Breaking news
ফিচার

হে নবীন, জাগো

মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয়
মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয় প্রভাষক গলাচিপা, পটুয়াখালী
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ • 0

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নবীন প্রজন্মের ওপর। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজনির্মাতা। তাই নবীনদের জাগরণ শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ।

 

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা রকম চ্যালেঞ্জ। তাই নবীনদের শুধু শিক্ষিত হলেই চলবে না; তাদের হতে হবে জ্ঞানী, বিবেকবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক।

 

শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করতে শেখায়। তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জ্ঞানমূলক বই পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে বিষয়কে বিচার করতে হবে। অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ না করে সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

 

মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বজ্ঞান অর্জনের জন্য অন্যান্য ভাষাও শেখা প্রয়োজন। ভাষা যত জানা যায়, জ্ঞানের তত বেশি দরজা খুলে যায়।

 

সময় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই অলসতা, অকারণ আড্ডা কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে সময় নষ্ট না করে পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, শরীরচর্চা ও আত্মউন্নয়নে সময় দিতে হবে।

 

বড় স্বপ্ন দেখতে হবে, তবে স্বপ্নের সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা। ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে—হোঁচট খাওয়া পরাজয় নয়; পড়ে গিয়ে আর না ওঠাই পরাজয়।

 

জ্ঞান ও অর্থের চেয়ে মানুষের চরিত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্যবাদিতা, সততা, বিনয়, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতাই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

 

লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা না করে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ, মানুষ বড় হয় শুধু অর্থ-বিত্তে নয়, মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে।

 

পিতা-মাতার ত্যাগ ও ভালোবাসার ঋণ অপরিসীম। তাঁদের সম্মান করা, যত্ন নেয়া এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানো সন্তানের দায়িত্ব।

 

শিক্ষকরাও একজন শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের জ্ঞান, শাসন ও পরামর্শ জীবনের সঠিক পথ দেখাতে পারে। তাই পিতা-মাতা ও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নবীনদের জীবনের অন্যতম নৈতিক শিক্ষা হওয়া উচিত।

 

কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুত্বের প্রভাব গভীর। ভালো বন্ধু মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে; অসৎ সঙ্গ তাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।

 

মাদক, নেশা ও অপরাধ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে হবে; যেন প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করি।

 

নিজেকে জয় করাই মানুষের বড় বিজয়। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কথা বলার আগে ভাবতে হবে এবং ভুল হলে ক্ষমা চাইতে শিখতে হবে। নম্রতা ও আত্মসংযম মানুষের সৌন্দর্য বাড়ায়।

 

একই সঙ্গে মানবিক হতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের কষ্ট বোঝা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি।

 

দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়; এটি দায়িত্বশীল কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অন্যায়, অসততা ও দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে পারে।

 

পরিবেশ রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব। বৃক্ষরোপণ, নদী-জলাশয় রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে নবীনদের এগিয়ে আসতে হবে।

 

আজকের নবীনরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের জ্ঞান, চরিত্র, শ্রম ও মানবিকতার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে। তাই হে নবীন, জাগো। জ্ঞানকে করো তোমার আলো, সততাকে করো শক্তি, শ্রমকে করো হাতিয়ার এবং মানবতাকে করো জীবনের আদর্শ। পিতা-মাতাকে সম্মান করো, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো, ভালো সঙ্গ গ্রহণ করো এবং নেশা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকো।

 

মনে রেখো—ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে পাওয়া যায় না, ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে হয়। আজকের ছোট্ট চারাই একদিন মহিরুহ হয়। তেমনি আজকের সচেতন নবীনই আগামী দিনের আলোকবর্তিকা।

 

হে নবীন, জাগো—নিজেকে গড়ো, সমাজকে গড়ো, দেশকে গড়ো।

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

২৪-এর সাতকাহন

শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়।   কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ।   চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা।   এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।  

ফিচার

View more
শরৎ নেমেছে ধরায় সুললিত নীরবতায়

শরৎকাল অনেক আগেই এসেছে। কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারিনি, শরৎ কতটা নেমে এসেছে মোর আঙিনায়। সে খুব সহজে ধরা দেয় না। যদি বনগাছের পাশ দিয়ে না হেঁটে যাই কিংবা ভোরের আলো ফোটার মলিন প্রকৃতির সঙ্গে একটু একাত্ম না হই, তবে সে ধরা দেবে না। চার দেয়ালে বন্দি হয়ে ডাকলেও সে আসবে না। কিন্তু প্রকৃতিতে সে ঠিকই এসে পড়েছে।   আমার নিরবধি ডাক, জননী-জন্মভূমির সম্বোধন—সে কারও ডাকই শুনবে না। এখন সে অবহেলিত। তবু কেন যেন তার আগমনী আভাস শুনতে পাচ্ছি। পাখিদের কিচিরমিচির ডাক শুনতে পাচ্ছি। গ্রীষ্মের কড়া দাবদাহ কিংবা বর্ষার বাদলমুখর দিনের চেয়ে এখন মেঘলা দিনের ভেজা ভেজা প্রকৃতিই শ্রেয়তর লাগে।   আজ আমি শরতের সেই ঢেউ, সেই কাশবনের ফুলের অম্লান অকৃত্রিম গন্ধ অনুভব করছি। প্রজাপতি কিংবা ভ্রমরের আনাগোনাও সুস্পষ্ট। চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখি, ফুল-কাশবনের মধ্যে দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছি। সেই ‘পথের পাঁচালী’র অপু আর দুর্গা ছুটে যাচ্ছে রেল দেখতে, শরতের ঘন কাশবন ডিঙিয়ে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে। মনে হয়, ওরা আমার পাশ দিয়ে ছুটে গেল। সেই অস্পৃশ্য ডাক, কৌতূহলী ভাবনা—সবই যেন শরতের প্রভাতে মিশে আছে। মনে হয়, আমার ছায়ার সঙ্গে হাঁটছে আর দ্রুতপদে শরতের গল্প বলছে।   কাশবনের ভেতর দিয়ে তাদের সেই অবাধ ছুটে চলা যেন বাংলার প্রকৃতিরই এক অনিন্দ্য সৃষ্টি। মনে হয়, আমিও ছুটে যাই কাশবনের ভেতর দিয়ে দূরে কোথাও। কাশবনের ভেতরে সেই দুর্গাপ্রতিমার অনিন্দ্য রূপ দেখতে। যেন প্রকৃতির এক শোভনীয় রূপকায় সৃষ্টি।   সত্যিই শরতের মোহ, শরতের গান, শরতের ভাবার্থ—সবকিছুর মধ্যে এমন এক আকর্ষণ আছে, যা মানুষকে বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন শরৎ এক আবহ নিয়ে আসে, তেমনই বাংলার কথাসাহিত্যে বারবার শরতের দোলা, কাশে কাশে দোলা ফুটে ওঠে। মনে হয়, শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়; বাংলা সাহিত্যিক কল্পনারও এক দীর্ঘস্থায়ী অংশ। প্রকৃতির রূপ কতটা নির্মোহ, কতটা সুন্দর—তাই অকপটে স্বীকার করি।   আজ একটু ঘুম থেকে উঠে শান্ত হয়ে উঠোনের ধারে চুপটি করে বসে ছিলাম। সেই মুহূর্তেই এমন এক স্নিগ্ধ, শীতল বাতাস গায়ে এলিয়ে গেল, মনে হলো আমাকে মুহূর্তেই শান্ত করে দেবে, সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিতে পারে। এই বাতাসের এমন একটি গন্ধ থাকে, যেটা প্রতিবছরের এই সময়টাতে খুব মনে পড়ে—বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া মাঠ-ঘাট, ছোট রাস্তার অলি-গলির ভেজা পাতায় মাখানো কাদা। আঙিনার পাশের বটগাছটার বড় বড় ভেজা পাতার কথাগুলো যেন মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। হাত দিয়ে পাতাটি উঠালেই দেখতে পাওয়া যায় পাতার রেখে যাওয়া গল্প, শরতের গল্প।   হয়তো গ্রাম-শহরতলির কোণে কোণে এখন কাশবনের দোলা দুলছে। গাঁয়ের খেত-মাঠে ভরা জল ধীরে ধীরে কমছে। কচুরিপানা, শেওলা প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে। শোলগাছের পাতাগুলো কেমন যেন চুপসে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তাদের সময় শেষ। ফসল রোপণের জন্য ছেড়ে দিতে হবে তাদের বিস্তার। বিলে তেমন জল নেই। কচুরিপানাগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে একধরনের নীরব, অদৃশ্য পরিবর্তন। খুব সাধারণ দৃশ্য, অথচ আমার চোখে তা নয়নাভিরাম।   যেখানে গেলে আমি খুব সাধারণ স্বপ্ন দেখি—ওই পাখিটা যদি একবার দেখা দেয়, ওই বুনো হাঁসটা যদি একবার কাছে এগিয়ে আসে, ওই সাদা বকটি যদি মাথার ওপর দিয়ে একবার উড়ে যায়, ওই পানকৌড়িটার মাছ শিকারের অপ্রতুল ধৈর্য, ওই দূরের আধো-অনুজ্জ্বল প্রকৃতি—সবই কত সাধারণ! অথচ এই একটি শরতের অপেক্ষায় তারা যেন অধীর আগ্রহে থাকে।   আশ্বিন এসে গিয়েছে। ভাদ্র বিদায়ের পথে। সেই মস্ত বড় তালগাছ, গাছ থেকে তাল পড়া, জলের মধ্যেও কেমন একটা কুঁঠাসা শব্দ হওয়া। সেই তাল কুড়াতে হাঁটুজলে ছুটে যাওয়া, তালের পিঠা খাওয়া, মায়ের হাতের তালের পিঠা। আর অকারণে সারা দিন মাঠে-মাঠে ঘুরে বেড়ানো। গ্রামের এই স্মৃতিগুলো হয়তো সকলেরই আছে। কিন্তু আমার একটু অন্য রকম স্বাদ। আমি সেগুলো তখন থেকেই ভালোবেসে এসেছি। এগুলো যেন আমার নীরব পথের সঙ্গী, আমার সাহচর্য। হয়তো একদিন এগুলো আর পাব না। কিন্তু দিনগুলো আমার খুব মনে থাকবে। সেই কারণেই আজও শরৎ এলেই আমার ভেতরে কোথাও একটা পুরোনো দরজা খুলে যায়। দিগন্তঘেঁষে অদ্ভুত বাতাস নীরবে বয়ে যায়। ছুটে যেতে ইচ্ছে হয় দিকদিগন্তের নানাদিকে।   প্রতিবছর এই সময়টি হাজার লেখক-সাহিত্যিক মানুষের অনুভূতির জায়গা। এটি তাদের কিছু লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। কেউ কবিতা লেখে, কেউ গল্প, কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু শরৎকে একেবারে উপেক্ষা করে থাকা কঠিন।   এটাই বর্ণিল শরৎ। প্রকৃতির এক অনন্য সুন্দর সময়। সে বারবার ডাকে—একবার ফিরে তাকাও। রূপটি সুন্দর হোক বা না হোক, ফিরে তাকাও। শরৎ এমনই একটি মহৎ ঋতু, প্রাণবন্ত উৎসাহের ঢেউ, যে ঢেউ সকলের মনে-প্রাণে বয়ে চলে অবিরাম ধারায়।   দক্ষিণায়নের মৃদুমন্দ বায়ুর ছলছল ঢেউ প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে একেবারে উন্মীলন হয়ে যায়। অজান্তেই শরতের শুভ্র কাশবন পেঁজা পেঁজা মেঘের মতো মাঠে মাঠে দুলে যায়। আকাশে মেঘ থাকে না বললেই চলে। দুই-একটি হাতেগোনা পেঁজা পেঁজা মেঘ নিরুদ্দেশ ঘুরে বেড়ায়। যেন দেখা দিয়েও দেখা দিতে চায় না। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড গরম হয়ে বর্ষার রেশ জুড়ে দেয়। তবু এই সময়ের প্রকৃতিতে অন্য রকম সৌন্দর্য থাকে। সংসারের জগতের কোলাহল থেকে বেরোতে পারলেই প্রকৃতির স্বাদ নেওয়া যায়। একটু দক্ষিণাবেলার হাওয়া গায়ে লাগলেই নতুন এক সৃষ্টিকল্পের উচ্ছ্বাস ভেসে ওঠে। আমাদের দেখতে হবে, ভাবতে হবে, শিখতে হবে।   বাংলাদেশের প্রকৃতি শরতের দেশ। সব ঋতুতেই বিভিন্ন রকম সময় বিরাজ করে, যা প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে এবং প্রত্যেককে জাগতে শেখায়। আমি আবার গ্রামে ফিরে যাচ্ছি। গাঁয়ের কথাই তো বলব। এ জন্যই মনে হয়, আমার গায়ে বেশি জোর। একটা কেমন যেন শক্তি ফিরে পাই। গায়েই যে আমি মানুষ, মাটি-মনের মানুষ।   গাঁয়ে এখন এক অনন্য সুন্দর প্রকৃতি বিরাজ করছে। আর কিছুদিন পরই অতিথি পাখিরা চলে আসবে দক্ষিণের, উত্তরের কিংবা পশ্চিমের বিলগুলোতে। এখন শরতের যে রূপ প্রকৃতিতে বিরাজ করছে, তা এক ভাবার্থ বয়ে আনে। ধীরে ধীরে জল কমছে, বিলের কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণে ব্যস্ততা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঘরে ঘরে অন্য রকম এক আবহ ধ্বনিত হয়। আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার আগমন এই ধরায়। শরতের কাশবনের পথে পথে যেন দেবী দুর্গা পৃথিবীতে আগমন করেন। শ্রীচণ্ডীপাঠের বর্ণিত কাহিনিতে শোনা যায়, দেবী দুর্গা কয়েকটি দিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসে আবার ফিরে যান। এ সময় পূজা-অর্চনা, ভক্তি, পুষ্পাঞ্জলি ও অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়।   এই লোকসংস্কৃতি, লোকজ ধর্মীয় আচারযজ্ঞ—সবকিছুই শরতের এক বৃহত্তর প্রতিফলন। গোধূলিবেলায় পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যায়। সূর্যের আশপাশে লাল মেঘ ঘোরাফেরা করে, যেন রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। ধু-ধু বনপ্রান্তরের ফাঁক দিয়ে সূর্য যখন উঁকি দিয়ে বিদায় নেয়, তখন আমরা আবার নতুন কিছু রচনা করতে উঠেপড়ে বসি। যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের একটি কাহিনি। শরতের জাদু যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই সত্যি। আমি এখনো বুঝতে পারলাম না, শরতের মহামুক্ত প্রকৃতি আসলে কতটা শরৎ!   কাশবন নিয়ে আর কত গল্প বলব? ফুলে ফুলে নুইয়ে পড়ে কাশবনের খেত। শরৎরূপী প্রকৃতি, তুমি আর কত লীলা দেখাবে? জগৎ-সংসারে সবই তো হচ্ছে অপরূপ ধারায়। কেউ দেখে, কেউ দেখে না। যারা দৃষ্টিহীন, তারাও কি শরতের শোভা পায়? তারা কি শরতের ধ্বনি শুনতে পায়? তুমি কি তাদের জন্য অন্য কোনো উপায় রেখেছ? কত প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে।   শরতের রূপকে বলি, তাদের আমি দেখাতে পারি না। আমার লেখা তারা পড়তে পারে না, আমার কথা, আমার ভাষা তারা বুঝতে পারে না। তবে কীসের শরৎ, কীসের রূপ, কীসের আগমনী বার্তা? সত্যিই মনে এক কালি জমে যায়। সেই কালি আবার মুখে চলে আসে লিখতে লিখতে। এটাও কেমন একটা প্রকৃতি, কেমন একটা শরৎ! হয়তো কবিদের কোনো লেখায় আছে কি না, আমার জানা নেই। যদি থেকেও থাকে, তাহলে তাদের জন্য কিছু করে দাও।   সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে শরতের কাদা। শরতের কাদা খুব সুন্দর। বিলের পাড়ে শুকনো কাদার স্তর জমে। সেই জমির মধ্য দিয়ে এক পা এক পা করে হাঁটি। কিছুদূর এগোতেই নরম কর্দমাক্ত কাদার মধ্যে প্রবেশ করি। তখন কেমন যেন এক স্নিগ্ধ, শীতল অনুভূতি পাই। এর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তারা হয়তো ঢের বুঝতে পারে। কাদারও একটা গন্ধ আছে। সেটা সব ঋতুরই। তবে এখন অনেকটা সুন্দর—ঠান্ডা, নরম, কলকলে। সঙ্গে যদি থাকে সবুজ ঘাস, সবুজ পাতা, তাহলে তো কথাই নেই।   বারবার কেন আমরা শরতে গ্রামবাংলার প্রকৃতির মধ্যে ফিরে যাই? কেন সাহিত্যিক, লেখক, কবিরা শরতের মোহমুক্ত নেশায় ডুবে থাকেন? কেন শরতের শারদীয় রূপ বারবার ফুটে ওঠে? কেন কাশবনের দোলায় দোলায় প্রকৃতি মেতে ওঠে? এটাও এক অনন্ত প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে যাই—আমি কী বলছি, কী সৃষ্টি করছি, এর সত্যতা কতটুকু, এর ধ্বনি কতটুকু?  

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত

থিয়েটারের বহুমাত্রিক সত্তা ও যৌথ নান্দনিকতা

কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চাপ বাড়াতে পারে পেটের চর্বি, ভূমিকা আছে কর্টিসলের

হে নবীন, জাগো

একজন মার্কেটিং ও সেলস ম্যানের পেছনের গল্প

সকালটা অন্য সবার মতো তারও শুরু হয়। কিন্তু তার সকালটা একটু আলাদা। অন্যরা যখন অফিসে বসে দিনের পরিকল্পনা করে, তখন সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। কখনো প্রচণ্ড রোদ, কখনো বৃষ্টি, কখনো যানজট—সবকিছুকে সঙ্গী করেই শুরু হয় তার কর্মদিবস।   তার কাজ শুধু পণ্য বিক্রি করা নয়, তার কাজ হলো মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে নিজের কোম্পানি, নিজের পণ্য এবং নিজের যোগ্যতার কথা বোঝানো। কতবার যে শুনতে হয়, ‘আজ লাগবে না’, ‘পরে আসেন’, ‘আপনার পণ্য দরকার নেই’ প্রভৃতি। কখনো কেউ কথা না শুনেই ফিরিয়ে দেয়। তবুও সে থামে না। কারণ, তার পেছনে থাকে একটি পরিবার। মা-বাবার ওষুধ, সন্তানের স্কুলের খরচ, সংসারের বাজার, বাড়িভাড়া—সবকিছুর হিসাব তার মাথায় ঘুরতে থাকে।   অনেক সময় দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় না। তবুও মুখে হাসি রেখে পরের কাস্টমারের কাছে যেতে হয়। বৃষ্টিতে জামাকাপড় ভিজে যায়, রোদে শরীর পুড়ে যায়, পায়ে ব্যথা হয়, তবুও মাস শেষে টার্গেট পূরণ করতে না পারলে কেউ তার কষ্টের হিসাব করে না।   অফিসে হয়তো শুধু একটা প্রশ্ন আসে, “টার্গেট কতটুকু হলো?” কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে না, “সারা দিন কতটা কষ্ট করেছ?” একজন সেলস ম্যানের হাসির আড়ালে তাই অনেক না-বলা গল্প থাকে। প্রতিদিনের প্রত্যাখ্যান, ব্যর্থতা, অপমান আর ক্লান্তিকে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে সে আবার পরের দিন নতুন করে শুরু করে। কারণ সে জানে, তার ব্যর্থতা মানে শুধু তার নিজের ব্যর্থতা নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। তাই একজন মার্কেটিং ও সেলস ম্যানকে শুধু তার বিক্রির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। তার পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে হাজারও প্রত্যাখ্যান, অসংখ্য ঘামের ফোঁটা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এক নিরন্তর সংগ্রাম।   সত্যি বলতে, সেলস ম্যান শুধু পণ্য বিক্রি করে না, সে প্রতিদিন নিজের আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য আর স্বপ্নকে বিক্রি না করে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করে।  

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ 0

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুঁচ ফল

শরীরচর্চায় কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন

শিউলি ঝরা আশ্বিন

নওয়াব ফয়জুন্নেসা : যিনি নিজের আলোয় আলোকিত করেছিলেন বাংলার নারীসমাজ

রক্ষণশীল উনিশ শতকে যখন নারীর পৃথিবী ছিল ঘরের চার দেয়ালে বন্দী, তখনই শিক্ষার প্রদীপ হাতে এগিয়ে এসেছিলেন এক নারী। নিজের সম্পদ, মেধা ও সাহস দিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নতুন পথ। তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও। সবুজে ঘেরা এই জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। আজ থেকে প্রায় দেড় শ বছর আগে এ মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক নারী, যাঁর চিন্তা ও কর্ম তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। তখন সমাজে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা ছিল আরও প্রকট। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে থেমে যাননি ফয়জুন্নেসা। বরং শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার নারীশিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৮৩৪ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্ম ফয়জুন্নেসার। পারিবারিক পরিবেশে থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চার সুযোগ পান। বাংলা, আরবি, ফারসি, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। তবে তাঁর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল কেবল নিজের জ্ঞান বাড়ানোর জন্য নয়। পরবর্তী সময়ে তিনি উপলব্ধি করেন—নারীরা শিক্ষিত না হলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিই তাঁকে ব্যক্তিগত জ্ঞানচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়। ফয়জুন্নেসার সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি নারীশিক্ষার প্রসারে। মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি তাঁদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৮৭৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি পরবর্তীকালে নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়। আজ মেয়েদের স্কুলে যাওয়া স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু উনিশ শতকে একজন নারী নিজ উদ্যোগে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছেন—এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। তিনি যেন নিজের কাজ দিয়েই সমাজকে প্রশ্ন করেছিলেন—জ্ঞান অর্জনের অধিকার থেকে নারীরা কেন বঞ্চিত থাকবে? ফয়জুন্নেসার সমাজসেবার পরিধি ছিল বিস্তৃত। নিজের জমিদারি থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক, পুকুর ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে তাঁর অবদান ছিল। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্যও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর কাছে জমিদারি ছিল কেবল সম্পদ ভোগের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ। ফয়জুন্নেসার পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর সাহিত্যকর্ম। তিনি রচনা করেন ‘রূপজালাল’। উনিশ শতকের একজন মুসলিম নারী হিসেবে সাহিত্যচর্চা করা ছিল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা। ‘রূপজালাল’ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তৎকালীন সমাজ ও নারীজীবনের নানা দিক বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কলমে ব্যক্তিগত অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম ও সমাজবাস্তবতার ছাপ ফুটে উঠেছে। এক হাতে সমাজসেবা, অন্য হাতে কলম—ফয়জুন্নেসার জীবন যেন প্রমাণ করে, নারীর সামর্থ্যকে কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। ফয়জুন্নেসার কাজ ও অবদানের স্বীকৃতি এসেছিল তাঁর জীবদ্দশাতেই। ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী রানি ভিক্টোরিয়া তাঁকে ‘নওয়াব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। একজন বাঙালি মুসলিম নারীর জন্য এই স্বীকৃতি ছিল সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ইতিহাসের বিচারে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো রাজকীয় উপাধি নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়েছে মানুষের জন্য করা তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে। ফয়জুন্নেসার জীবনকে শুধু একজন জমিদার নারীর জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সময়ের সামাজিক বাস্তবতাকে বুঝেছিলেন এবং সেই বাস্তবতার পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তিনি জানতেন, একটি মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে শুধু একজন মানুষকে শিক্ষিত করা নয়; বরং একটি পরিবারকে, একটি প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা। এই চিন্তাই তাঁকে নারীশিক্ষার জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সময় বদলেছে। বাংলাদেশের মেয়েরা আজ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসকসহ নানা পেশায় নারীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। এই পরিবর্তন এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে বহু মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম ও উদ্যোগ। সেই পথের প্রাথমিক পর্যায়ের সাহসী নারীদের একজন নওয়াব ফয়জুন্নেসা। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় কোনো ক্ষমতা প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় দূরদর্শী চিন্তা, সাহস এবং মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা। ১৯০৩ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণীর জীবনাবসান হয়। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু তাঁর আদর্শের মৃত্যু নয়। পশ্চিমগাঁওয়ের সেই নারী আজও বেঁচে আছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তাঁর সাহিত্যকর্মে, তাঁর সমাজসেবার স্মৃতিতে এবং সবচেয়ে বেশি—নারীশিক্ষার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তার বাস্তবতায়। উনিশ শতকের এক রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি যে প্রশ্নটি তুলেছিলেন, আজ তার উত্তর আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের লাখো শিক্ষিত নারীর জীবনে। তাই নওয়াব ফয়জুন্নেসা শুধু ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি এমন এক আলোকবর্তিকা, যার আলোয় পথ চলেছে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারী।

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0

ডেঙ্গুর চিকিৎসায় নিঃস্ব হচ্ছে পরিবারগুলো

এক দিনের জন্য যদি সবাই সত্য কথা বলত

অধরা স্বপ্নের প্রবাসজীবন