Breaking news

প্রেমের গল্প

বিশ্বাসের নৌকা

নিরুবালা সেদিন বর্ষার রাতে জিজ্ঞেস করছিল, “এই ভর রাইত্তে কই যাও, মাঝি?” মাঝিও মেঘের মতো গুম কণ্ঠে জবাব দেয়, “আকাশের অবস্থা ভালা না। নদীতে জোয়ার আইছে। ঘাটে নৌকা বাইন্ধা ঘরে থাহন যায় না। নৌকাডা শক্ত কইরা গাছের লগে বাইন্ধা আহি।” “মাত্রই তো আইলা বাইরে থাইক্কা, না গেলেই ভালো অয়।” “নাহ, নৌকাডা গেলে খামু কী? যাইতেই অইব!”   বের হয়ে কিছুদূর গিয়ে মাঝি আবার ফিরে আসে দরজার কাছে। একটু থমকে জিজ্ঞাস করে— নিরু কি দুয়ারে? নিরুবালা উত্তর দেয় না, ইস্পাত কঠিন কণ্ঠস্বরে ভয় নিয়ে বলে— সাবধানে যাইয়ো মাঝি। ছাতা নিয়া যাও। বৃষ্টিতে ভিজলে শইলে জ্বর আইব।   মাঝি ঘাটে আর যায় না। উঠানেই ভিজে ভিজে ভাবতে থাকে কী করবে। অঝোর বৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ভিজে বেখায়ালির মতো আবার ফিরে এসে সে নিরুর ঘরে টোকা দেয়— কী রে নিরু, দরজা খোলস না ক্যান? শইল আমার ভিইজা জল পড়তাছে।   নিরুবালা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়া মাঝির মাথা মুছে। এদিকে নিরুর শরীরও ভেজা। কীভাবে ভিজল সেটা নিয়ে ভাবনা এলেও পরক্ষণেই মাঝি সব ভুলে যায়। নিরুবালার শরীরের সুবাস তার নাকে এসে লাগে। বাইরের ঝড়-ঝঞ্ঝা, নৌকা সবকিছু বেমালুম ভুলে যায়। নদীর জোয়ারের চেয়ে শরীরের জোয়ার বেশি হলে তখন আর ঝড়-বৃষ্টি চোখে লাগে না। মাঝি তার শক্ত সুঠাম শরীর বের করে বিছানায় যায়। নিরু তার উন্মুক্ত বক্ষ মেলে ধরে, জল গড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর পথেঘাটে। অসাদৃশ্যতায় লুটিয়ে যায় দুই মানব-মানবী!   এরপর যেনো মাঝির চোখে হলুদ ফুলের বাগান ভাসতে থাকে। নৌকার কথা বেমালুম ভুলে ঠাণ্ঠা ঠাণ্ঠা আবহাওয়ায় নিরুকে আরও জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরবেলা মাঝি ঘাটে গিয়ে দেখে, নৌকা স্রোতের টানে ভেসে গেছে। ঘরে ফিরলে নিরুবালা চালাকি চোখে মুচকি হেসে জিগ্যেস করে— কী গো মাঝি, নৌকা বান্ধা শেষ হইল তোমার? মাঝি পাহাড়সমান বিষণ্নতা মুখে নিয়ে ঝাড়ি দেয়— না রে, জোয়ারে ভাইসা গ্যালো গা নৌকাটা! কাইলকা তুই বাধা না দিলে ঠিকই বাইন্দা আইতাম। এহন নৌকা ছাড়া করুমডা কী, খামু কী? মুখ ঝামটা মেরে নিরুবালা বলে— নদীর জোয়ার নাকি শইল্যের জোয়ার? মাঝি তখন আরও চোখ গরম কইরা বলে— "শইল্যের জোয়ারে কি নৌকা ভাসে? নাহ, শইল্যের জোয়ারে নৌকা ডুবে।   মাঝি ঘরের মেঝেতে রাখা খাবারের থালায় লাথি দিয়ে বলে— এই চিনলি আমারে? বিশ্বাস নাই? নিরুবালা অভিমান করে। স্বল্পস্বরে জবাব দেয়— হু!   মাঝি রাগ নিয়ে গজর গজর করতে করতে ঘরের পেছনে গিয়ে দেখে, গাছের সাথে শক্ত করে বাঁধা আছে তার নৌকা। কে বাঁধল সেটা মাথায় আসার আগেই মাঝি খুশিতে চিল্লায়ে ওঠে— নিরু, নিরু রে... নৌকা আছে। নৌকা ভাইসা যায় নাই।   নিরুবালা অস্পষ্ট স্বরে জবাব দেয়, কিন্তু মাঝি ততক্ষণে কাছে চলে আসতেই শুনতে পায়— শখের নৌকা ভাসে নাই, ভাইসা গ্যাছে বিশ্বাসের নৌকা।   মাঝি কিছু একটা আঁচ করে ফেলে। শুধরায়— নৌকা কি রাইতে তুই বান্দন দিছস?   নিরু শুনতে পায় না মাঝির কথা। ভেজা চোখে ফুঁপিয়ে উঠে— মাঝি, আমারে তুমি ভালোবাসো না, নাহ?  

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 1
একটি হাসির জন্য

কলেজের শেষ ক্লাসটি নিয়ে যখন বের হলাম, তখনো আকাশে বিকেলের রোদ ঝিকমিক করছিল। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই চারদিক যেন থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে নীল আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। প্রকৃতি নিস্তব্ধ, যেন ভয়ংকর এক কালবৈশাখীর অপেক্ষায়। আমি তখন শাওনাজ রোডে, বাসার কাছাকাছি। হঠাৎ ধুলোবালির উন্মত্ত ঝাঁপটা শুরু হলো। চোখ মেলাই দায়।   এমন সময় রাস্তায় পড়ে থাকা একটি তরমুজের খোসায় পা পিছলে আছাড় খাওয়ার উপক্রম। শেষ মুহূর্তে পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি আঁকড়ে নিজেকে সামলালাম। ঠিক তখনই বাম পাশের চারতলা বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে ভেসে এল খিলখিল হাসি।   তাকিয়ে দেখি, এক অপরূপা তরুণী আমার দুরবস্থা দেখে হেসে কুটিকুটি। চোখাচোখি হতেই সে লজ্জা পেয়ে বারান্দায় মেলে দেয়া কাপড়গুলো গুছিয়ে দ্রুত ভেতরে চলে গেল। আমি তখনো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর ছয়-সাত বছরের একটি ছেলে বারান্দায় এসে গম্ভীর মুখে বলল- এই যে মিস্টার, হাঁ করে থাকবেন না, মুখে মশা ঢুকবে কিন্তু! কথাটি বলেই সে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।   এরই মধ্যে নেমে এল মুষলধারে বৃষ্টি, সাথে ঝড়। আশ্রয় নিলাম রাস্তার ডান পাশের একটি চায়ের দোকানে। এমন একটি কোণে বসলাম, যেখান থেকে ওই বারান্দাটি স্পষ্ট দেখা যায়। ধূমায়িত চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম, মেয়েটি কি আমাকে অপমান করল? পরক্ষণেই নিজেকে বুঝিয়ে বললাম, রাস্তায় এমন কাণ্ড ঘটলে যে-কেউ হাসতেই পারে। তবু কেন জানি ওর হাসিটা বারবার কানে বাজছিল। মনে হচ্ছিল, ঝরনার কলকল ধ্বনির মতো নির্মল, আবার কোথায় যেন অদ্ভুত এক মাদকতা লুকিয়ে আছে।   বাড়ি ফিরতেই দেখি মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। সেই শিশুকালে এক কালবৈশাখী ঝড়ে নৌকাডুবিতে আমাকে আর মাকে বাঁচাতে গিয়ে বাবা চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছেন চিনিডাঙ্গা বিলের অতল জলে। তার পর থেকে মা-ই আমার সমস্ত পৃথিবী। আমি স্থানীয় এ জি সরকারি কলেজে বাংলা পড়াই, আর অবসরে কবিতা লিখি।   ঘটনাটা মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। নাশতা শেষ করেই কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলাম। অদ্ভুত এক অভিমান আর মুগ্ধতা মিলেমিশে জন্ম দিল একটি কবিতার-   এলোকেশী সুহাসিনী   তুমি সুহাসিনী তুমি হেমাঙ্গিনী কেমন তোমার মন? পথিক বেভুল আজ চুলবুল তাই হাসিতে উচাটন?   গোধূলি লগ্নে কী কুক্ষণে দীঘল কুন্তল ছড়ালে; ঘনঘটা কালে এলোচুলে কালবৈশাখী আনলে।   কালোর মাঝে সেই সাজে কলকলানো হাসি; আকাশ জুড়ে আঁধার ফুঁড়ে এলো আলোর শশী।   কারও কষ্টে স্বীয় তুষ্টে এ কেমন ভব্যতা? নির্দয় তুমি, পাষাণ তুমি এ কেমন সভ্যতা!   কবিতাটি সেদিনই লোক মারফত দৈনিক দিনমণি পত্রিকার সম্পাদক জগলু জোয়ার্দারের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। এরপর প্রায় প্রতিদিন বিকেলে সেই চায়ের দোকানে বসি। আলো-ছায়ার ঝিলিক চলছিল।  একদিন চায়ে চুমুক দিচ্ছি, এমন সময় সেই ছোট্ট ছেলেটি হাতে একটি পত্রিকা নিয়ে হাজির। আপনিই রেজাউল আলম সরকার? হ্যাঁ, কেন? সে সাহিত্যপাতা খুলে আমার সামনে ধরল। 'এলোকেশী সুহাসিনী' কবিতাটা কি আপনার লেখা? জি। ভালোই লিখেছেন বটে। কিন্তু তাই বলে কাউকে অপমান করতে পারেন? আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, মানে... আমি... এত মানে করার দরকার নেই। চলুন, আমাদের বাসায়। আমি ইতস্তত করলেও সে কোনো সুযোগ দিল না। বাধ্য হয়ে তার সঙ্গে গেলাম।   ছেলেটির নাম লাবিব খান জনি। আর সেই হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটির নাম লায়লা খানম জুঁই। মা, মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। সেদিন ওদের মা বাড়িতে ছিলেন না। পরিচয়ের সেই শুরু। তারপর জনির দুষ্টুমি আর জুঁইয়ের প্রাণখোলা হাসির টানে প্রায়ই ওদের বাসায় যাওয়া-আসা শুরু হলো। কখন যে জুঁই আমার প্রতিদিনের অপেক্ষা হয়ে উঠল, নিজেও বুঝতে পারিনি।   ঠিক এই সময়ের কিছুদিন আগে মা আমার বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন- রেজা, তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি। তুই কি মেয়েটিকে একবার দেখবি? আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিলাম- মা, তুমি যাকে পছন্দ করবে, তাকেই আমি বিয়ে করব। দেখাদেখির কোনো প্রয়োজন নাই।   কিন্তু এতদিনে আমার মনজুড়ে জায়গা করে নিয়েছে জুঁই। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে সম্পাদক  জগলু জোয়ার্দারের  কাছে গেলাম। সব শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- মা সারাটা জীবন তোকে নিয়েই বেঁচেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তকে অবহেলা করিস না। আগে তাঁর প্রতি দায়িত্ব পালন কর।   বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। তবু শেষবারের মতো জুঁইকে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ডেকে সব খুলে বললাম। আমার কথা শেষ না হতেই জুঁইয়ের মুখের রং বদলে গেল। কিছুক্ষণ নির্বাক বসে থেকে সে ফিসফিস করে বলল- তাহলে এতদিন যা বলেছ, সবই মিথ্যে? আমি মাথা নিচু করে বললাম- মাকে কষ্ট দিতে পারব না, জুঁই। জুঁই ছলছল চোখে ধীরে  উঠে দাঁড়াল। এরপর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে একনাগাড়ে বলে উঠল- তুমি ভণ্ড... প্রতারক... বিশ্বাসঘাতক! আমাদের সমাজে প্রেমে পড়ার সময় সব পুরুষই একেকজন বীরপুরুষ রূপ নেয়। কিন্তু বিয়ের সময় মায়ের একটা ধমক কিংবা অনুভূতির দোহাই শুনলে একসাথে পদ্মা-মেঘনা পাড়ি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছেলেটাও আর ছোট্ট একটা ড্রেন ডিঙানোর সাহস পায় না! তোমার মতো কাপুরুষের মুখে প্রেম কিংবা শিক্ষকতার মতো মহান পেশা কোনোটাই মানায় না! আর একটি মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সে হনহন করে দ্রুত বেরিয়ে গেল। সেদিনের পর যেন আমার ভেতরের সমস্ত আলো নিভে গেল। ক্লাসে মন বসে না, লেখায় মন বসে না, সিনেমা দেখতেও ভালো লাগে না। চারপাশে মানুষ আছে, অথচ আমি ভীষণ একা। স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে এসে বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে।   নিজেরই লেখা কয়েকটি পঙক্তি আমাকে তাড়া করে ফেরে- কোথায় পালাবে? কোথায় লুকাবে? যাবে কোথায়? কতদূর? আমার স্মৃতিকণার মিছিল রইবে যাবে তুমি যতদূর!   মা প্রায়ই মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করতেন- কী হয়েছে বাবা? তোর কীসের এতো  কষ্ট? আমি মৃদু হেসে বলতাম- না মা। 'মোমের শেষ শিখা' শিরোনামে একটা ট্র্যাজিক গল্প লিখছি। তাই মনটা একটু ভার। মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। আমার মন খারাপের সময় মা শুধু চুলে বিলি কেটে বলতেন- একটু ঘুমিয়ে নে। আমি চোখ বন্ধ করে মৃত মানুষের মতো পড়ে থাকতাম, কিন্তু ঘুম আসত না।   অবশেষে বিয়ের দিন এল। নিজেকে নিজে টেনে চলছি। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাসরঘরে ঢুকতেই বুকের ভেতর অপরাধবোধ আরও তীব্র হয়ে উঠল। ঘোমটা দেয়া নববধূর সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বললাম- তুমি আজ থেকে আমার জীবনসঙ্গিনী। তাই তোমার কাছে কিছু লুকাতে চাই না। আমি একসময় একজনকে ভালোবাসতাম। কথা শেষ হতেই নববধূ অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলে উঠলেন- তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন? আমিও তো একজনকে... কিন্তু যখনই কনে ঘোমটা ফেলে দাঁড়িয়ে গেল তৎক্ষণাৎ আমরা চরম বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম! অতঃপর এক গাল হাসি দিয়ে- তুমি!  একসঙ্গে উচ্চারিত হলো শব্দটি। ‘তুমি’ বলেই আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্বয়ং আমার  জুঁইফুল!   চুড়ির রিনিঝিনি শব্দের সাথে বারান্দার সেই খিলখিল হাসি আজও আমার কানে বাজে। পার্থক্য শুধু একটাই সেদিন সে ছিল অচেনা এক রূপসী, আর আজ সে আমার ঘরের আঙিনায় ফুটে থাকা চিরচেনা জুঁইফুল।  

আগস্ট ৫, ২০২৬ 0
Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

Top week

সাহিত্য

নগরীর দেবী

অক্টোবর ১৬, ২০২৬ 0