Breaking news
সাহিত্য

নুনজলে ধোয়া মন

শেলী সেনগুপ্তা
শেলী সেনগুপ্তা দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা
সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬ • 0
আজকাল কেউ রুমাল রাখে না
আমি রাখি।

অদক্ষ হাতে সুঁই-সুতোয় কাজ করা 
একটি রুমাল রেখেছি ওয়ালেটে।
        
অপমানিত মন 
নুনজলে ধুয়ে মুছে নিতে
ভুলগুলো সরিয়ে শূন্যতাটুকু   
ভরে নিতে রুমাল রাখি।

কোনো উপলক্ষ নেই
শৃঙ্খলের আশপাশে জমে থাকা 
গ্লানিটা মুছে নেয় রুমাল।

আজকাল কেউ রুমাল রাখে না
আমিই রাখি
রাখি তার ছায়া...


0 Comments

Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

সাহিত্য

View more
শান্তি দেবীর পুকুর

কে যেন একদিন বলেছিল, “একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যা, জীবন সেট। তারপর মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াবি।” মানুষটার নাম মনে নেই। থাকলে আজ তাকে ছোটখাটো একটা অভিযোগপত্র পাঠাতাম। পাখির মতো ওড়ার কথা ছিল, অথচ আমি আছি হলের একঘেয়ে খাবার, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার এক বিশাল খাঁচায়। তার ওপর হাতখরচ চালাতে এক ছাত্রকে পড়াতে যাওয়া। এখানে নিজের জন্য একটু সময় বের করা মানে রীতিমতো বিলাসিতা, আর সে বিলাসিতার সামর্থ্য আমার নেই।   একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটল আজ। রুমমেট হৃদয় আর সামির দুজনই বাইরে, জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে, আর আমি একা। ওরা এত বকবক করে, যেন কথা বলার বিনিময়ে বেতন পায়। অনেক দিন পর এলোমেলো পড়ার টেবিল গোছাতে গিয়ে চোখ আটকে গেল কয়েকটা বইয়ে। স্কুলবন্ধু রেজার দেওয়া উপহার, কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ আর ও. হেনরির ‘দ্য ফোর মিলিয়ন’।   রেজা বইপোকা, আর আমি বইয়ের সঙ্গে ভদ্র দূরত্ব বজায় রাখা মানুষ। ‘মেটামরফোসিস’ আজও ঠিকমতো খোলা হয়নি, তবে ‘দ্য ফোর মিলিয়ন’-এর গল্পগুলো এখনো মনে আছে। বইগুলো যত্ন করে সাজালাম, যেন সাজালেই পড়া হয়ে যায়। তারপর ডায়েরি নিয়ে বসলাম। মোবাইলে হালকা ভলিউমে ছেড়ে দিলাম পিংক ফ্লয়েডের ‘উইশ ইউ ওয়্যার হিয়ার’। বাইরে নামল ঝুম বৃষ্টি।   আমি লিখতে ভালোবাসি। কী লিখব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল ছোটবেলার সেই পুকুরের কথা। শান্তি দেবীর পুকুর। ঠিক করে ফেলেছি, তাই দেরি না করে কলম ধরলাম। ফিরে গেলাম বহু বছর আগের সেই দিনগুলোতে। আমাদের খেলার মাঠ থেকে হাঁটাপথে দু-তিন মিনিট। রাস্তার ধারে সিমেন্ট-ইটে বাঁধানো পাড়, কাচের মতো পরিষ্কার পানি। এক পাশে জঙ্গল, শেষ মাথায় শান্তি দেবীদের বাড়ি আর সিঁড়ি দেওয়া ঘাট। আর ছিল এক ঝাঁকড়া পেয়ারা গাছ, যার ডাল ঝুঁকে থাকত পুকুরের দিকে। মাসি, মানে শান্তি দেবী, আইন করে দিয়েছিলেন, “পুকুরের দিকে ঝুলে থাকা পেয়ারা তোদের। দেয়াল টপকে ভেতরেরগুলোতে হাত দিবি না।” আইনটা পরিষ্কার, আর আমরা ছিলাম আইনের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল নাগরিক।   আমি একমাত্র ছেলে, তাই আদরও বেশি, দুশ্চিন্তাও বেশি। পুকুর গভীর বলে মা সারাক্ষণ ভয়ে থাকতেন। গোসলে দেরি হলেই অফিসে আব্বুর কাছে ফোন চলে যেত। আব্বু রাগী মানুষ। সন্ধ্যায় বাসায় বসত বিচারসভা, দ্রুত, কঠোর, আর রায় সব সময় একই। কতবার যে মার খেয়েছি, তার হিসাব নেই। অপরাধ একটাই, আর তার পুনরাবৃত্তি ঘটত আমার নিজের স্বেচ্ছায়। স্কুল ছুটি হতো সাড়ে বারোটায়। বাসায় এসে ড্রেস খুলেই দৌড়, সোজা মাঠে। ফুটবল ছিল আমাদের নেশা। কাদা মেখে খেলা শেষে শরীর পরিষ্কারের জন্য ছুটতাম পুকুরে। ঝাঁপাঝাঁপি, চিৎকার, আর পুরো রাস্তা ভিজে যেত।   পাড়ের জঙ্গলে ছিল এক পুরোনো নিমগাছ। আমাদের বন্ধু সাগর খাটো, মাথাটা বড়, গলা ফাটা মাইকের মতো। কিন্তু নিমগাছের মাথায় উঠলেই সে হয়ে যেত পর্দার নায়ক। লাফ দেয়ার মুহূর্তে চিৎকার করত, ‘মাচো ম্যান!’ আমরা হাসতে হাসতে এত পানি খেয়েছি যে তার হিসাব নেই। বর্ষার দিনে খেলার মজা ছিল আলাদা। কাদায় মাখামাখি, বৃষ্টির পানি বরফের মতো ঠান্ডা। আর বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল খেলতাম। ঠান্ডায় হাতের তালু আর পায়ের পাতা কুঁচকে যেত বুড়ো মানুষের চামড়ার মতো। আর এ রকম অবস্থায় পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দেয়ার মজাই আলাদা।   পুকুরের পানিতে নামলেই অন্য রকম এক প্রশান্তি ঘিরে ধরত। মনে হতো, এর চেয়ে সুখের জায়গা আর নেই। আসলে ওটা বৃষ্টির পানির চেয়ে একটু উষ্ণ হওয়ায় এমন লাগত। তবে এই স্বর্গসুখ বিনা মূল্যে মিলত না। চড়া দামও দিতে হতো। সন্ধ্যায় গলাব্যথা, তারপর কাশি, তারপর হাড়-কাঁপানো জ্বর। এমনও হয়েছে, কখনো কখনো দশ-বারো জন একসঙ্গে জ্বরে পড়তাম। তখন মাঠ ফাঁকা, ফুটবল নেই, আর শান্তি দেবীর পেয়ারাগাছও একটু বিশ্রাম পেত।   কয়েক দিন পর সবাই ফিরতাম সুস্থ হয়ে। যেন কিছুই হয়নি। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের পথগুলোও আলাদা হতে শুরু করল। কেউ রোজগারের তাগিদে কাজে নামল, কেউ পাড়ি জমাল অন্য শহরে, আর কেউ ডুবে গেল নিজের জীবনের ব্যস্ততায়। দশ-বারোজনের সেই দলটা থেকে একসময় ছাত্র রয়ে গেলাম মাত্র তিন-চারজন। তাও থাকি ভিন্ন ভিন্ন শহরে। আর কেউ ডাক দিত না, “চল মাঠে যাই।” কেউ জিজ্ঞেস করত না, “আজ পুকুরে নামবি?” কখন যে এই ডাক বন্ধ হয়ে গেল, টেরও পাইনি।   লেখালেখি বন্ধ করে লক্ষ করলাম, বৃষ্টি থেমেছে। সন্ধ্যায় মায়ের ফোন এল, দাদার শরীর খারাপ। রাতেই বাড়ি ফিরলাম। ডাক্তার বললেন, বয়সের সমস্যা, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। স্বস্তি পেলাম। পরদিন বিকেলে বন্ধুদের আড্ডায় বললাম, আগামীকাল শুক্রবার, চল সবাই পুকুরে গোসল করব। আর না করলে বলে দে আমাকে কালকেই বাস ধরে ফিরে যেতে হবে। আমার পরীক্ষা সামনে।   আমার কথা শুনে নাঈমের মুখটা হঠাৎ কেমন মলিন হয়ে গেল লক্ষ করলাম। সেখানে একটু গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “তুই জানিস না? জানবি কীভাবে, তুই তো এখানে থাকিস না।” তারপর নাঈমের মুখে একে একে সব শুনলাম। শান্তি দেবীরা পুরোনো বাড়ি বিক্রি করে অন্য পাড়ায় চলে গেছেন। নতুন মালিক পেয়ারা পাড়তে গেলে ছোটদের গালি দেন, ডাল কেটে ফেলেছেন, আর সেই সুন্দর ঘাটে ফেলছেন বাড়ির ময়লা। যেন কেউ পুকুরে গোসল করতে না পারে। আশপাশের কিছু মানুষও তাঁর দেখাদেখি ময়লা ফেলতে শুরু করেছে।   পানিতে এখন দুর্গন্ধ। তারপর সিফাত বিষণ্নতার সাথে বলল, “জানিস দোস্ত, পুকুরটা এক বড় ব্যবসায়ী কিনেছে। ভরাট করছে। উঁচু দালান হবে।” ট্রাকে ট্রাকে বালি আসছে। আমি এসব শুনে কোনো উত্তর দিলাম না। হাতে ধরা চায়ের কাপটা হঠাৎ অনেক ভারী মনে হলো, টেবিলে নামিয়ে রাখলাম। কথাগুলো শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কিছুই বেরোল না। শেষ পর্যন্ত আর কথাও বাড়ালাম না। আড্ডা শেষ করে চুপচাপ বাসায় ফিরে এলাম। রাতে খাবার শেষ করে বিছানায় শুয়ে বারবার মনে হচ্ছে, একবার গিয়ে দেখে আসি, শেষবারের মতো। কিন্তু সাহস হলো না। আমার মনে যে পুকুরটা আছে, সেটার স্বচ্ছ পানি, সিঁড়ি দেওয়া সুন্দর ঘাট, বড় নিমগাছ আর ঝুঁকে থাকা পেয়ারার ডাল।   ময়লা আর বালির ওপর দাঁড়িয়ে সেই শৈশবের পুরোনো স্মৃতি আমি নষ্ট করতে চাই না। কিছু জিনিস হয়তো না দেখাই ভালো। শান্তি দেবীর পুকুর হয়তো আর নেই। কিন্তু আমার স্মৃতিতে সে এখনো আগের মতোই আছে। বিকেলের খেলা শেষ করে ধুলোমাখা মাঠ পেছনে ফেলে একদল ছেলে ছুটছে পুকুরের দিকে। তাদের হইচইয়ের মধ্যে থেকে ভেসে আসছে সেই চেনা ডাক, “চল, পুকুরে যাই!” গতকালই তো শান্তি দেবীর পুকুর নিয়ে লিখতে বসেছিলাম। লিখছিলাম আমাদের শৈশবের গল্প। অথচ আজ বন্ধুদের মুখে শুনতে হলো দুঃসংবাদ। এসব ভাবতে ভাবতে রাত অনেক হয়ে গেল। ঘুমাতে হবে। সকালে বাস ধরে আবার ফিরতে হবে জীবনের চেনা ব্যস্ততায়।   এসব নিয়ে মন খারাপ করার সময় হয়তো হবে না, কারণ অপেক্ষা করছে অনেক দায়িত্ব, সামনে পরীক্ষা। তবু সেই ব্যস্ততার ভিড়েও মনের কোথাও রয়ে যাবে শান্তি দেবীর পুকুরপাড়ে কাটানো শৈশবের দিনগুলো। নিজেকে শুভরাত্রি জানিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।  

অক্টোবর ২০, ২০২৬ 0

ধোঁয়া, বই এবং বিদ্রোহ

বিশ্বাসের নৌকা

রাফিয়া জান্নাত

কে তুমি

মনের আঙিনায়, চোখের জানালায় কে যেন প্রতিদিন উঁকি মারে। নিঃশব্দে এসে হৃদয়ে ঢেউ তোলে, এলোমেলো করে দেয় ভাবনার জগৎ। তার কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই—তবু সে ভীষণ চেনা।   একদিন সাহস করে বললাম, কে তুমি? বলো না, তুমি কি আমার প্রিয়তমা? ওপাশ থেকে ভেসে এলো মিষ্টি হাসি, “যাকে এতদিন ধরে খুঁজছ, সে তো তোমার হৃদয়েই লুকিয়ে আছে!” আমি অবাক হয়ে আয়নায় তাকালাম। ঠোঁটে হাসি, চোখে বিস্ময়। তবে কি সে আমার কল্পনার রানি, নাকি সত্যিই আসবে কোনো এক বসন্তের বিকেলে?   উত্তরটা আজও অজানা, শুধু অপেক্ষা রয়ে গেল...    

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

ভালোবাসা চোখের ছিল

রুক্ষ শহর

কাশফুলের চিঠি

কুসুম বনের জ্যোৎস্না

জংলি মেয়ে হারিয়েছে তার নূপুর এক পায়ের সাঁঝের বেলা দীপ হাতে তাই ছুটল বনের পানে ঝুপ ঝাপ টুপ টাপ বৃষ্টি আর বকুনি তার মায়ের দস্যি মেয়ে কখনো কি বারণ কারো শোনে? রাজার ছেলে হবু রাজা ছিল উৎটি পেতে যেই না মেয়ে দৌড়ে এলো আবছা সবুজ খেতে; চুপচাপ গিয়ে ছুটে ধরল চোখটি তার চেপে কোলো মেয়ে গেল চমকে সরম-লজ্জা-রাগে। ছাড়া পেয়ে রাজার ছেলের কানটি দিল মলে চালাক ছেলে মন ভোলাতে ভীষণ রকম পটু পায়রার ছানা চুপটি করে রাখল মেয়ের কোলে। সন্ধ্যা তাদের রাত গড়াল খেয়াল হলো না কারও রাতের তারা ঝলসে গিয়ে রাত হোক আরও। সুখ সুখ চোখমুখ হঠাৎ হলো একি জংলি মেয়ে টেরটি পেল সকলই মেকি! দূর হতে কোন কঠিন গলা এলো ভাসি “কই গেলি তুই ওরে সর্বনাশী!”  

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0

শরতের ছোঁয়া

আমার পৃথিবী

রোদেলা দুপুর