গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। আর সেই গণমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত অংশ হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকরাই সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, দুর্যোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং উন্নয়নের বাস্তব চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যাঁরা সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের জীবনই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে আবদ্ধ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন, তখন একজন মফস্বল সাংবাদিক ছুটে যান ঘটনার কেন্দ্রস্থলে। নিজের নিরাপত্তা, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেন; যাতে মানুষ সঠিক খবর জানতে পারে। গুজব থেকে দূরে থাকে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে। এই দায়িত্ববোধই সাংবাদিকতাকে একটি মহান পেশায় পরিণত করেছে।
তবে দুর্যোগের সংবাদ সংগ্রহের চেয়েও কঠিন কাজ হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করা। একজন মফস্বল সাংবাদিক যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কিংবা স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় নানা ধরনের চাপ। কখনো হুমকি, কখনো সামাজিক অপপ্রচার, কখনো শারীরিক হামলা, আবার কখনো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে তাঁকে নীরব করার চেষ্টা করা হয়। এতে শুধু একজন সাংবাদিক নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকারও।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মফস্বল সাংবাদিকের নেই নিয়মিত সম্মানী, নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা কিংবা ঝুঁকির সময় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। দীর্ঘদিন একটি সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করেও অনেক প্রতিনিধি প্রয়োজনের সময় নিজেকে একা মনে করতে থাকেন। পাশে থাকে না প্রতিষ্ঠান। প্রভাবশালীদের চাপের মুখে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রতিনিধিকেই দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রবণতা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে অভিযোগ তদন্ত করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটিও আইনের আলোকে যাচাই হওয়া উচিত। একইভাবে সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা মিথ্যা মামলার অভিযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আইনের চোখে সবাই সমান। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
মফস্বল সাংবাদিকরা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নন, তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। তাঁদের কলমের মাধ্যমে উঠে আসে অবহেলিত মানুষের কথা, জনস্বার্থের প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি। তাই তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কেবল সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাগরিক সমাজ এবং সর্বোপরি পুরো জাতির দায়িত্ব।
সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেয়া যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। তাই মফস্বল সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে নয় বরং তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়। কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ। চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা। এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।
পৃথিবীতে এমন একটি দিন কল্পনা করা যাক, যেদিন কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারবে না। ইচ্ছা থাকলেও সত্যকে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না। মুখে যা আসবে, তা আড়াল করার আগেই প্রকাশ পাবে। সম্পর্ক, রাজনীতি, ব্যবসা, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা সেদিন হঠাৎ প্রকাশ্যে চলে আসবে। মিথ্যাগুলোর সত্যরূপ বের হয়ে যাবে। পৃথিবীটা ওই দিন চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ নিজের এবং অন্যের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে শিখবে। বাস্তব বিষয়টা জানবে। মানুষের জীবনে মিথ্যার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক। মিথ্যাটাকে মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করা হয় নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে, কখনো নিজের দুর্বলতা লুকাতে। আবার কখনো মিথ্যা হয়ে ওঠে স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে থেকেই মানুষ শিখে যায় কোন সত্য বলা যায়, কোন সত্য গোপন রাখতে হয় এবং কখন একটি মিথ্যা পরিস্থিতিকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই সুযোগটি এক দিনের জন্যও না থাকে? সকালের শুরুতেই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বহু প্রশংসা হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যাবে। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা সুবিধা পাওয়ার যে অদৃশ্য পথগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে। কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হবে, কেউ অন্যের প্রাপ্য কৃতিত্ব নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সুন্দর মুখোশের আড়ালে থাকা অসংগতি মানুষের সামনে চলে আসতে পারে। সত্যের পর্দায় আড়াল করা দুর্নীতি, অবিচার সব উন্মোচিত হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়বে। ভালো ফলাফলের পেছনে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে চাপ, ভয়, তুলনা ও প্রত্যাশা কাজ করে, সেগুলো প্রকাশ পাবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো প্রথমবার স্বীকার করবে যে সব সময় ভালো থাকার অভিনয় তাদের কতটা ক্লান্ত করে। অভিভাবকেরাও বুঝতে পারবেন, সন্তানের ভালো ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কখনো কখনো সন্তানের নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের জায়গাটি সেদিন মোটেও সহজ থাকবে না। বহু বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিছু না বলা কথা, ছোটখাটো অভিমান কিংবা গোপন ঈর্ষার ওপর। সত্য প্রকাশের দিনে সেই আবেগগুলো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কিছু বন্ধুত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আবার কিছু বন্ধুত্ব আরও শক্ত হতে পারে। কারণ, সত্য কখনো কখনো সম্পর্ক শেষ করে, আবার কখনো সম্পর্ককে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচায়। পরিবারের ক্ষেত্রেও দিনটি হতে পারে সবচেয়ে কঠিন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে অভিমান, প্রত্যাশা, ভয় ও না-পাওয়া জমিয়ে রাখে, সেগুলো সামনে আসবে। হয়তো কেউ প্রথমবার বুঝতে পারবে, তার কাছের মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। আবার কেউ উপলব্ধি করবে, ভালোবাসার নাম করে সে অন্যের ওপর কতটা চাপ, কতটা অভিনয় করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও ব্যতিক্রম হবে না। সেদিন সাজানো জীবন দেখানোর সুযোগ থাকবে না। সাফল্যের ছবির পাশাপাশি ব্যর্থতার গল্পও প্রকাশ পাবে। আনন্দের পোস্টের আড়ালে থাকা একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থাকা ভয় কিংবা নিখুঁত জীবনের ছবির পেছনের বাস্তবতা সামনে চলে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে, পর্দায় দেখা জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তবে সত্যের সেই দিনটি শুধু অস্বস্তিকর হবে না; শিক্ষণীয়ও হবে। মানুষ বুঝতে পারবে, সত্য সব সময় সুন্দর নয়। সত্য শুনলে কষ্ট হয়, কিছু সত্য সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মিথ্যার ওপর তৈরি শান্তি অনেক সময় সাময়িক। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পর যে সম্পর্ক টিকে যায়, সেটি আগের চেয়ে বেশি বাস্তব। দিন শেষে পৃথিবী আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মানুষ আবার প্রয়োজনমতো কিছু কথা লুকাবে, কিছু কথা সাজিয়ে বলবে, কিছু সত্য নিজের ভেতরে রেখে দেবে। কিন্তু সেই এক দিনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যাবে। হয়তো সবাই প্রতিদিন পুরোপুরি সত্য বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত নিজের কাছে সত্যি থাকার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী অনেক সময় অন্য কেউ নয় নিজের কাছেই নিজের বলা মিথ্যাগুলো এক দিনের সত্য পৃথিবীকে বদলে দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষকে নিজের মুখোশের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে এটুকু নিশ্চিত। আর হয়তো সেই এক দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে, সত্য সম্পর্ক ভাঙার থেকে মিথ্যার তৈরি দেয়াল সরিয়ে সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলা।
পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির মাঝখানে এমন একটি সরু জলপথ রয়েছে, যার ওপর নির্ভর করে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমানের ভূখণ্ড, মাঝখানে হরমুজ প্রণালি। ভৌগোলিক আয়তনের বিচারে এটি পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুমাত্র। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর গুরুত্ব এতটাই বিস্তৃত যে, এই প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও তেলের বাজার, জাহাজ চলাচল, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঢেউ তুলতে পারে। ফলে হরমুজকে কেবল একটি সামুদ্রিক পথ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি ভূরাজনৈতিক চোকপয়েন্ট, জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অন্যতম মঞ্চ। পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সমুদ্রপথে রপ্তানি করে। তাদের তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে যেতে হলে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। বিশেষ করে, কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। অর্থাৎ হরমুজের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল একটি নির্দিষ্ট সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই হরমুজকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটি চোকপয়েন্ট বলা হয়। চোকপয়েন্ট হলো এমন একটি ভৌগোলিক স্থান, যার নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তা বৃহৎ পরিসরের বাণিজ্য ও যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। সুয়েজ খাল, বাবেল মান্দেব প্রণালি ও মালাক্কা প্রণালির মতো হরমুজও সেই ধরনের একটি স্থান। তবে এর বিশেষত্ব হলো, এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিশ্বের জ্বালানি বাজার। পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা তেল ও গ্যাসের প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। হরমুজের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্ট হয় ইরানের অবস্থান বিবেচনা করলে। প্রণালির উত্তরে ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং তার বিপরীতে ওমানের ভূখণ্ড। ফলে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এই জলপথের ওপর একটি বিশেষ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাতে রয়েছে এবং এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পারস্য উপসাগর। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের জন্য কঠিন। তাই ইরানের সামরিক কৌশলে অসম যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। হরমুজের ভৌগোলিক সংকীর্ণতা ই ধরনের কৌশলকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। তবে হরমুজ বন্ধ করে দেয়া এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা এক বিষয় নয়। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণভাবে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ বন্ধ রাখা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি দ্বিমুখী। হরমুজ দিয়ে অন্য দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় ঠিকই, কিন্তু ইরানের নিজের জ্বালানি রপ্তানিও সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা ইরানের নিজের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু পূর্ণ অবরোধের প্রয়োজনও নেই। সামান্য সামরিক উত্তেজনা, জাহাজ আটকের ঘটনা, মাইন বিস্তারের আশঙ্কা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তাই আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর ও তার আশপাশের জলপথে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সামরিক উপস্থিতি তার চারপাশে মার্কিন শক্তির একটি স্থায়ী চাপ। ফলে একই জলপথ দুই পক্ষের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্ন, আর ইরানের কাছে এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্ন। হরমুজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সিকিউরিটি ডিলেমা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো রাষ্ট্রগুলো একদিকে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধও তাদের জন্য বিপর্যয়কর। তাদের অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং সেই রপ্তানির জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ অপরিহার্য। তাই তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করে এবং নিজেদের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিসরও বাড়ানোর চেষ্টা করে। চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই বুঝতে পারছে যে, শুধু সামরিক জোটের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে চীনের উত্থানও সরাসরি যুক্ত। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস তার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজের নিরাপত্তা চীনের কাছে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ। চীনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি তাই ক্রমেই অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দিকে এগোচ্ছে। সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য এবং বৃহত্তর অবকাঠামোগত সংযোগের পরিকল্পনা এই পরিবর্তনের অংশ। এর ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্য এবং চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে একটি পরোক্ষ প্রতিযোগিতাও তৈরি হচ্ছে। হরমুজের গুরুত্ব শুধু তেল দিয়ে শেষ হয় না। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোলেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা রাতারাতি শেষ হচ্ছে না। পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পেট্রোকেমিক্যালসহ বহু খাত এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হবে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়বে, বিমা ব্যয় বাড়বে, জাহাজ পরিবহনের খরচ বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এরপর সেই অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও শিল্পপণ্যের বাজারে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের আমদানি ব্যয় সামলানোর সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জ্বালানির সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। হরমুজকে ঘিরে বড় কোনো সংকট হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে পারে। অবশ্য হরমুজের বিকল্প তৈরির চেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত স্থলভিত্তিক পাইপলাইন ও বিকল্প বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য হলো কোনো সংকটের সময় অন্তত কিছু পরিমাণ জ্বালানি হরমুজ এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো। কিন্তু এসব বিকল্প পথ হরমুজের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নয়। কারণ, পারস্য উপসাগরের বিপুল জ্বালানি রপ্তানি একসঙ্গে অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো অবকাঠামোগত সক্ষমতা এখনো নেই। ফলে হরমুজের গুরুত্ব কমানো সম্ভব হলেও এর প্রয়োজনীয়তা সহজে দূর করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক আইনও এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চলাচল-অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু শান্তিকালীন আইন এবং যুদ্ধকালীন বাস্তবতা এক নয়। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে তার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, তখন আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, উপকূলীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সামরিক প্রয়োজনের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফলে হরমুজের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৈধতারও পরীক্ষা। হরমুজকে তাই ভবিষ্যতের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিশ্বের জ্বালানি বাজারের পারস্পরিক নির্ভরতা একই জায়গায় এসে মিলেছে। আগামী দিনে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমলেও হরমুজের গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূগোলের গুরুত্ব প্রযুক্তি যতই বাড়ুক, সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। বরং প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা ভূগোলের রাজনৈতিক মূল্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।
কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে তেরো বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর এ প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজের কণ্ঠস্বর। অপ্রতিম সেদিন মায়ের আইফোনটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিল। আর বাড়ি ফেরেনি। এক দিন পর তাকে পাওয়া গেল নিথর, রক্তাক্ত অবস্থায়। যে সন্তানকে মা-বাবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বড় করছিলেন, এক মুহূর্তে সেই স্বপ্ন পরিণত হলো এক অসহনীয় শূন্যতায়। ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং একটি আইফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক বক্তব্যে ফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যার কথা এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বা আদালতের রায় হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু আইনের তদন্তের পাশাপাশি সমাজেরও একটি তদন্ত প্রয়োজন। শুরু কোথায়, শেষ কোথায়, মুক্তি কোথায়? অপ্রতিমকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বাইক, কোথাও টিকটক, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর দৃশ্য। এসব ছবি বা ভিডিওর সত্যতা, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল হবে না। এসবের সঙ্গে অপ্রতিমের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। অপ্রতিমকে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব দৃশ্য আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে। আমাদের কিশোররা আজ কোথায় বড় হচ্ছে? একসময় একটি শিশুর পৃথিবী ছিল মাঠ, স্কুল, বই, বন্ধু, পাড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর পরিবারের উঠোন। এখন সেই পৃথিবীর বড় একটি অংশ চলে গেছে মোবাইলের পর্দায়। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, অসংখ্য ভিডিও, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অনলাইন স্বীকৃতির নেশা। সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন জগৎ। প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। মোবাইল শিক্ষা দিতে পারে, যোগাযোগ তৈরি করতে পারে, প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভার্চুয়াল পৃথিবী বাস্তব পৃথিবীর বিকল্প হয়ে ওঠে। আর তখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট বাস্তব পৃথিবী তৈরি করেছি? দিয়েছি কি পর্যাপ্ত মাঠ? নিরাপদ আড্ডার জায়গা? পাঠাগার? খেলাধুলার সুযোগ? সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ? এমন একজন শিক্ষক, যাঁর কাছে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে? এমন একটি পরিবার, যেখানে ভুল করলে সন্তান শাস্তির ভয়ে নয়, বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথা বলতে পারে? আমরা যখন এসব জায়গা সংকুচিত করেছি, তখন মোবাইলের পর্দা স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে উঠেছে।আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, একটি কিশোর যখন স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, তখন তার শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয় মাত্র। তার জীবন কিন্তু থেমে যায় না। এরপর তার সামনে কী থাকে, এ প্রশ্নের উত্তর কি আমরা প্রস্তুত রেখেছি? অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসা এক তরুণের শিক্ষাজীবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সে একাদশ শ্রেণিতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৫ সালে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। পড়াশোনা ছেড়ে দেয়া কোনো মানুষকে অপরাধী বানায় না। বরং প্রশ্ন হলো, একজন তরুণ যখন শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তখন তাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাই? কারিগরি শিক্ষা? কর্মমুখী প্রশিক্ষণ? খেলাধুলা? সংস্কৃতি? নাকি তাকে ছেড়ে দিই এমন এক জগতের হাতে, যেখানে সময় কাটানোর জন্য তার হাতে শুধু একটি মোবাইল থাকে? এখানেই তৈরি হয় ঝুঁকি। কেউ ভুল বন্ধুত্বে জড়িয়ে যেতে পারে। কেউ মাদকের দিকে যেতে পারে। কেউ অপরাধী চক্রের প্রলোভনে পড়তে পারে। আবার অনেকে কোনো অপরাধে না জড়িয়েও শুধু দিশাহীনতায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু ‘অপরাধী কে?’ এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। আরেকটি প্রশ্ন করতেই হবে, ‘অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা কোথায় ছিলাম?’ আমরা কি সন্তানের পাশে ছিলাম? শুধু তার হাতে দামি ফোন তুলে দিয়েছি, নাকি ফোনের ওপারের পৃথিবী নিয়েও তার সঙ্গে কথা বলেছি? তার বন্ধুদের চিনেছি? তার ভয় শুনেছি? তার মন খারাপ বুঝেছি? তার ব্যর্থতার পর তাকে আবার দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছি? একটি মাঠ হয়তো একজন কিশোরকে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে পারে। একটি বই হয়তো তাকে একটি নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। একজন ভালো শিক্ষক হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল প্রতিবেশী হয়তো একটি বিপদ আগেই দেখতে পারেন। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হয়তো তাকে অন্য রকম স্বপ্ন দেখাতে পারে। আর একটি পরিবার হয়তো তাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। একজন কিশোরকে বাঁচাতে সব সময় বড় কোনো প্রকল্প লাগে না। কখনো কখনো লাগে একজন মানুষের সময়, মনোযোগ ও বিশ্বাস। রাষ্ট্রের দায়িত্বও তাই শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলার অবকাঠামো, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং নিরাপদ জনপরিসর—এসব কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপাদান। কারণ, একটি সমাজ তার ভবিষ্যৎকে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে তৈরি করে না। তৈরি করে তার পরিবেশ দিয়ে। অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের বুকের ভেতর একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ক্ষত যেন শুধু কয়েক দিনের শোক হয়ে না থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট লিখে, কিছুদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে, তারপর সব ভুলে গেলে চলবে না। অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার মায়ের কোলে সে আর মাথা রাখবে না। বাবার সঙ্গে আর কোনো সাধারণ দুপুর ভাগ করে নেবে না। বন্ধুরা হয়তো আর কোনো দিন তাকে নিয়ে ছবি তুলবে না। কিন্তু অপ্রতিমের মতো আরও অসংখ্য কিশোর আমাদের চারপাশে আছে। কেউ হয়তো একা। কেউ হয়তো ভুল বন্ধুত্বের দিকে এগোচ্ছে। কেউ হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ হয়তো সারা দিন মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে। কেউ হয়তো পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ হয়তো শুধু একজন মানুষের অপেক্ষায় আছে যে তাকে বলবে, “তুমি একা নও।” আমরা যদি সেই মানুষটি হতে না পারি, তাহলে কোনো এক সন্ধ্যায় আবার হয়তো কোনো মায়ের ফোনে আসবে একটি অচেনা কল। আবার কোনো বাবা ছুটবেন থানায়, হাসপাতালে, রাস্তায়। আবার কোনো পরিবার খুঁজবে তার সন্তানকে। আর আমরা আবার প্রশ্ন করব, ‘এমন হলো কেন?’ এই ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজতে হলে আজ থেকেই শুরু করতে হবে। শুরু কোথায়? স্ক্রিনে? একাকিত্বে? ভুল সঙ্গের কাছে? শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ায়? নাকি আমাদের উদাসীনতায়? শেষ কোথায়? একটি লাশের পাশে? একটি মায়ের আর্তনাদে? একটি বাবার শূন্য চোখে? আর মুক্তি কোথায়? মুক্তি শুধু একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তারে নয়। বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের যথাযথ তদন্ত ও আইনগত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি বদলাতে হবে সেই পরিবেশ, যেখানে একজন কিশোর ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য দায় কার? তার উত্তর তদন্ত ও আদালত দেবে। কিন্তু অপ্রতিমদের আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকে দিতে হবে। কারণ, আজ অপ্রতিম। আগামীকাল কে? একটি সন্তান হারানোর পর কান্না করার চেয়ে, তার আগে একজন সন্তানকে ধরে রাখা অনেক বেশি জরুরি। আমরা কি সেই হাতটি বাড়িয়ে দেব? নাকি আরেকজন অপ্রতিম হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকব? প্রশ্নগুলো আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, অপ্রতিম শুধু একটি নাম নয়। সে আমাদের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎকে আমরা কোন বাংলাদেশ দেব। সিদ্ধান্তটা আজ থেকে আমাদেরই নিতে হবে ।
একটি দেশের নাগরিক হিসেবে জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। চিকিৎসা তার মধ্যে অন্যতম। মানুষকে সুস্থ সবলভাবে বাঁচতে হলে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার নানা জায়গায় সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। তবে কি শুধু হাসপাতাল নির্মাণেই জনগণ রোগ থেকে মুক্তি পাবে? না। জনগণকে তার প্রাপ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি হাসপাতালের সঠিক কার্য পরিচালনা। কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে জনগণের ভোগান্তি বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে টাকা খরচ করে নিজের চিকিৎসা করাতে পারে না। নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত লোকেদের রোগ হলে তাদের ভরসা কেবলই সরকারি হাসপাতালগুলো। তবে সরকারি হাসপাতালগুলো যেন অনিয়মের বেড়াজালে বন্দী। কেবল রোগীর আধিক্য বেশি, সেই অনুযায়ী ডাক্তার কম। রোগীকে পোহাতে হয় অসহ্য যন্ত্রণা অনিশ্চয়তার সাথে। কোনো সময় নেই সিট কিংবা নেই ডাক্তার। দিনের পর দিন রোগী ভর্তি থেকেও বড় ডাক্তারের দেখা নেই। পাশাপাশি চলছে সিট বাণিজ্য, এ যেন সিন্ডিকেটের লীলাখেলা। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দালালের মাধ্যমে টাকা প্রদান করে একটি সিট পেতে হয়, নাহয় দিতে হয় কোনো রেফারেন্স। হাসপাতালের বারান্দায় কাটাতে হয় রাতের পর রাত। একটি তথ্য সংগ্রহ বা এক একটি টোকেন সংগ্রহ করতে রোগীকে দাঁড়াতে হয় ১০০, ২০০ জনের সিরিয়ালে। এ যেন রোগ ভালো করার বদলে আরও রোগী হওয়ার উপক্রম। কোনো জটিল রোগের টেস্ট করানোর জন্য দৌড়াতে হয় প্রাইভেট হাসপাতালের দোরগোড়ায়; গুনতে হয় হাজার হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালের টেস্টের অপেক্ষায় বসে থাকলে রোগীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি বিভাগে নেই জরুরি বা ইনস্ট্যান্ট সমাধান, নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, যেখানে বসে রোগী অপেক্ষা করবে, নেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, যা খেয়ে রোগী বা তার স্বজন একটু পিপাসা মিটাবে, নেই স্বাস্থ্যকর কোনো পরিবেশ। হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর অবস্থান এবং যথাতথা অবাধ মানুষের যাতায়াত। এ কেমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ? নেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনো ওয়াশরুম। হাসপাতালগুলোর ফ্রেশ রুমে ফ্রেশ হওয়ার বদলে যেতে হয় নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। নেই নিয়ম-নীতির বালাই। কোনো হাসপাতালে তো চলছে আরেকটি মরণ ফাঁদ। বহুতল হাসপাতালের ভবনের জন্য দেয়া হয়েছে লিফট, কিন্তু লিফটের ধারণক্ষমতার বাইরে রোগীরা উঠে যাচ্ছে। নেই জীবনের মায়া, দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতন হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। ডাক্তারদের অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতির মাঝে ভুগতে হয় রোগীকে। বিশেষ করে, সদর উপজেলা পর্যায়ের গ্রাম অঞ্চলের হাসপাতালে রোগীরা সুচিকিৎসার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এসে একরাশ হতাশা আর ভোগান্তি নিয়ে ফিরে যায়। এর সমাধান সম্ভব কেবলই সরকারের সজাগ দৃষ্টি আর সঠিক ব্যবস্থাপনায়। রোগীর বিভিন্ন টোকেন সংগ্রহ পদ্ধতির কাজটা স্মার্টভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, যেন রোগীকে ২, ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়। হাসপাতালগুলোর ওয়াশরুম ব্যবস্থা আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। বহুতল ভবনবিশিষ্ট হাসপাতালে লিফটব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। হাসপাতালে মানুষের যাতায়াতে নিয়ম-শৃঙ্খলাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। জুতা নিয়ে প্রবেশ, মাস্ক পরিধান ইত্যাদি বিষয়গুলোতে আরও বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। হাসপাতালে জটিল রোগ নির্ণয়ের টেস্ট করানোর ব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। সেই সাথে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সরকারি ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে, যাতে রোগীর চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়। জরুরি বিভাগগুলোর সেবা আরও উন্নত করতে হবে, যেন জরুরি রোগী সাথে সাথেই সেবা পেতে সক্ষম হয়।