Breaking news

ভারত

ছবি : সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি এবং আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন : বহুমুখী ভারসাম্যের নতুন সমীকরণ

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এখন তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে ‘ব্রিকস’ (BRICS)।   ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত জোটটি আর কেবল উদীয়মান অর্থনীতির অর্থনৈতিক ফোরাম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির এক প্রভাবশালী সমীকরণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান বিশ্বরাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।   আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা নিহিত রয়েছে গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মধ্যে। দীর্ঘকাল ধরে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই অনুভব করে যে তাদের স্বার্থ ও সমস্যাগুলো এই নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত থাকে। ব্রিকস এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। আসন্ন সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ন্যায্য বাণিজ্যের দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপিত হবে। পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একটি বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলার যে আকঙ্ক্ষা গ্লোবাল সাউথের রয়েছে, আসন্ন সম্মেলন তা বাস্তবায়নের একটি বড় মঞ্চ।   বর্তমান বিশ্বরাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রবণতা অনেক রাষ্ট্রকেই বিকল্প খোঁজার তাগিদ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের আসন্ন সম্মেলনে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার বিষয়টি অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্রিকস দেশগুলো ইতোমধ্যে তাদের নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়িয়েছে এবং একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা বা ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে ঋণ সহায়তার পরিধি বাড়াচ্ছে। আসন্ন সম্মেলনে যদি এই অর্থনৈতিক বিকল্প ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী রূপ নেয়, তবে তা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাবে।   বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে জোটের সম্প্রসারণ বা ‘ব্রিকস প্লাস’ (BRICS+) ধারণাটি আসন্ন সম্মেলনের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল ও মধ্যম শক্তির দেশ—যেমন মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো—এই জোটে যোগ দিতে তীব্র আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত সম্মেলনগুলোতে বেশ কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার পর আসন্ন সম্মেলনেও নতুন সদস্য পদপ্রার্থীদের নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এই সম্প্রসারণ প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্রিকসের গ্রহণযোগ্যতা ও আকর্ষণ দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তি বা অংশীদারত্ব বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে পারে, যা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।   তবে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের পথ যে একেবারে মসৃণ, তা বলা যায় না। এই জোটের অভ্যন্তরে কিছু নিজস্ব দ্বন্দ্ব ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অংশ। বিশেষ করে, ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা ব্রিকসের ঐক্যকে প্রায়শই পরীক্ষার মুখে ফেলে। ভারত একদিকে যেমন ব্রিকসের মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দিতে চায়, অন্যদিকে কোয়াড (QUAD) জোটের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। বিপরীত দিকে, চীন ও রাশিয়া এই জোটকে সরাসরি মার্কিন-বিরোধী একটি শক্তিশালী ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী। ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা আবার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পছন্দ করে। আসন্ন সম্মেলনে এই অভ্যন্তরীণ ভিন্নতা ও স্বার্থের সংঘাত দূর করে কীভাবে একটি যৌথ ইশতেহার এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা যায়, তা হবে জোটের নেতৃত্বের জন্য এক বড় পরীক্ষা।   একই সাথে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং তাইওয়ান প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বৈশ্বিক উত্তেজনা আসন্ন সম্মেলনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর ক্ষেত্রে ব্রিকস একটি বড় হাতিয়ার। পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন ব্রিকস সম্মেলন প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতির একটি বড় অংশ এখনো রাশিয়ার সাথে সংলাপে ইচ্ছুক। অন্যদিকে চীন এই সম্মেলনের মাধ্যমে গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারে তার আধিপত্য আরও সুসংহত করতে চাইবে।   পরিশেষে বলা যায়, আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন কেবল একটি রুটিনমাফিক কূটনৈতিক বৈঠক নয়। এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের এক স্পষ্ট প্রতিফলন। পশ্চিমা শক্তির বিকল্প কোনো সামরিক ব্লক তৈরি করা ব্রিকসের লক্ষ্য নয়, বরং একটি সমতাভিত্তিক, বহু-মেরুবিশিষ্ট এবং ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।   অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সত্ত্বেও যদি এই সম্মেলন থেকে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং বৈশ্বিক সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে তা সমকালীন বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সাফল্যের ওপর।  

সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
ভারতে আতশবাজির কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১২ জনের প্রাণহানি

ভারতের উত্তর প্রদেশের কৌশাম্বী জেলার একটি আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে দুই শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার ৩১ আগস্ট দুপুরের এ ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, আশপাশের কয়েকটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।   মানুরি বিমানঘাঁটির কাছে ঘটা এ দুর্ঘটনার সময় কারখানায় কাজ করছিলেন ১৫ জন শ্রমিক। পুলিশ জানায়, বিস্ফোরণে পুরো কারখানা ভস্মীভূত হওয়ার পাশাপাশি ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা ৭টি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রায় ২ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত এই বিস্ফোরণের জোরালো শব্দ শোনা যায়।   খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। উদ্ধারকাজে হাত লাগান পার্শ্ববর্তী বিমানঘাঁটির সদস্যরাও। দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা এক কিশোরী জানায়, সে কোনোক্রমে বের হতে পারলেও তার মা ও ছোট ভাই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে।   আদিল নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ওই কারখানায় কীভাবে এ ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। কারখানাটির সরকারি অনুমোদন ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল কি না, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।  

আগস্ট ৩১, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
ভূমি ব্যবহারে ভারতকে ৪টি শর্ত দেয়ার কথা ভাবছে বাংলাদেশ

ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের করিডর হতে গিয়ে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিতে চায় না বাংলাদেশ। আসামের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি হাইভোল্টেজ লাইন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে নেয়ার বিষয়ে ভারতের তাগাদার পর ঢাকা মূলত চারটি শর্ত সামনে আনার কথা ভাবছে।   সরকারি সূত্রমতে, এসব শর্ত পালিত হলেই কেবল করিডর দেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। প্রথম শর্ত হলো, ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এই লাইনে প্রবাহিত হবে কি না তা ভারতকে জানাতে হবে, কারণ এতে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরবঙ্গে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটান থেকে সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য আলাদা গ্রিড লাইনের সুযোগ দেয়া, এই লাইন দিয়ে বাংলাদেশ কী পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে তা স্পষ্ট করা এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে লাইন টানার আগে প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি হিসাব করার শর্তও দেয়া হচ্ছে।   গত ৬ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তবে মন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত যেভাবে গ্রিড লাইন নিতে চাচ্ছে, বাংলাদেশ সেভাবে ভাবছে না। বরং নেপাল, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশ মিলে একটি যৌথ গ্রিড লাইনের আলোচনা করতে চায় ঢাকা।   এর আগে জুলাইয়ের শেষে বিদ্যুৎ সচিবও দিল্লি সফরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিমও মনে করেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে চার দেশের যৌথ গ্রিড লাইন নির্মাণ জরুরি, যাতে সবচেয়ে সস্তায় বিদ্যুৎ আমদানি করা যায়।  

আগস্ট ২৯, ২০২৬ 0
ছবি : আনন্দবাজার
মোদি সরকার দাবি পূরণ না করায় আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা সিজেপির

সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদে ফের রাজপথে নামছে সিজেপি (ককরোচ জনতা পার্টি)। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে সমাবেশের ডাক দিয়েছে তারা। সেখান থেকে দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তর পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিল হবে বলে ২৫ আগস্ট জানিয়েছে সিজেপির ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি।   সিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, গত ২৫ জুলাই ‘তেলাপোকাদের’ আন্দোলন প্রত্যাহারে সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি মানা হয়নি। নেতা জানান, দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি এক মাস পরও সরকার পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁরা আবারও আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।   শীর্ষ নেতা অভিজিৎ, আশুতোষ ও সৌরভ বলেছেন, সমাবেশটি হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। মিছিলে নেতৃত্ব দেবেন আত্মঘাতী নিট পরীক্ষার্থীদের পরিবার এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা। আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে তাঁদের তিনটি দাবি ছিল—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব এফআইআর নিঃশর্ত প্রত্যাহার এবং আত্মঘাতী নিট পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে আর্থিক সহায়তা। তিন দাবি মেনে নেয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সিজেপি আন্দোলন প্রত্যাহার করে। কিন্তু শীর্ষ মন্ত্রীদের আশ্বাসের পরও সরকার বাকি দুটি দাবি না মানায় তাঁরা ফের পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন।   জানা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর এফআইআর প্রত্যাহার হলেও ফেশিয়াল রেকগনিশন প্রযুক্তিতে দিল্লি পুলিশ ২,৮৭৩ জন বিক্ষোভকারীকে চিহ্নিত করেছে। পুলিশের দাবি, এর মধ্যে ৯৮৯ জনের বিরুদ্ধে খুন-ধর্ষণের মতো পুরোনো অপরাধের রেকর্ড থাকায় তাদের মামলা তারা প্রত্যাহার করবে না। পুলিশের এই দাবি মানতে নারাজ সিজেপি। নেতারা বলছেন, দিল্লি পুলিশ আইন ও প্রযুক্তির অজুহাতে প্রতিশ্রুতি এড়াচ্ছে এবং সময় নষ্ট করছে। তারা সুপ্রিম কোর্টকেও বিভ্রান্ত করে তথ্য জমা দিচ্ছে না।   এক বিবৃতিতে সিজেপি নেতারা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, এক মাস পেরিয়ে গেলেও সরকার এফআইআর প্রত্যাহার বা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রাখেনি। তাঁরা হুঁশিয়ারি দেন, “আমরা এক মাস ধৈর্য ধরেছি। সরকার যেন একে আমাদের দুর্বলতা না ভাবে।”   ৫ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়া গেটে শান্তিপূর্ণ জমায়েতের আহ্বান জানিয়ে নেতারা বলেন, প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে আন্দোলন প্রত্যাহার করিয়ে সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।  

আগস্ট ২৫, ২০২৬ 0
প্রতীকী ছবি
রাজনীতির বলিদানে ধর্ম : মোদীপূজা ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সংকট

ভারতবর্ষ চিরকালই বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিকতার ভূমি। এখানকার সনাতন বা হিন্দু ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, মতবাদ কিংবা রাজনৈতিক এজেন্ডার গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল এক অন্তহীন অনুসন্ধানের পথ, যেখানে উপাস্য ছিলেন নিরাকার পরম ব্রহ্ম অথবা বহুধা বিভক্ত দেব-দেবী। কিন্তু একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে ভারতীয় রাজনীতি ও ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে এক বিপজ্জনক ও অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।   ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চারপাশে গড়ে ওঠা ব্যক্তি-উপাসনা বা ‘মোদীপূজা’ আজ কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচার ছাড়িয়ে এক উগ্র ধর্মান্ধতার রূপ নিয়েছে। এই প্রবণতা একদিকে যেমন ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিপন্ন করছে, অন্যদিকে সনাতন হিন্দু ধর্মের অন্তর্নিহিত উদার ও দার্শনিক চেতনাকে মারাত্মকভাবে কলঙ্কিত করছে।   গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নেতা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। তিনি সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গত এক দশকে ভারতে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখানে নীতি ও আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিই প্রধান হয়ে উঠেছে। মোদীর প্রতিটি পদক্ষেপকে দৈব আশীর্বাদ বা অলৌকিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করা দল বা সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে নেতার ব্যক্তিগত ইমেজকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।  আধুনিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মোদীকে দেশের বিকল্পহীন ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নেতার সমালোচনা করা মানেই দেশদ্রোহিতা বা হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা—এমন একটি অবাস্তব সমীকরণ তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের একাধিপত্যবাদী মানসিকতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন অঙ্গগুলো আজ নেতার ব্যক্তিগত শক্তির ছায়াতলে ম্লান।   সনাতন হিন্দু ধর্ম অত্যন্ত প্রাচীন এবং এর পরিধি বিশাল। উপনিষদ থেকে শুরু করে ভক্তি আন্দোলন—সব জায়গাতেই অহংকার ত্যাগ, বিনয় এবং সত্যের সন্ধানের কথা বলা হয়েছে। রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ কিংবা মহাত্মা গান্ধীর হিন্দু ধর্মে মানুষের সেবাই ছিল মূল ধর্ম।  হিন্দু ধর্মে মানুষ পূজা করার কোনো বিধান নেই। জীবিত কোনো রাজনৈতিক নেতাকে ঈশ্বরের আসনে বসানো বা তাঁর মূর্তিপূজা করার মতো কদর্য আচরণ শাস্ত্রের পরিপন্থী। সনাতন ধর্মের মূল কথা ছিল ‘সব ধর্ম সমান’ এবং ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (সারা পৃথিবী এক পরিবার)। কিন্তু মোদীপূজার সংস্কৃতি আজ অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতাকে উসকে দিচ্ছে। ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্থান থেকে সরিয়ে এনে রাজনৈতিক মঞ্চের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এর ফলে ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে জনমানসে বিভাজন তৈরি করা সহজ হচ্ছে।   একটি সুস্থ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো বহুমুখী মতপার্থক্য এবং সরকারের জবাবদিহি। যখন কোনো দেশের প্রধানকে ঘিরে ভক্তির বাতাবরণ তৈরি হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রশ্ন করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সরকারের যেকোনো নীতির বিরোধিতা করলেই তাকে দেশবিরোধী তকমা দেয়া হচ্ছে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশেষ এক নেতার ধর্মানুষ্ঠান ও তার মাত্রাতিরিক্ত প্রচার রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।  ভিন্নধর্মী বা ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তারা নিজেদের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বোধ করছেন।   মোদীপূজার রাজনীতি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবদল ঘটায়নি, এটি ভারতীয় সমাজকে গভীরভাবে বিভক্ত করে দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার এই খেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। রাষ্ট্র যখন একটি নির্দিষ্ট দর্শন ও নেতার গুণগানে মত্ত হয়, তখন দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের প্রান্তিক ও অসুরক্ষিত মনে করে। ধর্মান্ধ সমর্থকরা অনেক সময় আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দ্বিধা করে না। এর ফলে সমাজে হিংসা ও হানাহানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।  ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। যে দেশ বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ছিল, সেখানে একরৈখিক সংস্কৃতির চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে।   ইতিহাস সাক্ষী আছে, যেকোনো রাষ্ট্রে যখনই কোনো শাসক নিজেকে সর্বেসর্বা বা ঈশ্বরের অবতার বলে জাহির করার চেষ্টা করেছেন, তার পরিণতি দীর্ঘ মেয়াদে শুভ হয়নি। সাময়িক উন্মাদনা তৈরি করা গেলেও তা রাষ্ট্রের আসল ভিতকে দুর্বল করে দেয়।   ভারতের রাজনীতি ও হিন্দু ধর্মকে এই অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে হলে সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি-উপাসনার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে সংবিধান প্রদত্ত যুক্তিবাদ, সহনশীলতা ও সমতার ভিত্তিতে সমাজ গঠন করতে হবে। ধর্মকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং রাজনীতিকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার সময় এসেছে। মোদীর এই কৃত্রিম উপাসনা বন্ধ না হলে তা কেবল আজকের রাজনীতি বা ধর্মকেই নয়, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও চিরতরে কলঙ্কিত করবে।  

আগস্ট ২৫, ২০২৬ 0
ছিবি : বিবিসির সৌজন্যে
মার্কিন সিনেটে বিশেষ বিল পাস : ১০০% শুল্কের মুখে চীন, ভারতসহ ৫ দেশ

  রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয়ের অভিযোগে ভারত, চীনসহ অন্তত পাঁচটি দেশের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পথ সুগম করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সংক্রান্ত ‘রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের একটি বিল সম্প্রতি মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে পাস হয়েছে। প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে ও. গ্রাহাম বিলটি উত্থাপন করেছিলেন।   বিলে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যেসব দেশ রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনে মস্কোকে যুদ্ধের তহবিল জোগাতে সহায়তা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শতভাগ রপ্তানি শুল্ক চাপাতে পারবে। বিলটি আইনে পরিণত হলে ভারত ও চীনের পাশাপাশি আজারবাইজান, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে, যারা যুদ্ধের সময় সরাসরি রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।   সিনেটে বিলটির পক্ষে ৮৬ জন এবং বিপক্ষে ১১ জন সদস্য ভোট দেন। আগামী ৩১ আগস্ট প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশনে এটি পাঠানো হবে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন এবং এরপর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিলটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হবে।   বিলে রুশ তেলের ক্রেতাদের ওপর শুল্ক আরোপের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, রুশ ধনকুবের ও তাঁদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল বিলটিকে আগ্রাসনে সহায়তাকারীদের জন্য 'বড় এক ধাক্কা' বলে আখ্যায়িত করেছেন।  

আগস্ট ৮, ২০২৬ 0
সৌজন্যে : আনন্দবাজার পত্রিকা
শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফেরত পাঠানোর আবেদন ‘খতিয়ে দেখছে’ ভারত

ভারতীয় কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি সরকারকে এ-সংক্রান্ত প্রশ্ন করেছিল। সরকারের উত্তর সংবলিত 'ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কবিষয়ক রিপোর্ট'টি ৩০ জুলাই সংসদের উভয় কক্ষে পেশ করা হয়। পরদিন তা 'ডিজিটাল সংসদ' ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।   রিপোর্ট অনুযায়ী, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের পর বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণের অনুরোধটি কমিটি আমলে নিয়েছে এবং এ বিষয়ে নিয়মিত অবহিত করার আহ্বান জানিয়েছে। উত্তরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রযোজ্য আইন ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ প্রত্যর্পণের অনুরোধটি পর্যালোচনা করছে।   কমিটি আরও উল্লেখ করেছে যে, চরম দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেয়ার ভারতীয় সভ্যতাগত ও মানবিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থান করতে দেয়া হয়েছে।   ভারত সরকার কমিটিকে নিশ্চিত করেছে যে, শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ প্রদান করা হয়নি কিংবা ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগও দেয়া হয়নি। এই নীতি কঠোরভাবে মেনে চলায় কমিটি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।   পরিশেষে, নিজস্ব মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা বজায় রেখে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে পরিস্থিতিটি পরিচালনা করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারকে সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।  

জুলাই ৩১, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

২৪-এর সাতকাহন

শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়।   কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ।   চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা।   এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।  

এক দিনের জন্য যদি সবাই সত্য কথা বলত

পৃথিবীতে এমন একটি দিন কল্পনা করা যাক, যেদিন কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারবে না। ইচ্ছা থাকলেও সত্যকে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না। মুখে যা আসবে, তা আড়াল করার আগেই প্রকাশ পাবে। সম্পর্ক, রাজনীতি, ব্যবসা, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা সেদিন হঠাৎ প্রকাশ্যে চলে আসবে। মিথ্যাগুলোর সত্যরূপ বের হয়ে যাবে। পৃথিবীটা ওই দিন চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ নিজের এবং অন্যের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে শিখবে। বাস্তব বিষয়টা জানবে।   মানুষের জীবনে মিথ্যার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক। মিথ্যাটাকে মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করা হয় নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে, কখনো নিজের দুর্বলতা লুকাতে। আবার কখনো মিথ্যা হয়ে ওঠে স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে থেকেই মানুষ শিখে যায় কোন সত্য বলা যায়, কোন সত্য গোপন রাখতে হয় এবং কখন একটি মিথ্যা পরিস্থিতিকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই সুযোগটি এক দিনের জন্যও না থাকে?   সকালের শুরুতেই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বহু প্রশংসা হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যাবে। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা সুবিধা পাওয়ার যে অদৃশ্য পথগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে। কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হবে, কেউ অন্যের প্রাপ্য কৃতিত্ব নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সুন্দর মুখোশের আড়ালে থাকা অসংগতি মানুষের সামনে চলে আসতে পারে। সত্যের পর্দায় আড়াল করা দুর্নীতি, অবিচার সব উন্মোচিত হয়ে যাবে।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়বে। ভালো ফলাফলের পেছনে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে চাপ, ভয়, তুলনা ও প্রত্যাশা কাজ করে, সেগুলো প্রকাশ পাবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো প্রথমবার স্বীকার করবে যে সব সময় ভালো থাকার অভিনয় তাদের কতটা ক্লান্ত করে। অভিভাবকেরাও বুঝতে পারবেন, সন্তানের ভালো ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কখনো কখনো সন্তানের নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেয়।   বন্ধুত্বের জায়গাটি সেদিন মোটেও সহজ থাকবে না। বহু বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিছু না বলা কথা, ছোটখাটো অভিমান কিংবা গোপন ঈর্ষার ওপর। সত্য প্রকাশের দিনে সেই আবেগগুলো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কিছু বন্ধুত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আবার কিছু বন্ধুত্ব আরও শক্ত হতে পারে। কারণ, সত্য কখনো কখনো সম্পর্ক শেষ করে, আবার কখনো সম্পর্ককে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচায়।   পরিবারের ক্ষেত্রেও দিনটি হতে পারে সবচেয়ে কঠিন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে অভিমান, প্রত্যাশা, ভয় ও না-পাওয়া জমিয়ে রাখে, সেগুলো সামনে আসবে। হয়তো কেউ প্রথমবার বুঝতে পারবে, তার কাছের মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। আবার কেউ উপলব্ধি করবে, ভালোবাসার নাম করে সে অন্যের ওপর কতটা চাপ, কতটা অভিনয় করেছে।    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও ব্যতিক্রম হবে না। সেদিন সাজানো জীবন দেখানোর সুযোগ থাকবে না। সাফল্যের ছবির পাশাপাশি ব্যর্থতার গল্পও প্রকাশ পাবে। আনন্দের পোস্টের আড়ালে থাকা একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থাকা ভয় কিংবা নিখুঁত জীবনের ছবির পেছনের বাস্তবতা সামনে চলে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে, পর্দায় দেখা জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তবে সত্যের সেই দিনটি শুধু অস্বস্তিকর হবে না; শিক্ষণীয়ও হবে।   মানুষ বুঝতে পারবে, সত্য সব সময় সুন্দর নয়। সত্য শুনলে কষ্ট হয়, কিছু সত্য সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মিথ্যার ওপর তৈরি শান্তি অনেক সময় সাময়িক। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পর যে সম্পর্ক টিকে যায়, সেটি আগের চেয়ে বেশি বাস্তব।   দিন শেষে পৃথিবী আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মানুষ আবার প্রয়োজনমতো কিছু কথা লুকাবে, কিছু কথা সাজিয়ে বলবে, কিছু সত্য নিজের ভেতরে রেখে দেবে। কিন্তু সেই এক দিনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যাবে।   হয়তো সবাই প্রতিদিন পুরোপুরি সত্য বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত নিজের কাছে সত্যি থাকার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী অনেক সময় অন্য কেউ নয় নিজের কাছেই নিজের বলা মিথ্যাগুলো   এক দিনের সত্য পৃথিবীকে বদলে দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষকে নিজের মুখোশের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে এটুকু নিশ্চিত। আর হয়তো সেই এক দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে, সত্য সম্পর্ক ভাঙার থেকে মিথ্যার তৈরি দেয়াল সরিয়ে সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলা।  

হিসাবের খাতা

ছোটবেলার অবুঝ হাত ছুঁতে যেত দিন ও রাত— আগুন, জল কিংবা ফুল ছিল না হিসেব, কোনটা ভুল। না বুঝেই কেউ অবহেলায় কাছে টেনে নেয় ভালোবাসায়। মোহের পর্দা যখন ওড়ে বাস্তবতা ধাক্কা মারে। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় কার কী গুণ, কার কী ক্ষয়। ভুলগুলো সব চেনা যায় কিন্তু ফেরার সময় নাই। জীবন বুঝতে বুঝতেই শেষ উবে যায় সব রঙিন রেশ। হাতে থাকে শুধু ধূসর ছাই পেছনে ফেরার উপায় নাই।  

Top week

সাহিত্য

সেবিকা

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ 0