মোবাইল ফোনের অ্যাপের মতো। ডাউনলোড করা যায় সহজে, আবার ডিলিট করাও সহজ।

 

একটি অপছন্দের মন্তব্য।

একটি ভিন্ন মত।

একটি না-পছন্দ সিদ্ধান্ত।

ব্যস, সম্পর্কের সমাপ্তি।

তখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে।

তারা ছিল অন্য রকম।

আমাদের কাছে তখন পৃথিবী ছিল ছোট।

কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল বিশাল।

আমাদের জাতিসংঘ ছিল না, ছিল বন্ধুসংঘ।

আমাদের পাখা ছিল না, কিন্তু উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল।

ঘাসফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ানোর সময় ছিল।

আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় ছিল।

বৃষ্টির শব্দ শোনার সময় ছিল।

কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্না গুনে গুনে ভোর করে দেয়ার সময় ছিল।

আমরা তখন জানতাম না পৃথিবী কত জটিল!

জানতাম না মানুষ একদিন এত ব্যস্ত হয়ে যাবে।

শুধু জানতাম, বিকেলে মাঠে দেখা হবে।

এই জানাটুকুই যথেষ্ট ছিল।

আজ বুঝি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিস নয়, সময় হারায়।

আমি বাংলাদেশকে যতটা মিস করি, তার চেয়েও বেশি মিস করি বাংলাদেশের কিছু সময়কে।

ঝুমবৃষ্টির দুপুর।

বর্ষণমুখর সন্ধ্যা।

শীতের সকাল।

ডিমভরা পুঁটি মাছ ভাজা ঘ্রাণ।

ধানখেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া বিকেল।

আর মিস করি সেই সব মানুষকে যাদের সঙ্গে কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যেত।

 

একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল—

বাংলাদেশে যাচ্ছি, তোর জন্য কী আনব?

আমি বলছেলিাম—

যদি পারিস, চৈত্রদিনের একটা ঘুঘু-ডাকা দুপুর নিয়ে আয়।

সে ভেবেছিল আমি মজা করছি।

আসলে করিনি।

মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন সে বস্তু নয়, মুহূর্ত সংগ্রহ করতে চায়।

আমাদেরও মনে হয় সেই সময় এসেছে।

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতেও কোনো ঘড়ি ছিল না।

আম্মা শুকতারা দেখে ভোরের সময় আন্দাজ করতেন।

তারপর আমাকে ডাকতেন।

আমি আধোঘুমে চোখ খুলে বলতাম—

এখনো তো অন্ধকার।

আম্মা বলতেন—

আগে শুরু কর বাবা। পড়তে পড়তে সব আলো হয়ে যাবে।

বহু বছর কেটে গেছে।

আমি এখনো পড়ছি।

কতটুকু আলো হলো জানি না।

তবে এটুকু বুঝেছি, মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আলোগুলো বই থেকে আসে না।

আসে মানুষ থেকে।

বন্ধু থেকে।

ভালোবাসা থেকে।

স্মৃতি থেকে।

 

এই যে আজ এত দূরে বসে আছি, হাজার হাজার মাইল দূরে, তবু কোনো কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে হয়, ক্যাম্পাসের কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।

বন্ধুরা পাশে আছে।

কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে।

কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিচ্ছে।

কেউ আবার অবলীলায় পকেট থেকে শেষ দশ টাকা বের করে সবাইকে চা খাওয়াচ্ছে।

সেই সব বিকেল কোথায় গেল?

কোথায় গেল সেই মানুষগুলো?

আমরা কি সত্যিই বড় হয়ে গেছি?

নাকি শুধু দূরে সরে গেছি?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় বুঝেছি।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ সম্পর্কগুলো অনেক সময় নিয়মিত যোগাযোগে বেঁচে থাকে না।

বেঁচে থাকে বিশ্বাসে।

কোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয় না।

তার পরও গভীর রাতে ফোন করলে সে বলবে—

বল, কী হয়েছে?

এবং এই একটি প্রশ্নই যথেষ্ট।

কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্বের অভিধানে ‘কেন’ শব্দটা খুব কম থাকে।

সেখানে থাকে শুধু—

‘আমি আছি।’

 

[চলবে]

 

0 Comments

Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

সাহিত্য

View more
ফেরা

দিনটা শুরু হয়েছিল সূর্যের মিষ্টি রোদ দিয়ে। হালকা বাতাস, পাখিদের ডাক, প্রকৃতির ছোঁয়া—সব মিলিয়ে সুন্দর একটি পরিবেশ। প্রতিদিনের মতোই একটি মেয়ে সেজেগুজে বের হয়েছিল। কাজলবিহীন চোখ, আর চোখের পাশে একটি তিল—সেই তিলটাই তার অহংকার।   সারা দিনের ব্যস্ততার মাঝে আজকের দিনটা একটু অন্য রকম। কারণ, আজ সে একটা ফোন কলের অপেক্ষায় ছিল।ফোনটা আসবে সেই মানুষটার, যার জন্য সে এক কঠিন পরিস্থিতি একা লড়াই করে জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছিল। যে নতুন অধ্যায়ের নাম সে দিয়েছিল—অপেক্ষা।   ভালোবাসা প্রমাণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে অপেক্ষা। একটি ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য যুগ যুগ অপেক্ষা করা যায়—এটা বইতেই মানায়। কিন্তু আসল জীবনে সেটা সব প্রেমিকা পারে না। আর যারা পারে, তারাই ইতিহাস হয়ে যায়। এ গল্পে যে মেয়েটি অপেক্ষায় আছে, সে ইতিহাসের অপেক্ষায় নেই। সে ইতিহাস হতে চায় না। সে শুধু তার পূর্ণতাকে চায়। আর সেই পূর্ণতার জন্যই সে অপেক্ষা করে।    মেয়েটি অফিস যাচ্ছিল। প্রতিদিনের মতো লোকাল বাসে উঠল, জানালার পাশে একটা সিটও পেয়ে গেল। মেয়েটির পছন্দের গান ছিল, ‘আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি...’। গানটা সে সব সময় শুনত। বাসে বসে সেদিনও শুনছিল।শুনতে শুনতে তার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল। যে দিনগুলো সে পার করে আজকের এই দিনটার অপেক্ষা করছে। এই ফোন কলটার অপেক্ষা করছে।   সেই দিনটা ছিল এ রকম... আর পাঁচটা প্রেমকাহিনির মতোই আমার গল্পটাও। হঠাৎ করেই বাসা থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। কেউ আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করল না, আমি বিয়ে করতে চাই কি চাই না। আমার কোনো কথাই কেউ শুনল না। তবে একটা বিষয় আলাদা ছিল। আলাদা ছিল কারণ, আমার মানুষটা আমাকে বিয়েটা করে নিতে বলেছিল।   সে তখন বেকার ছিল। তাই আমার পরিবারের সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহসটা তার ছিল না। আমাকে নিয়ে যাবে, এই কথাটা বলার সাহসটাও ছিল না। একসমুদ্র কষ্ট বুকে নিয়ে সে আমাকে বলেছিল, “বিয়েটা করে নাও।” কিন্তু আমার পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না।   আমার অনেক অভিমান হয়েছিল। কারণ তার কী আছে, কী নেই, সেটা জেনে তো আমি তার হাতটা ধরিনি। আমি হাত ধরেছি, মানে হাত ধরে থাকব। তার হাত শূন্য হোক বা ভরা, সেটা আমার কাছে কিছু যায় আসে না। হাত ধরেছি মানে, শেষ পর্যন্ত ধরে থাকব—সেটা যেমনই হোক।   সেই রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের রাত ছিল। আমি সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। আমার একটা অভ্যাস আছে—আমি রাগ করলে, কষ্ট পেলে খেতে পারি না। সেদিন রাতেও আমি খাইনি। আমি একটু কান্না করলেই আমার চোখ খুব ফুলে যায়। কিন্তু সেদিন চোখ ফেটে কান্না আসা সত্ত্বেও আমি কান্না করিনি। কারণ, পরদিন ছেলেপক্ষ আসবে।   আমি জানতাম না, আমি আর ফিরে আসতে পারবো কি না। তার পরদিন একটা গোল্ড আর গোলাপি রঙের শাড়ি, গয়না বের করা হলো। বের করে আমার সামনে রেখে বলল, “পছন্দ হয়েছে? না অন্যটা দেব?” আমি কিচ্ছু বলিনি। একটু হেসে মুখটা নিচু করে ফেললাম। তারা হয়তো এটাই ভেবেছিল, আমার পছন্দ হয়েছে। আমি খুশি। কিন্তু আমার ভেতরে কী চলছে, সেটা আমি ছাড়া কেউ জানে না।   সেদিন তার সাথে আমার আর কোনো কথা হয়নি। আমি যোগাযোগও করিনি। করতে চাইওনি। কারণ, আমার একটাই অভিমান তার সাথে—তাকে আমি আমার এই দিনে পাশে পাইনি।   আয়োজনটা বাসায় করা হয়নি। রেস্টুরেন্টে করা হয়েছিল। একটা রেস্টুরেন্ট বুক করা হলো। আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন গেল। ওনারা এলো। আমাকে যখন গাড়িতে তোলা হয়, আমি গাড়িতে উঠে বসে আল্লাহকে উদ্দেশ করে বললাম, হে আল্লাহ, সবকিছু তোমার হাতে। তুমি যদি না চাও তাহলে কখনোই কোনো কিছু হওয়া সম্ভব না। আবার তুমি যদি চাও, তুমি তো তাকদিরও পরিবর্তন করতে পারো।   এতটুকুই বলেছি শুধু। আমি আর কিচ্ছু ভাবিনি। ক হবে, না হবে—কিচ্ছু না। তার পরের প্রতিটি ঘটনা আমার একপলকে যেন শেষ হলো। আমি হয়তো সবকিছু ঝাপসা দেখছিলাম। কী হচ্ছে, না হচ্ছে—কিচ্ছু আমার খেয়াল নেই।   আমাকে ছেলের সাথে আলাদা কথা বলার জন্য বলা হলো। আমি বলতে চাইনি। কিন্তু ছেলে আগ্রহ করেছিল, তাই আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হলো। আমি যখন যাচ্ছি, তখনো আমার মনে হয়নি আমি ওনাকে কী বলব। আমার কোনো কথাই গোছানো ছিল না। আমি শুধু ওনাকে গিয়ে বলে দিয়েছি, আমি এই বিয়েতে রাজি না। উনি আর একটা কথাও আমাকে বলেননি। উনি শুধু বললেন, "ঠিক আছে।"   তারপর সবকিছু নরমাল ছিল। উনি ওনার পরিবারকে কিছু বুঝতে দেননি। আমাদের পরিবারকেও কিছু বুঝতে দেননি। তারপর আমরা চলে এলাম। তারপর কীভাবে সে ম্যানেজ করল, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি জানতেও চাইনি। আমি শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম—আমি ফিরেছি। আমি ফিরতে পেরেছি। আমি সেই মানুষটার জন্যই ফিরেছি, যে আমার হাত ছাড়তে রাজি হয়ে গিয়েছিল।   তারপর সে একদিন দেখা করতে চাইল। কিন্তু আমি জানি না দেখা করে কী হবে। সব কি আগের মতো হবে? সব কি ঠিক হয়ে যাবে? নাকি আমি তাকে ঠিক করে নেব? কিচ্ছু জানি না।   মনে অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে গিয়েছিলাম দেখা করতে। আমার ভেতরে তখনো সেই অভিমানটা ছিল। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, সে কি এখনো আমার হাতটা ধরতে চায়? সেদিন তার চোখে আমি আমার জন্য পানি দেখেছিলাম, যেটা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।   একটা পুরুষের চোখ দিয়ে সহজে পানি পড়ে না, এটা আমি জানি। আর যদি পড়ে, সেটা অনেক আঘাতের পরই পড়ে। সে অনেক চেষ্টা করেছে আমার থেকে পানিটা আড়াল করতে, কিন্তু পারেনি। এটা দেখার পর আমি আর কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। ভাবিওনি, তার হাত আবার ধরতে হবে কি হবে না। আমি শুধু জানি, আমি যার জন্য ফিরেছি, তার কাছেই আমাকে থাকতে হবে—যেকোনো মূল্যে।   তারপর সেই গানটাও শেষ হয়ে গেল, ‘আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি.. ‘। আমি আমার অফিসেও পৌঁছে গেলাম। কিন্তু মনটা তখনো ওখানেই পড়ে আছে। বাসে, কানে হেডফোন, আর ওই গানটা—সবকিছু যেন এখনো কানে বাজছে।   আমি অপেক্ষা করছিলাম। শুধু একটা ফোন কলের অপেক্ষায়। আজকে তার স্বপ্নের চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। তার স্বপ্ন পূরণের চাকরি। গতকাল রাতে সে আমাকে বলেছিল, “যদি চাকরিটা পাই, তাহলে তোমাকে ওই গানটা গেয়ে বলব, “চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ, এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না...”   ওই গানটা গেয়েই সে আমাকে জানাবে বলেছিল। আমি আজ অনেক খুশি ছিলাম। সকাল থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম, যেন সে চাকরিটা পেয়ে যায়। যেন আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ হয়। আমি এখনো সেই ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করছি...   ফোনটা বেজে উঠলেই যেন আমার সব অপেক্ষার অবসান হবে। তারপর দুপুরের দিকে হঠাৎ সে আমাকে ফোন দিল। কলটা পেয়েই আমি ছুটে গেলাম ফোনটা ধরতে। ফোনটা ধরে সে আমার নাম ধরে ডাকল, আর তারপর চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, সে চাকরিটা পেয়ে গেছে।   সেদিন আমরা দুজন জীবনের সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম। আমার মনের মধ্যে আলাদা একটা সাহস চলে এলো। মনে হলো, এবার আর কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। আমাদের স্বপ্নগুলো এবার সত্যি হবে। তবে তার চাকরিটা এমন ছিল, যে আমরা চাইলেও এখন বিয়ে করতে পারব না। কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিছু বছর। এই বছরগুলো যেন আমার কাছে একেকটা পাহাড় মনে হচ্ছে।   আমি তো আমার সবকিছুর সাথে যুদ্ধ করে ফিরে এসেছিলাম তার কাছে। এবার তার পালা। দেখা যাক, সে ফেরে নাকি...

অক্টোবর ২০, ২০২৬ 0

শান্তি দেবীর পুকুর

ধোঁয়া, বই এবং বিদ্রোহ

বিশ্বাসের নৌকা

রাফিয়া জান্নাত

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২৩তম আবেদন আর ১১তম ভাইভা শেষে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে জজকোর্টে ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদের চাকরিটা হলো। অনেকেই হয়তো বলবে পিয়নের চাকরি! কেউ নাক সিঁটকাবে, কেউ করুণা দেখাবে। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়া একটি ছেলের কাছে এই চাকরিটাই যেন সোনার হরিণ।   কোর্টে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে। কেউ ন্যায়বিচারের আশায়, কেউ মুক্তির আশায়, কেউ শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে আইনজীবীর ফি দিতে। দুঃখ দেখতে দেখতে এখন অভ্যস্ত।   একদিন দুপুরে আদালতের বারান্দার বাইরের বেঞ্চে বসে থাকা দুজন মানুষের দিকে চোখ গেল। দুজনই নিশ্চুপ। মুখে ক্লান্তি, চোখে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অপেক্ষা। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। কথা বলতে বলতেই জানলাম, একজন রাফিয়া জান্নাতের ভাই, আরেকজন তার ছোট ছেলে। ছেলেটির বয়স মাত্র আট বছর।   রাফিয়া জান্নাত বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তার পর থেকেই তিনি একা, অসহায়, মানুষের অবহেলা আর সমাজের বিদ্রূপ বয়ে বেড়াতেন। পাঁচ মাস আগে খবর আসে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথাই লেখা হয়। দাফন-কাফন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু চার দিন পর একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসে।   ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে বাজারের নির্জন কোণে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এস আলম রাফিয়ার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন। এরপর তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে সাজিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়।   রাফিয়ার ভাই মামলা করেন। মাসের পর মাস আদালত, থানা, আইনজীবী, সাক্ষী—এক অনন্ত দৌড়ঝাঁপ পেরিয়ে অবশেষে শুনানির দিন আসে। কিন্তু আদালতে বলা হলো, ভিডিওটি নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথাই রয়েছে। এস আলম নির্দোষ প্রমাণিত হলেন।   সেদিন আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে রাফিয়ার ভাই শুধু একবার বলেছিলেন, ‘গরিবের সত্যের কোনো সাক্ষী থাকে না’। তাঁর কণ্ঠে রাগ ছিল না। ছিল শুধু ভাঙা মানুষের ক্লান্তি। সেই দীর্ঘশ্বাসটা সারা দিন কানে বাজছিল।   দুদিন পর শুনলাম, টানা আদালতের দৌড়ঝাঁপে অসুস্থ হয়ে এস আলম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্যালাইন চলছে। পরদিন সকালেই আরেকটি খবর ছড়িয়ে পড়ল। এস আলম মারা গেছেন। কেউ বলল, হৃদরোগে। কেউ বলল অতিরিক্ত মানসিক চাপ। আবার কেউ ফিসফিস করে বলল, আল্লাহর বিচার।   কে জানত, সেই রাতেই মুখে মাস্ক পরা এক যুবক এস আলমের কেবিনে ঢুকে স্যালাইনের নলে কী যেন পুশ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ছটফট করতে করতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। যুবকটি দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তাকে যে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে—সকালে জজকোর্টে ডিউটি আছে। সে যে সামান্য এক অফিস সহায়ক!  

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

কে তুমি

ভালোবাসা চোখের ছিল

রুক্ষ শহর

কাশফুলের চিঠি

কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই সুন্দর যেমন ডুবে যাওয়া সূর্য, হাওয়ায় দোলা কাশফুল। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, তবু ছুঁই না— তাই মুগ্ধতাটুকু হারিয়ে যায়।   সূর্য ডোবে, আকাশ রাঙে শেষ আলোয় কিছু বিষণ্ণতা লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার আড়ালে। সবকিছু ধরে রাখাই ভালোবাসা নয় কিছু ভালোবাসা দূরত্বেই বেঁচে রয়।   কিছু মানুষ আসে শরতের কাশফুল হয়ে কিছু স্মৃতি থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে। সময় চলে যায়, মানুষও হারিয়ে যায় শুধু কিছু অনুভূতি নীরবে থেকে যায়।   কাশফুল শেখায় কোমল হতে সূর্যাস্ত শেখায়—বিদায়েও সৌন্দর্য থাকে। কিছু দৃশ্য ছবিতে বন্দি হয় আর কিছু সারা জীবন হৃদয়েই রয়ে যায়।  

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0

কুসুম বনের জ্যোৎস্না

শরতের ছোঁয়া

আমার পৃথিবী