সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের রাজ্য সাজেক উপত্যকা, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলরাশি আর নীলাচল-নীলগিরির নৈসর্গিক রূপকথা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে প্রকৃতির আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত সুউচ্চ পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল ও বন্য ঝরনা শুধু পর্যটকদের মনই ভোলায় না, বরং ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এটি দেশের সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই রূপসী সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
একদিকে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির তোরণ, অন্যদিকে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যু। এ দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ জাতীয় নিরাপত্তার এক মহা-কৌশলগত সংযোগস্থল।
পর্যটন সম্ভাবনার দিক দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির এক উদীয়মান চালিকাশক্তি হতে পারে। রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা, ঝুলন্ত সেতু, বান্দরবানের দেবতাখুম, আলীকদমের মারায়ং তং এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা ও তারেং প্রতিবছর কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা সৃষ্টি করছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) নীতি অনুসরণ করে এ অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম ও সামাজভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটালে স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব। বিশেষ করে, পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, অর্গানিক কৃষি এবং কটেজ ইন্ডাস্ট্রির সঠিক প্রসারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে।
অপার পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও বিকাশের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্র বাস্তবতা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। চুক্তিপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষ পাহাড়ে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সীমান্ত সড়কসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও উপদলীয় কোন্দলের কারণে PCJSS (মূল), PCJSS (সংস্কার), UPDF (মূল), UPDF (গণতান্ত্রিক) এবং সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশ কিছু নতুন সশস্ত্র উপদলের উত্থান ঘটেছে। দেশের মূলধারার আইনি কাঠামো স্পর্শ না করে সশস্ত্র সহিংসতার পথ বেছে নেয়া এসব সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের অবৈধ কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার প্রবণতা পাহাড়ের সাধারণ জনজীবনকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।
আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় জনমানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করছে না, বরং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটনের গতিকেও থামিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য, পর্যটনবাহী যানবাহন, ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গৃহস্থালি থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে আধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র কেনাই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পর্যটন ও অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় জায়গায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্পে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করেন এবং বিপুল সম্ভাবনাময় একটি অর্থবহ অর্থনৈতিক জোন বারবার হোঁচট খাচ্ছে।
এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বর্তমানের চেয়ে আরও ব্যাপক হওয়া জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মিয়ানমারের সাথে ২৮৩ কিলোমিটার এবং ভারতের সাথে বিশাল দুর্গম সীমান্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র, অস্ত্র চোরাচালানি কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো যাতে পাহাড়ে আস্তানা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করে নিরাপত্তা বাহিনী। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থার সুরক্ষাদান এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবির সার্বক্ষণিক সতর্ক নজরদারির বলেই হাজার হাজার পর্যটক প্রতিদিন দুর্গম পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে সক্ষম হন।
বহিঃশত্রুর হুমকি এবং আঞ্চলিক সীমান্ত সংঘাতের নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিধি ও কৌশলগত নজরদারি আরও ব্যাপক আকারে বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে জান্তা সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (আরাকান আর্মি) মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে দুর্গম সীমান্ত এলাকা ও গভীর বনাঞ্চলে ড্রোন প্রযুক্তি, থার্মাল ইমেজিং ও আধুনিক নিরাপত্তা চৌকির পরিধি বাড়ানো আবশ্যক। অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশদ্বার বন্ধ করতে এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্রের একটি প্রধান কৌশলগত দায়বদ্ধতা।
পাহাড়ের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও দ্বিমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত স্থানীয় সকল বাংলাদেশি অধিবাসীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে সকল প্রকার সশস্ত্র ও চাঁদাবাজ সংগঠনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনার দরজা খোলা রেখেও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে সমূলে উৎপাটন করা ছাড়া পাহাড়ে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ত্রিবেণী সংগম ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতা ত্যাগ করে দেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতর ফিরে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কড়া নজরদারি এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সহযোগিতায় পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি পুরোপুরি বন্ধ হলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপার ভূমি হয়ে উঠবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতির এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে। বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল। গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি। বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’। বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।” বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।” বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি... ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।” আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব। এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?” আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।” চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।” এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম। সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে। এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর। বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।” বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম। হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।
শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়। কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ। চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা। এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।
একসময় বিকেল নামলেই ছেলে-মেয়েদের হাতে দেখা যেত বই। কেউ গল্পের বই নিয়ে বারান্দায় বসত, কেউ পরীক্ষার পড়া শেষ করে ডুবে যেত কোনো উপন্যাসের পাতায়। বইয়ের পাতার শব্দে, কাগজের গন্ধে, চরিত্রগুলোর সঙ্গে কল্পনার ভ্রমণে কেটে যেত দীর্ঘ বিকেল। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। হাতে বইয়ের বদলে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন। চোখ আটকে থাকে ছোট্ট একটি পর্দায়, আর আঙুল ছুটে চলে এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে। প্রযুক্তির এই সময়কে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কয়েক সেকেন্ডেই পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য দরজাও খুলে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তথ্যের এত দরজা খুলে যাওয়ার পরও আমরা কি বইয়ের দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিচ্ছি? সমস্যাটি শুধু বই না পড়ার নয়; সমস্যাটি মনোযোগ হারানোরও। একটি বই পড়তে হলে দীর্ঘ সময় একই জায়গায় মন রাখতে হয়। একটি চরিত্রের সঙ্গে হাঁটতে হয়, একটি ঘটনার ভেতর ঢুকতে হয়, কখনো লেখকের একটি বাক্য নিয়ে থেমে ভাবতে হয়। বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট আমাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নতুন কিছু দেখার অভ্যাস তৈরি করছে। ফলে ধৈর্য ধরে দীর্ঘ লেখা পড়ার মানসিকতা অনেকের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজকের তরুণের হাতে তথ্যের অভাব নেই। বরং তথ্যের আধিক্যই কখনো কখনো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্চ করলেই উত্তর পাওয়া যায়, ভিডিও দেখলেই কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যায়। কিন্তু তথ্য জানা আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। তথ্য আমাদের জানায় ‘কী’; বই অনেক সময় আমাদের ভাবতে শেখায় ‘কেন’ এবং ‘তারপর কী’। বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। একটি ভালো উপন্যাস শুধু গল্প বলে না; মানুষের মন বুঝতে শেখায়। একটি ইতিহাসের বই শুধু অতীতের ঘটনা জানায় না; বর্তমানকে বোঝার চোখ তৈরি করে। একটি দর্শনের বই সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। আর কবিতার একটি পঙক্তি কখনো কখনো এমন অনুভূতির দরজা খুলে দেয়, যার অস্তিত্ব আমরা নিজের মধ্যেই আগে টের পাইনি। পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও কিছু ভূমিকা আছে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বই মানেই পরীক্ষার বই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়া যেন অতিরিক্ত কাজ। পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার চাপ, কোচিং, অ্যাসাইনমেন্ট এবং নানা ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে আনন্দের জন্য বই পড়ার সময়টুকু হারিয়ে যায়। অথচ শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম হয়, তাহলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অপূর্ণ থেকে যায়। পরিবারের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু বই পড়বে কি না, তা শুধু তার ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে না। সে যদি ঘরে বড়দের বই পড়তে দেখে, বই নিয়ে আলোচনা শোনে, তাহলে তার মধ্যেও পাঠের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পরিবারের সবাই যদি অবসর পেলেই মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে, শিশুর কাছে বইকে আকর্ষণীয় করে তোলা কঠিন। তবে প্রযুক্তিকে বইয়ের শত্রু হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। বরং প্রযুক্তিকে বইয়ের সহযোগী করা সম্ভব। এখন ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও ডিজিটাল প্রকাশনার মাধ্যমে বই পড়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি। একজন চাইলে নিজের মোবাইল ফোনেই হাজার হাজার বই বহন করতে পারে। প্রয়োজন শুধু ব্যবহারের অভ্যাসটি বদলানো। প্রশ্ন হলো, আমরা দিনে কত সময় পর্দার দিকে তাকাই এবং তার কতটুকু সময় বইয়ের জন্য রাখি? দশ মিনিটের একটি ভিডিও দেখতে দেখতে কখন যে এক ঘণ্টা চলে যায়, আমরা অনেক সময় টেরই পাই না। অথচ দশ মিনিট বই পড়তে বসলে ঘড়ির কাঁটা যেন হঠাৎ ধীর হয়ে যায়। এই অভ্যাসের পরিবর্তনটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হতে পারে। প্রতিদিন মাত্র পনেরো বা বিশ মিনিট বই পড়া দিয়ে শুরু করা যায়। প্রথমে হয়তো মন বসবে না। কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই মোবাইল হাতে নিতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু অভ্যাস তৈরি হলে বইয়ের জগৎ ধীরে ধীরে নিজের দরজা খুলে দেয়। তখন বই পড়া আর দায়িত্ব মনে হয় না; বরং দিনের কোলাহল থেকে কয়েক মুহূর্তের আশ্রয় হয়ে ওঠে। একটি প্রজন্ম কোন বই পড়ছে, তা দিয়ে শুধু তার সাহিত্য রুচি বোঝা যায় না; বোঝা যায় সে পৃথিবীকে কীভাবে দেখতে শিখছে। বই মানুষের ভেতরের জন্য জায়গা তৈরি করে। যে মানুষ কোনো গল্পের চরিত্রের দুঃখে কাঁদতে পারে, সে বাস্তব জীবনের মানুষের কষ্টও হয়তো একটু গভীরভাবে অনুভব করতে শেখে। তাই বই থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে শুধু লাইব্রেরির একটি তাক থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। কখনো কখনো এর অর্থ হতে পারে নিজের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের একটি দরজা বন্ধ করে দেয়া। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন পৃথিবী আমাদের ক্রমাগত কথা শোনাচ্ছে; বই আমাদের সেই ভিড়ের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরব হতে শেখায়। হয়তো আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনটি সরিয়ে ফেলতে হবে না। শুধু তার পাশে একটি বই রাখতে হবে। স্ক্রল করার ফাঁকে একদিন যদি আমরা একটি পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর দুটি, তারপর দশটি, তাহলেই হয়তো পরিবর্তনের শুরু। কারণ, বই কোনো পুরোনো অভ্যাস নয়। বই এমন এক নীরব বন্ধু, যে আমাদের সময় নেয় ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় একটি গভীরতর মন, বিস্তৃততর পৃথিবী এবং নিজের ভেতর তাকানোর সাহস।
সমাজ মানুষের সম্মিলিত জীবনব্যবস্থা। মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, বিপদে সহযোগিতা করবে, সুখে-দুঃখে অংশীদার হবে—এটাই একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজের মূল ভিত্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজে নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা আধুনিক হয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হয়েছে, শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। অথচ প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই আগের চেয়ে বেশি মানবিক হতে পেরেছি? বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে, ইন্টারনেট আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। কিন্তু একই ঘরে বসবাস করেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব দেখা যায়। কাছের মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে, আর দূরের মানুষের সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনেছে, কিন্তু কোথাও কোথাও হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়নও সমান জরুরি। একজন মানুষ কত টাকা উপার্জন করেন, কত বড় বাড়িতে থাকেন কিংবা কত দামি গাড়িতে চলেন—এসব দিয়ে তাঁর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর আচরণে, তাঁর বিবেকবোধে, তাঁর সততায় এবং অন্য মানুষের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতায়। আজ সমাজে অসহিষ্ণুতা দিন দিন বাড়ছে। সামান্য মতের অমিল থেকেই অনেক সময় সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন মত দেখলেই কেউ কেউ অশালীন মন্তব্য করেন। অথচ মতের পার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয়। একজনের মতের সঙ্গে আরেকজনের মত না-ও মিলতে পারে। কিন্তু তাই বলে কাউকে অপমান করা, হেয় করা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা কোনোভাবেই সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না। আমাদের পরিবারগুলোতেও মূল্যবোধের শিক্ষা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একটি শিশু প্রথম শিক্ষা পায় পরিবার থেকে। বাবা-মায়ের আচরণ, কথা বলা, অন্যকে সম্মান করা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ছোটদের প্রতি ভালোবাসা—এসবই শিশুর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানকে শুধু ভালো ফল করার জন্য চাপ দিলেই হবে না; তাকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষিত কিন্তু মূল্যবোধহীন মানুষ সমাজের জন্য কখনো কখনো বোঝা হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়াবেন না; তার নিজের আচরণও শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে হবে। সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, মিথ্যা, অন্যায় ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। আমরা প্রায়ই অন্যের দুর্নীতির সমালোচনা করি, কিন্তু নিজের ছোটখাটো অনিয়মকে স্বাভাবিক বলে মনে করি। এই দ্বৈত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবর্তন চাইলে প্রথমে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। অন্যকে সৎ হওয়ার উপদেশ দেয়ার আগে নিজের জীবনে সততার চর্চা করা প্রয়োজন। মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে। অর্থ ছাড়া সংসার পরিচালনা করা কঠিন। কিন্তু অর্থই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি সম্পর্ক, ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিকতার মূল্য বুঝতে হবে। একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্ত কাউকে সাহায্য করা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেয়া কিংবা একজন দরিদ্র শিশুর পড়াশোনায় সহযোগিতা করা—এসব কাজ হয়তো ব্যাংক হিসাবে টাকা বাড়ায় না, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সম্মান বাড়ায়। বর্তমান সমাজে নারীর প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীকে শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে। নারীর মতামত, অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে পুরুষের প্রতিও দায়িত্ব ও সম্মানের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া থাকলে অনেক সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব। প্রবীণ মানুষদের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। যাঁরা জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবার ও সমাজের জন্য ব্যয় করেছেন, বার্ধক্যে তাঁদের একাকিত্বে ফেলে রাখা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। সন্তানদের উচিত বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। একইভাবে সমাজের অসহায়, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারেও আমাদের সচেতন হতে হবে। যাচাই না করে কোনো সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া, গুজব ছড়ানো কিংবা কারও ব্যক্তিগত সম্মান ক্ষুণ্ন করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারও মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অন্যের সম্মান রক্ষার দায়িত্বও রয়েছে। আমাদের দেশ তরুণদের দেশ। তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। তাই তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে ছুটলে হবে না; দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদক, অপরাধ, সহিংসতা ও হতাশা থেকে তরুণদের দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়। এই দায়িত্ব আমাদের সবার। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে, প্রশাসন আইন প্রয়োগ করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা দেবে—কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে একটু সচেতন হই, অন্যকে সম্মান করি, মিথ্যা ও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিই, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং সন্তানদের মানবিকতার শিক্ষা দিই, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবেই। বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট ছোট ভালো কাজ থেকেই শুরু হয়। আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু উন্নত রাস্তা, বড় ভবন কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি নয়; প্রয়োজন উন্নত মনন ও মানবিক হৃদয়। উন্নত সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানুষের আচরণ। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের ভেতর থেকে পরিবর্তনের শুরু করি। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি এবং মানবিক মূল্যবোধকে জীবনের অন্যতম প্রধান আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু তার অর্থনীতি দিয়ে মাপা যায় না; মাপা যায় সেই দেশের মানুষ কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও মানবিক তার ওপর।
একসময়ের খাল-বিল, পুকুর ও জলাভূমির নগরী ঢাকা আজ অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এর ফলে শহরটিতে মারাত্মক পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। একদিকে কংক্রিটের কারণে বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশ করতে না পারায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর জ্যামিতিক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে, অন্যদিকে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসকে পানির তীব্র সংকটে পড়তে হচ্ছে। এই ভয়াবহ দ্বিমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ঢাকার হারিয়ে যাওয়া পুকুর উদ্ধার এবং নতুন জলাশয় খনন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আরডিআরসির (RDRC) ২০২১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রায় ২০০০ পুকুর ছিল, যা বর্তমানে কমতে কমতে মাত্র ২৪১টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্যমতে, একটি শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ১২-১৫ শতাংশ এলাকায় জলাশয় থাকা বাধ্যতামূলক, অথচ ঢাকায় বর্তমানে তা ২-৫ শতাংশেরও নিচে। পানির স্তরের অবনমন অত্যন্ত উদ্বেগজনক; ১৯৯৬ সালে পানির স্তর গড়ে ২৫ মিটার গভীরে থাকলেও ২০২৪-২৫ সালের ডেটা অনুযায়ী তা ৮৬-৯০ মিটার বা তারও নিচে নেমে গেছে (বার্ষিক অবনমন হার ২-৩ মিটার)। সিঙ্গাপুর ২০০৬ সালে ‘অ্যাকটিভ, বিউটিফুল, ক্লিন (এবিসি) ওয়াটারস’ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে জলাশয় সংরক্ষণে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। চীন ২০১২ সালের বেইজিং বন্যার অভিজ্ঞতার আলোকে ২০১৫ সাল থেকে ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে। ঢাকার জলাশয় বাঁচাতে হলে করণীয় ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক ধাপে (২০২৬-’২৯) ঢাকার ১১৩টি খাস পুকুরের শতভাগ সংস্কার এবং অতিরিক্ত ৫০-৭০টি ছোট পুকুর খনন করতে হবে। পরবর্তী ৫ বছরে এটি ২৫০-৩০০টিতে উন্নীত করতে হবে। বৃষ্টির পানি নিচে পাঠাতে পুকুরে ‘রিচার্জ শ্যাফট’ এবং অগ্নিনির্বাপণের জন্য ‘পাম্পিং সাকশন পয়েন্ট’ যুক্ত করতে হবে। পুকুরপাড়ে হিজল, জারুল, নিমগাছ লাগিয়ে হাঁটার পথ তৈরির পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে লার্ভাখেকো মাছ চাষে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এ ছাড়া যেসব হাউজিং সোসাইটি জলাশয় সংরক্ষণ করবে, তাদের হোল্ডিং ট্যাক্সে ছাড় দেয়ার নীতি প্রণয়ন করার মাধ্যমে উৎসাহিত করা যেতে পারে। দৃঢ় সরকারি নীতি, ফায়ার সার্ভিস ও সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর সমন্বয় এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে ঢাকার জলাশয় সংকট অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব। পরিবেশ রক্ষায় দেরি না করে এখনই কাজ শুরু করা উচিত।