দীপকদা চিৎকার করে উঠেছিল, "আঃ, হচ্ছে না, ক্লোজড, আরও ক্লোজড..."
দীপকদা বললেও কিছুতেই আর সামনে এগোতে পারছে না বাবান। এই দৃশ্যে ছোটবেলার বন্ধু তিয়াসার মুখোমুখি। কয়েকবার রিহার্সাল দিলেও কিছুতেই ভাঙতে পারছে না নিজেকে। অন্যদিকে তিয়াসা একেবারে সাবলীল। কয়েকবার রিহার্সাল করার পর তিয়াসা বলেছিল, “ও যদি না পারে, আমি না হয় আরেকটু এগিয়ে যাই?”
মাথা নেড়ে দীপকদা বলেছিলেন, "তুই না, বাবানকে এগিয়ে আসতে হবে।"
কান থেকে গরম হাওয়া বেরোচ্ছিল বাবানের। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামও জমেছে! তিয়াসা বলেছিল, “আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এসো। দেখো পারবে।”
তিয়াসার কথামতো দৃশ্যটা করেও ফেলেছিল। দীপকদা কাজ দেখে হাততালি দিয়েছিলেন।
বাবানের সেই সময় বারো মাস বসন্ত মনে হয়! দিন-রাত কল্পনায় আঁকিবুঁকি কাটে। অভিনয় করা নাটকের দৃশ্যটা মনকে আলোড়িত করে তুলেছিল। এক মাঝির নদী ঘিরে জীবনের নানান ওঠাপড়ার কাহিনি। বাবান ছিল সেই মাঝি। দিনে-রাতে নদীর কত ঘটনার সাক্ষী সে। একদিন গোধূলিলগ্নে উদভ্রান্ত এক কিশোরী এসে উঠেছিল নৌকায়।
কিশোরীর ভূমিকায় ছিল তিয়াসা। সবকিছু হারিয়ে ফেলার ভয় ওকে যেন তাড়া করে ফিরছে। রাতের গহিন অন্ধকারেও নৌকা ছেড়ে যেতে চায় না। এ-কথা সে-কথা বলেও কাজ হয়নি। শেষে ভয় দেখাতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল কিশোরী। মাঝি নিরুপায় হয়ে আশ্রয় দেয়। ধীরে ধীরে দুজন পরস্পরকে অবলম্বন করে বাঁচতে শেখে। কখনো কখনো শকুনেরা ছিঁড়ে খেতে চায় কিশোরীকে। কিন্তু বৈঠাটানা শক্ত হাতে রুখে দাঁড়ায় মাঝি।
এক জ্যোৎস্নারাতে ঢেউগুলো চিকচিক করছে, একুল-ওকুল ভেসে যাচ্ছে কামরাঙা জ্যোৎস্নার প্লাবনে! সেই রাতে মাঝির মুখোমুখি বসে কিশোরীটি তার ফেলে আসা জীবনের নানা ঘটনা একনিশ্বাসে বলতে থাকে। মাঝি পরিষ্কার দেখতে পায় ভরা জ্যোৎস্নাতেও কিশোরীর মুখটি কখনো কখনো অমাবস্যার অন্ধকার ঢেকে ফেলছে। নদীর পাড়ে নোঙর করা নৌকায় দুজনে মুখোমুখি! নেপথ্যে জলের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ মুহূর্তটিকে অন্যমাত্রা এনে দিয়েছিল!
দর্শকদের তুমুল করতালিতে শেষ হয় দৃশ্যটি। অনেকে বলেছিল, “ওদের দুজনের রসায়নটি বেশ ভাল!”
নাটক শেষ হয়ে গেলেও বাবানের মন তখনো তিয়াসার মুখোমুখি বসে। ছেলেবেলার বন্ধু তিয়াসার জন্য একটা নদী কিনবে ভেবেছিল বাবান। যে-নদী ঘিরে থাকবে দুজনের মান-অভিমান-ভালোবাসার নদীযাপন।
গ্রিনরুমের এক কোণে বসে আছে বাবান। চমকে ওঠে তিয়াসার ডাকে, "নাটক তো শেষ বাবানদা, বাড়ি চলো।"
প্রথম শোয়ে দর্শকদের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় দলের ছেলে-মেয়েরা তো বটেই, দীপকদাও উচ্ছ্বসিত! পরের রবিবার রিহার্সাল রুমে নাটকের রিভিউয়ে বাবান আগেভাগে পৌঁছে যায়। ভেতরে ভেতরে একটু উত্তেজনা টের পাচ্ছিল। একে একে সবাই এলেও তিয়াসার আসতে দেরি দেখে দীপকদা বলে, “তিয়াস এলে শুরু করব।”
কথা শেষ হতেই হাঁফাতে হাঁফাতে ঢোকে তিয়াসা। দীপকদা বলে, “নে এবার শুরু করা যাক।” চেয়ারগুলো টেনে নিয়ে গোল করে বসে সবাই। দীপকদা মধ্যমণি। সান্ত্বনা, মণিকাদের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে তিয়াসা। বাবানের ইচ্ছে করছিল ওর পাশে গিয়ে বসতে। এর মধ্যে দীপকদা বলে, “এবার শুরু করা যাক!”
সবাই যেন নড়েচড়ে বসল। খেয়াল করে বাবান। প্রথমেই নীহারেন্দুদা বলে, “পারফরম্যান্স ভালোই হয়েছে। তবে দু-এক জায়গায় লাইট মানানসই হয়নি। মিউজিকও বড্ড চড়া মনে হয়েছে।”
অনন্তদা যেহেতু লাইটের বোর্ডে বসেন, তাই তিনি নিচু স্বরে বলেন, “কোন কোন জায়গায় মানানসই হয়নি, যদি পরিষ্কার করে বলো তো ভালো হয়!”
মিউজিক নিয়ে আরও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে। এই নাটকের মিউজিক করা এবং প্রেক্ষাপণে থাকে সুবিমলদা। মাথা তুলে দীপকদার দিকে তাকিয়ে সুবিমলদা বলে, “স্টেজ রিহার্সালেও তো একই মিউজিক বেজেছে। তখন তো কারও মনে হয়নি।”
দীপকদার উলটো দিকে বসা সত্যজিৎ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “আমার সব থেকে বাজে লেগেছে বাবান আর তিয়াসার আবেগঘন দৃশ্যটা।”
“রিহার্সালে ওরা এ রকমই তো করত! আজ আবার বেশি কী দেখলি?” বলে দীপকদা।
সত্যজিৎ উঁচু স্বরে বলে, “দুজন যেভাবে বসেছিল, তাতে বেশ দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। তা ছাড়া থিয়েটারে লোকশিক্ষে হয়, তা আমরা কোন শিক্ষা দিচ্ছি দর্শকদের!”
মুহূর্তে বাবানের চোখ যায় তিয়াসার মুখের দিকে। ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে ওর মুখ। দীপকদা চটজলদি বলে, “আর কারও কিছু বলার আছে?”
আস্তে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিয়াসা বলে, “আমার কিছু বলার আছে। রিহার্সালেও তো ওই দৃশ্য আমরা একইভাবে করেছি। দীপকদা যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, ঠিক সেভাবে। সেদিনও অন্যথা হয়নি। তাহলে কী করে সত্যজিৎদার এমন মনে হলো?”
পাশ থেকে বিপুল বলে, “ছাড় না তিয়াসা, এটা ওর মনে হয়েছে কিন্তু দর্শকরা তো সে কথা বলেনি!”
দীপকদা বলে, “আরে এটা তো রিভিউ হচ্ছে। ঠিক আছে আমি ভেবে দেখব।”
দীপকদার কথা শেষ হতেই গুঞ্জন শুরু হয়। বাবান থাকতে না পেরে উঠে দাঁড়ায়। বলে, “একমাত্র সত্যজিতের এ রকম লেগেছে, নাকি অন্যদেরও? খোলামেলা আলোচনা হলে ভালো হয়।”
কথা শেষ হতে না হতেই গুঞ্জন শুরু হয়। মুখে কিছু না বললেও কেউ কেউ সত্যজিতের মতকে সমর্থন করছে, সেটা বুঝতে পারে বাবান।
অবস্থা বেগতিক দেখে দলের বর্ষীয়ান সদস্য রোগা পাতলা চেহারার অমলদা বলে, “ঠিক আছে, প্রথম শোতে ভুল-ভ্রান্তি হয়। পরের শোতে ঠিক হয়ে যাবে। তবে সত্যজিতের কথাটা দীপককে ভেবে দেখতে হবে।”
আবারও গুঞ্জন শুরু হয়। এবার দীপকদা খানিকটা রাগত স্বরে বলে, “ঠিক আছে। সবার কথা শোনা হলো, যেটা আমার গ্রহণযোগ্য মনে হবে, সেগুলো পরের রিহার্সালে শুধরে নিতে হবে।”
অবাক চোখে তাকায় তিয়াসা। বাবান দ্যাখে সত্যজিৎ ওর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসছে। রাগ হলেও প্রকাশ করে না বাবান।
তারপর থেকে দলে যায়নি ওরা। দীপকদা বলেছিল, “কারোর ওপর রাগ করে অভিনয় ছাড়িস না। উপযুক্ত জবাব তো মঞ্চ থেকেই দিতে হবে তোদের।”
সত্যজিতের ব্যাঙ্গাত্মক হাসি ভুলতে পারে না বাবান। তাই মঞ্চে আর অভিনয় করবে না বলে মনঃস্থির করে। তবে দলের অনেকে ফোন করেছিল। সেভাবে সাড়া দেয়নি বাবান।
সূর্যের আলো একেবারে পড়ে এসেছে। বড় রাস্তার ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছটা লালে লাল হয়ে ঢেকে রয়েছে! আধো আলো আধো অন্ধকারে কোকিল ডেকেই চলেছে। বাবানের মনটা কেমন যেন করে ওঠে!
হঠাৎই তিয়াসাকে দেখতে পায় বাবান। রাস্তা পেরিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় তিয়াসা।
তিয়াসা বলে, "জানো বাবানদা, সত্যজিৎদা এসেছিল আমাদের বাড়িতে। বলছিল, তোমার রোলটা দীপকদা ওকে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আমাকে অভিনয় করার জন্য অনেক অনুরোধ করল"
বাবান তন্ময় হয়ে দেখতে থাকে তিয়াসাকে। অস্ফুটে বলে, "তাই নাকি! কী বললে তুমি?"
তিয়াসা একগাল হেসে বলে, "ধুর, ওই দৃশ্যটা অন্য কারও সঙ্গে করতে পারব না। তাই না করে দিয়েছি।"
বাবানের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে থাকে তিয়াসার দিকে।
তিয়াসা পিঠের ব্যাগটা দেখিয়ে বলে, "টিউশন যেতে হবে। চলি বাবানদা।"
বাবান শুনতে পায় না তিয়াসার কথা। মনের গভীরে সেই নদীটি ভেসে ওঠে, যা শুধু ওদের দুজনের! মাঝ দরিয়ায় ঢেউময় নদীর স্রোতে দুজনের সংসার হেলেদুলে এগিয়ে চলবে! কত রকম পাখি উড়ে এসে খোঁজ নিয়ে যাবে ওদের সংসারের। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি, আবার কখনো ঝড়ে উথালপাথাল হবে দুজনে। নোঙর করা নৌকায় গহিন মনের হদিস মিলবে একে অন্যের। তারপর জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় দুজনে দুজনার খুব কাছাকাছি…
তিয়াসা কখন চলে গেছে টের পায়নি বাবান। বড় রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়া বাসের হর্নের শব্দে সংবিৎ ফেরে বাবানের।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়। কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ। চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা। এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।
পৃথিবীতে এমন একটি দিন কল্পনা করা যাক, যেদিন কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারবে না। ইচ্ছা থাকলেও সত্যকে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না। মুখে যা আসবে, তা আড়াল করার আগেই প্রকাশ পাবে। সম্পর্ক, রাজনীতি, ব্যবসা, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা সেদিন হঠাৎ প্রকাশ্যে চলে আসবে। মিথ্যাগুলোর সত্যরূপ বের হয়ে যাবে। পৃথিবীটা ওই দিন চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ নিজের এবং অন্যের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে শিখবে। বাস্তব বিষয়টা জানবে। মানুষের জীবনে মিথ্যার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক। মিথ্যাটাকে মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করা হয় নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে, কখনো নিজের দুর্বলতা লুকাতে। আবার কখনো মিথ্যা হয়ে ওঠে স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে থেকেই মানুষ শিখে যায় কোন সত্য বলা যায়, কোন সত্য গোপন রাখতে হয় এবং কখন একটি মিথ্যা পরিস্থিতিকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই সুযোগটি এক দিনের জন্যও না থাকে? সকালের শুরুতেই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বহু প্রশংসা হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যাবে। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা সুবিধা পাওয়ার যে অদৃশ্য পথগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে। কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হবে, কেউ অন্যের প্রাপ্য কৃতিত্ব নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সুন্দর মুখোশের আড়ালে থাকা অসংগতি মানুষের সামনে চলে আসতে পারে। সত্যের পর্দায় আড়াল করা দুর্নীতি, অবিচার সব উন্মোচিত হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়বে। ভালো ফলাফলের পেছনে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে চাপ, ভয়, তুলনা ও প্রত্যাশা কাজ করে, সেগুলো প্রকাশ পাবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো প্রথমবার স্বীকার করবে যে সব সময় ভালো থাকার অভিনয় তাদের কতটা ক্লান্ত করে। অভিভাবকেরাও বুঝতে পারবেন, সন্তানের ভালো ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কখনো কখনো সন্তানের নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের জায়গাটি সেদিন মোটেও সহজ থাকবে না। বহু বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিছু না বলা কথা, ছোটখাটো অভিমান কিংবা গোপন ঈর্ষার ওপর। সত্য প্রকাশের দিনে সেই আবেগগুলো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কিছু বন্ধুত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আবার কিছু বন্ধুত্ব আরও শক্ত হতে পারে। কারণ, সত্য কখনো কখনো সম্পর্ক শেষ করে, আবার কখনো সম্পর্ককে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচায়। পরিবারের ক্ষেত্রেও দিনটি হতে পারে সবচেয়ে কঠিন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে অভিমান, প্রত্যাশা, ভয় ও না-পাওয়া জমিয়ে রাখে, সেগুলো সামনে আসবে। হয়তো কেউ প্রথমবার বুঝতে পারবে, তার কাছের মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। আবার কেউ উপলব্ধি করবে, ভালোবাসার নাম করে সে অন্যের ওপর কতটা চাপ, কতটা অভিনয় করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও ব্যতিক্রম হবে না। সেদিন সাজানো জীবন দেখানোর সুযোগ থাকবে না। সাফল্যের ছবির পাশাপাশি ব্যর্থতার গল্পও প্রকাশ পাবে। আনন্দের পোস্টের আড়ালে থাকা একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থাকা ভয় কিংবা নিখুঁত জীবনের ছবির পেছনের বাস্তবতা সামনে চলে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে, পর্দায় দেখা জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তবে সত্যের সেই দিনটি শুধু অস্বস্তিকর হবে না; শিক্ষণীয়ও হবে। মানুষ বুঝতে পারবে, সত্য সব সময় সুন্দর নয়। সত্য শুনলে কষ্ট হয়, কিছু সত্য সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মিথ্যার ওপর তৈরি শান্তি অনেক সময় সাময়িক। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পর যে সম্পর্ক টিকে যায়, সেটি আগের চেয়ে বেশি বাস্তব। দিন শেষে পৃথিবী আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মানুষ আবার প্রয়োজনমতো কিছু কথা লুকাবে, কিছু কথা সাজিয়ে বলবে, কিছু সত্য নিজের ভেতরে রেখে দেবে। কিন্তু সেই এক দিনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যাবে। হয়তো সবাই প্রতিদিন পুরোপুরি সত্য বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত নিজের কাছে সত্যি থাকার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী অনেক সময় অন্য কেউ নয় নিজের কাছেই নিজের বলা মিথ্যাগুলো এক দিনের সত্য পৃথিবীকে বদলে দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষকে নিজের মুখোশের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে এটুকু নিশ্চিত। আর হয়তো সেই এক দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে, সত্য সম্পর্ক ভাঙার থেকে মিথ্যার তৈরি দেয়াল সরিয়ে সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলা।
ছোটবেলার অবুঝ হাত ছুঁতে যেত দিন ও রাত— আগুন, জল কিংবা ফুল ছিল না হিসেব, কোনটা ভুল। না বুঝেই কেউ অবহেলায় কাছে টেনে নেয় ভালোবাসায়। মোহের পর্দা যখন ওড়ে বাস্তবতা ধাক্কা মারে। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় কার কী গুণ, কার কী ক্ষয়। ভুলগুলো সব চেনা যায় কিন্তু ফেরার সময় নাই। জীবন বুঝতে বুঝতেই শেষ উবে যায় সব রঙিন রেশ। হাতে থাকে শুধু ধূসর ছাই পেছনে ফেরার উপায় নাই।
আব্বা তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আমার বয়স মাত্র আটাশ। আমি তাঁর একমাত্র ছেলে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও আব্বার একটি ছোট্ট ইচ্ছে ছিল, পুত্রবধূকে দেখে যাওয়া। ছোট খালু একদিন হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গেলে আব্বা হঠাৎ তাঁর হাত দুটো শক্ত করে ধরে বললেন, “ভাই, একটু দেখো তো… আমার ছেলেটাকে একটা বিয়ে করিয়ে দিতে পারো কি না। আমি মরার আগে আমার পুত্রবধূকে একবার দেখে যেতে চাই।” খালু বাড়ি ফিরে আর দেরি করলেন না। শুরু হলো পাত্রী দেখা। দু-এক দিনের মধ্যেই খবর এল খালুর পাশের বাড়ির প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের একমাত্র মেয়ে। শিক্ষিত, সুন্দর, ভদ্র — সবদিক থেকেই উপযুক্ত। সেদিন বিকেল চারটায় আমরা মেয়েটিকে দেখতে গেলাম। সঙ্গে মা, খালা-খালু, মামা, খালাত ভাই-বোন আর আমি।আপ্যায়নের পর হঠাৎ খালাত বোনেরা দুষ্টুমি করে বলল, “ওদের দুজনকে একটু একা থাকতে দেয়া হোক। নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক।” প্রস্তাব অনুযায়ী আমাদের দুজনকে ওপরের একটি ঘরে পাঠানো হলো। বাইরে থেকে খালাত ছোট বোন সিটকিনি লাগিয়ে দিল। প্রথমে অস্বস্তি। তারপর কথা। কীভাবে যেন অল্প সময়েই অচেনা দুজন মানুষ একে অপরের কাছে নিজেদের মনের দরজা খুলে দিলাম। ভালো লাগা, ভয়, স্বপ্ন সব কথা। আমরা জেনে গেলাম, আজই আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা। নিচ থেকে বারবার ডাক আসছিল, সময় হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কেউই ঘর থেকে বের হতে পারছিলাম না। কী এক অদ্ভুত অজানা আবেগ আমাদের দুজনকে ঘিরে ফেলেছিল! শেষবারের মতো একে অপরের হাত ধরে রইলাম। বিদায়ের মুহূর্তে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম। চোখে চোখ রাখলাম। তারপর নিঃশব্দে একটি চুমু, যেন অচেনা জীবনের সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম এবং শেষ স্বাক্ষর। নিচে এসে আংটি বদল হলো। সবকিছু যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন হবু শ্বশুর বললেন, “ছেলের বোন-ভগ্নিপতি, চাচা-মামারা কেউ তো নেই। এক দিন পরে বিয়েটা হলে সবাই আসতে পারবে। আমাদের আরও একটু ভালো লাগবে।” আমরা তাঁর কথায় আপত্তি করলাম না। পরদিন সকালে প্রায় বিশজনের বরযাত্রী নিয়ে আবার রওনা হলাম। মেয়ের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি বিশাল বিয়ের গেট। বাড়িজুড়ে উৎসবের সাজ। আমাদের সঙ্গে থাকা মুরব্বিরা অবাক হয়ে বললেন, “ওরা তো অনেক আয়োজন করেছে! আমরা কি এমন আয়োজন করতে পারব?” কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু কয়েক মিনিট পর সেই আনন্দ যেন বিষ হয়ে গেল। খালার বাড়িতে গিয়ে দেখি সবাই বিমর্ষ। কেউ কথা বলছে না। চোখাচোখি এড়িয়ে যাচ্ছে। শেষে খালু ধীরে ধীরে এসে আমার পাশে বসে বললেন, “বাবা, কষ্ট পেয়ো না। মেয়েটার বাবা খুব লোভী। গতকাল সন্ধ্যায় তোমাদের বিদায় দেয়ার পর এই গ্রামেরই এক চাকরিজীবী ছেলেকে ডেকে এনে মেয়েটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।” আমি কোনো কথা বলতে পারিনি। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, মানুষ কখনো কখনো কাঁদতেও পারে না। শুধু নির্বাক হয়ে যায়। আমরা সেই বিয়ের গেটের সামনে থেকে কীভাবে ফিরে এসেছিলাম, আজও ঠিক মনে নেই। মনে আছে শুধু, সেদিন আমার সঙ্গে আমাদের পরিবারের মান-সম্মান, অপমান আর অদৃশ্য কিছু কান্নাও বাড়ি ফিরেছিল। আব্বা ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হলেন। ছয় মাস পর আমি সেই মেয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামেই বিয়ে করলাম। সেই পরিবার ছিল ঐতিহ্য, সম্মান আর মর্যাদায় বহুগুণ এগিয়ে। আমার স্ত্রীও ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং সরকারি চাকরিজীবী। জীবন ধীরে ধীরে নিজের গতিতে চলতে লাগল। তারপর পনেরো বছর কেটে গেল। একদিন হঠাৎ সেই প্রথম মেয়েটির সঙ্গে একটি হোটেলে দেখা। আমি কথা বলতে ইতস্তত করছিলাম। কিন্তু সে পারল না। আমার সামনে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। “বিশ্বাস করো, সেদিনের জন্য আমি একটুও দায়ী ছিলাম না। মা আমার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু বাবা তাঁর জেদের কাছে আমাকে বাধ্য করেছিলেন। আমি অনেকবার নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম।” কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল। “এই পনেরো বছরে আমি এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে সুখী ভাবতে পারিনি। তোমাকে হারানোর পর বুঝেছি, মানুষ নিজের ভাগ্যকে সব সময় নিজের হাতে লিখতে পারে না।” আমি নীরবে শুনছিলাম। সে চোখ মুছে বলল, “তুমি সুখে আছ, ভালো আছ, এই খবরটুকুই আমাকে এত বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।” সেদিন হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে হলো, জীবনের কিছু গল্পের শেষ হয় না। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে না থাকার জন্য। শুধু একটি অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য। আর কিছু বিদায় থাকে, যার শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি সারা জীবন বুকের ভেতর বাজতে থাকে।
দেশের ধেয়ানে মাথা ঠান্ডা রেখে বসো মুখোমুখি বীর্যের ব্যঞ্জনা এনে বলো, অত্যাচারকে অত্যাচার; মানুষের কান্না শোনো, শুশ্রূষার জলে করো সুখী প্রতিরোধে প্রতিশোধ নাও, যে শত্রু স্বাধীনতার। মিছিলের সব পা কি এক রকমের হয় নাকি এই যে দল বেঁধেছ, তবুও কি তোমরা এক বলো? পাহাড়ের শীর্ষে উঠতে সাহসে না যেন থাকে ফাঁকি; বাঁধো জোট, দুর্দশায় কখনো যেয়ো না যেন ঢাকি। বাতাসের কী ক্ষমতা, মানুষের বোধ জাগানোর? হৃদয়ে রক্তক্ষরণ! শুনতে পাও নিঃশব্দ চিৎকার? কেবলই মানুষ পারে, বোধের উন্মেষ ঘটানোর; চেতনা-প্রত্যুষে জাগো, জাগো রে সন্তান মৃত্তিকার। চিৎকার দিতেই থাকো...শব্দ যদি ক্ষীণ হয়ে মরে তবু চিৎকার দরকার, নয়তো বিপ্লব আসবে কী করে?
বয়স বাড়লে মধ্যরাতে গলা শুকিয়ে যায় আমার এক আজন্ম জলতৃষ্ণা। বাল্যকালে গলা শুকিয়ে গেলে মা আমাকে পানি পান করাতেন যৌবনে আমি কারো পাণিগ্রহণ করিনি মধ্যবয়সে মধ্যরাতে মাথার পাশে এক বোতল পানি রাখার জন্য কেউ একজন থাকা উচিত। বৃদ্ধরা গলা শুকিয়েই মরে আমার তৃষ্ণার জল হেমলক হয়ে গলায় বিঁধে আহ! আমার এসব প্রবল জলতৃষ্ণা তা কেন মধ্যবয়সে বুঝিনি? আমার এক পানকৌড়ি জীবন জলে ডুব দিই, তবুও জলের তৃষ্ণা মেটে না।