সভ্যতার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পোশাক বদলেছে, প্রযুক্তি সারা বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু মানুষের হিংস্রতার রূপটি যেন আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মহাশূন্যে মানুষের আজ অবাধ যাতায়াত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। অথচ দিনশেষে যখন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়, তখন তার সবটুকু আক্রোশ গিয়ে পড়ে মানুষের ওপরই।
ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বা ভূখণ্ডের লোভে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তার মূল লক্ষ্যবস্তু কেন দিনশেষে রক্ত-মাংসের মানুষই হয়ে ওঠে? রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধবাজ শাসকেরা যখন মানচিত্র বদলের খেলায় মাতেন, তখন তাঁরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন মানুষকেই। একটি দেশের মাটি বা কংক্রিটের ইমারত ধ্বংস করার চেয়েও বেশি শক্তিশালী বার্তা দেয়, যখন সেখানকার লাখো মানুষকে বিপন্ন করা যায়।
যুদ্ধ মানেই প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া। আর একটি জাতির মেরুদণ্ড তো তার মানুষই। তাই শত্রুকে মানসিকভাবে পঙ্গু করতে এবং আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে মানবদেহ ও প্রাণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভূমি দখল, সম্পদ ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার ইতিহাস মানবসভ্যতার এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন যুগে সাম্রাজ্য বিস্তার, সীমানা বৃদ্ধি এবং নিজেদের অস্তিত্ব বা কর্তৃত্ব জানান দিতে গিয়ে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
ম্যাসিডোনীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য মহামতি অ্যালেক্সান্ডার গ্রিস থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড দখল করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মঙ্গোল অভিযানে চেঙ্গিস খান ও তাঁর উত্তরসূরিরা এশিয়ার সিংহভাগ এবং পূর্ব ইউরোপ দখল করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ডভিত্তিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। যেকোনো ভূমির আসল শক্তি হলো সেখানে বসবাসকারী জনগণ। কৌশলগত, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে যুদ্ধগুলোতে বেসামরিক ও সাধারণ মানুষকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। ভূমি দখলের পর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে বিজয়ী শক্তি স্থানীয় জনগণকে উচ্ছেদ করে, হত্যা করে বা শরণার্থী হিসেবে বিতাড়িত করে নিজেদের অনুগত জনগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিজিত অঞ্চলের মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়ে বা বাধ্যতামূলক শ্রমে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ফায়দা লোটা হতো। সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ বা আতঙ্ক সৃষ্টি করলে প্রতিপক্ষ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে । শাসক বা সেনাবাহিনী যাতে দ্রুত আত্মসমর্পণ করে, সে জন্য সাধারণ জনগণকে জিম্মি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দখলকৃত ভূমির মানুষ যাতে ভবিষ্যতে বিদ্রোহ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে, সে জন্য সম্ভাব্য নেতৃত্ব বা তরুণ সমাজকে নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়। শত্রুপক্ষের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করতে বাড়িঘর, কৃষিজমি ও খাদ্যব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করে। ভূমি দখলের যুদ্ধগুলো কেবল মাটির জন্য নয় বরং সেই মাটির ওপর থাকা সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের লড়াই। আর মানুষ সেখানে লক্ষ্যবস্তু হয়, কারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল না করতে পারলে দখলকৃত ভূমির ওপর স্থায়ী আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দুটি সংঘাত, যার প্রত্যক্ষ পরিণামে কোটি কোটি মানুষের প্রাণহানি, সাম্রাজ্যের পতন এবং চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল। এ দুই মহাযুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে সাধারণ মানুষকে কেবল সৈনিক বা শ্রমশক্তি নয়, সরাসরি যুদ্ধের অস্ত্র বা বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
যুদ্ধে সৈন্যদের মাসের পর মাস কাদামাটি ও পচা পানির খন্দে আটকে রেখে কামানের গোলার মুখে ঠেলে দেয়া হতো। ক্লোরিন ও মাস্টার্ড গ্যাসের মতো বিষাক্ত গ্যাস প্রথম ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের ফুসফুস পুড়িয়ে তিলে তিলে মারত। বন্দীদের ওপর অমানবিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিষাক্ত অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হতো, যা ছিল সম্পূর্ণ অমানবিক। জাপানি সেনাবাহিনী কামিকাজে হামলায় যুবকদের স্বেচ্ছামৃত্যুর মুখে বা প্লেন চালক হিসেবে বিস্ফোরক সমেত শত্রু জাহাজে আছড়ে পড়তে বাধ্য করে। সাধারণ মানুষকে অনাহার ও দাসশ্রমের মাধ্যমে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কারখানায় ব্যবহার করা হতো।
রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রচার করে মানুষকে অন্ধ ভক্ত ও আত্মঘাতী হাতিয়ারে পরিণত করা হতো। মানুষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের লোভে মানুষই প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। রাশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বড় বড় রাজতন্ত্র ভেঙে পড়ে। নাৎসি জার্মানি বা ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলো নির্দিষ্ট জাতি বা সম্প্রদায়কে ‘হীন’ বা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে নির্মূল করার নীতি নেয়।
বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি বিশাল অংশ প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অস্ত্র ব্যবসা সচল রাখতে সংঘাতের প্রয়োজন, আর সংঘাত জিইয়ে রাখতে মানুষকে হাতিয়ার বানানো অপরিহার্য। যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নীতি ও রাজনীতিতে মানবজীবনের চেয়ে অস্ত্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য বেশি থাকবে, ততদিন মানুষকে এই ধ্বংসাত্মক খেলায় গুটি হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কারও জন্যই আজ আর যুদ্ধক্ষেত্র নিরাপদ নয়। ফিলিস্তিন থেকে ইউক্রেন কিংবা ইতিহাসের পাতায় ধূসর হয়ে যাওয়া সিরিয়া বা একাত্তরের বাংলার জনপদ—সর্বত্রই সাধারণ মানুষের আর্তনাদ যুদ্ধের আসল চেহারা উন্মোচন করে।
আফ্রিকা মহাদেশেও ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, সম্পদ দখল ও জাতিগত বিরোধের কারণে বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও সংঘাত সংঘটিত হয়েছে। এসব যুদ্ধের মূল কারণ ছিল ঔপনিবেশিক সীমান্ত বিভাজন, প্রাকৃতিক সম্পদের লোভ ও জাতিগত দ্বন্দ্ব। এর ফলে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি ঘটে। দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধকে আফ্রিকার মহাযুদ্ধ বলা হয়। এতে আটটি দেশ সরাসরি অংশ নেয়। এর কারণ ছিল খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল। সহিংসতা, রোগ ও অনাহারে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। রুয়ান্ডার গনহত্যায় হুতু ও তুতসি জাতির মধ্যে চরম জাতিগত বিরোধের জেরে মাত্র তিন মাসে প্রায় ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়।
যখন সাধারণ মানুষকে হত্যা বা আহত করা হয়, তখন পুরো সমাজ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা বা ভীতি প্রতিপক্ষকে সহজেই মাথানত করতে বাধ্য করে। যেকোনো ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন খনিজ, তেল বা উর্বর ভূমি মূলত মানুষের শ্রম ও অধিকারের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষকে সরিয়ে বা দমন করে সেই সম্পদের ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়। একটি দেশকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করতে হলে তার মানব ভিত্তি বা সমাজকে গুঁড়িয়ে দিতে হয়।
মেধাবী মানুষ, তরুণ প্রজন্ম এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করলে সেই জাতি শতাব্দী ধরে পিছিয়ে পড়ে। যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান আনে না, এটি কেবল নতুন প্রতিশোধের আগুন জ্বেলে দেয়। যতদিন না মানুষ বুঝতে পারবে যে অন্য প্রান্তের মানুষটিও তার মতোই রক্ত-মাংসের প্রাণী, ততদিন এই পৃথিবী শান্ত হবে না। প্রয়োজন অস্ত্র সংবরণের চেয়েও বড় অভ্যন্তরীণ শান্তি ও মানবিক বোধের জাগরণ। ধ্বংসের এই মহোৎসব থামিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ, যুদ্ধ জয় করার চেয়ে একটি মানবজীবন রক্ষা করা অনেক বেশি গৌরবের।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়। কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ। চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা। এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।
পৃথিবীতে এমন একটি দিন কল্পনা করা যাক, যেদিন কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারবে না। ইচ্ছা থাকলেও সত্যকে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না। মুখে যা আসবে, তা আড়াল করার আগেই প্রকাশ পাবে। সম্পর্ক, রাজনীতি, ব্যবসা, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা সেদিন হঠাৎ প্রকাশ্যে চলে আসবে। মিথ্যাগুলোর সত্যরূপ বের হয়ে যাবে। পৃথিবীটা ওই দিন চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ নিজের এবং অন্যের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে শিখবে। বাস্তব বিষয়টা জানবে। মানুষের জীবনে মিথ্যার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক। মিথ্যাটাকে মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করা হয় নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে, কখনো নিজের দুর্বলতা লুকাতে। আবার কখনো মিথ্যা হয়ে ওঠে স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে থেকেই মানুষ শিখে যায় কোন সত্য বলা যায়, কোন সত্য গোপন রাখতে হয় এবং কখন একটি মিথ্যা পরিস্থিতিকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই সুযোগটি এক দিনের জন্যও না থাকে? সকালের শুরুতেই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বহু প্রশংসা হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যাবে। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা সুবিধা পাওয়ার যে অদৃশ্য পথগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে। কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হবে, কেউ অন্যের প্রাপ্য কৃতিত্ব নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সুন্দর মুখোশের আড়ালে থাকা অসংগতি মানুষের সামনে চলে আসতে পারে। সত্যের পর্দায় আড়াল করা দুর্নীতি, অবিচার সব উন্মোচিত হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়বে। ভালো ফলাফলের পেছনে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে চাপ, ভয়, তুলনা ও প্রত্যাশা কাজ করে, সেগুলো প্রকাশ পাবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো প্রথমবার স্বীকার করবে যে সব সময় ভালো থাকার অভিনয় তাদের কতটা ক্লান্ত করে। অভিভাবকেরাও বুঝতে পারবেন, সন্তানের ভালো ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কখনো কখনো সন্তানের নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের জায়গাটি সেদিন মোটেও সহজ থাকবে না। বহু বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিছু না বলা কথা, ছোটখাটো অভিমান কিংবা গোপন ঈর্ষার ওপর। সত্য প্রকাশের দিনে সেই আবেগগুলো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কিছু বন্ধুত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আবার কিছু বন্ধুত্ব আরও শক্ত হতে পারে। কারণ, সত্য কখনো কখনো সম্পর্ক শেষ করে, আবার কখনো সম্পর্ককে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচায়। পরিবারের ক্ষেত্রেও দিনটি হতে পারে সবচেয়ে কঠিন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে অভিমান, প্রত্যাশা, ভয় ও না-পাওয়া জমিয়ে রাখে, সেগুলো সামনে আসবে। হয়তো কেউ প্রথমবার বুঝতে পারবে, তার কাছের মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। আবার কেউ উপলব্ধি করবে, ভালোবাসার নাম করে সে অন্যের ওপর কতটা চাপ, কতটা অভিনয় করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও ব্যতিক্রম হবে না। সেদিন সাজানো জীবন দেখানোর সুযোগ থাকবে না। সাফল্যের ছবির পাশাপাশি ব্যর্থতার গল্পও প্রকাশ পাবে। আনন্দের পোস্টের আড়ালে থাকা একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থাকা ভয় কিংবা নিখুঁত জীবনের ছবির পেছনের বাস্তবতা সামনে চলে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে, পর্দায় দেখা জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তবে সত্যের সেই দিনটি শুধু অস্বস্তিকর হবে না; শিক্ষণীয়ও হবে। মানুষ বুঝতে পারবে, সত্য সব সময় সুন্দর নয়। সত্য শুনলে কষ্ট হয়, কিছু সত্য সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মিথ্যার ওপর তৈরি শান্তি অনেক সময় সাময়িক। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পর যে সম্পর্ক টিকে যায়, সেটি আগের চেয়ে বেশি বাস্তব। দিন শেষে পৃথিবী আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মানুষ আবার প্রয়োজনমতো কিছু কথা লুকাবে, কিছু কথা সাজিয়ে বলবে, কিছু সত্য নিজের ভেতরে রেখে দেবে। কিন্তু সেই এক দিনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যাবে। হয়তো সবাই প্রতিদিন পুরোপুরি সত্য বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত নিজের কাছে সত্যি থাকার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী অনেক সময় অন্য কেউ নয় নিজের কাছেই নিজের বলা মিথ্যাগুলো এক দিনের সত্য পৃথিবীকে বদলে দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষকে নিজের মুখোশের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে এটুকু নিশ্চিত। আর হয়তো সেই এক দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে, সত্য সম্পর্ক ভাঙার থেকে মিথ্যার তৈরি দেয়াল সরিয়ে সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলা।
ছোটবেলার অবুঝ হাত ছুঁতে যেত দিন ও রাত— আগুন, জল কিংবা ফুল ছিল না হিসেব, কোনটা ভুল। না বুঝেই কেউ অবহেলায় কাছে টেনে নেয় ভালোবাসায়। মোহের পর্দা যখন ওড়ে বাস্তবতা ধাক্কা মারে। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় কার কী গুণ, কার কী ক্ষয়। ভুলগুলো সব চেনা যায় কিন্তু ফেরার সময় নাই। জীবন বুঝতে বুঝতেই শেষ উবে যায় সব রঙিন রেশ। হাতে থাকে শুধু ধূসর ছাই পেছনে ফেরার উপায় নাই।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছরের ছেলে অপ্রতিম গত শুক্রবার নামাজ পড়েছে, খাওয়াদাওয়া করেছে প্রতিদিনের মতো। হেসেছে, খেলেছে। ছুটির দিনের স্বাদ নিতে মায়ের অজান্তে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়েছিল পাশের কোনো সুন্দর জায়গায়। আমরা তো সবাই সপ্তাহের ছুটির দিনগুলো উপভোগ করার চেষ্টা করি। তেমনি অপ্রতিমও উপভোগ করতে একটু বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে বের হয়েছিল। তাতে কী এমন অসুবিধা হয়েছিল? তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে হলো! অপ্রতিমের মুখটা কী মায়ায় ভরা! দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। এমন একটা নিষ্পাপ ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলতে হয়? একটা আইফোনের সমান একটা জীবন? আইফোনের জন্য জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিতে হবে? বাংলাদেশে মৃত্যু পচে যাওয়া মাছের মতো সস্তা হয়ে গেছে। এখানে মায়ের কান্না যেন সিনেমার কোনো দৃশ্যের অংশ, যদিও বাস্তবে মায়েরা ক্রন্দনরত। তবুও আমাদের পাষাণ হৃদয় গলে না। আমরা ব্যক্তিস্বার্থের জন্য বৃহৎ স্বার্থকে নিমেষেই জলাঞ্জলি দিই। একটি ছোট্ট লোভ, একটি সামান্য স্বার্থ, একটি মুহূর্তের উন্মাদনা—কখনো কখনো একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা অজ্ঞতার চরম সময়ে যেন বাস করছি। কী করছি, কেন করছি, কেন মারছি—কোনো কিছু না ভেবেই খেয়াল-খুশিমতো নিজ কার্য সম্পাদন করছি। লোভে মত্ত হয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি মানুষ হওয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়—মানবিকতা। একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানুষ হবে বিবেকবান, মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন, জ্ঞানী, মানবিক, সত্যনিষ্ঠ, ধার্মিক, চরিত্রবান, সহমর্মী ও সহযোগী ভাবাপন্ন। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে, অন্যের দুঃখে হৃদয় কাঁদবে, অন্যের বিপদে মানুষ পাশে দাঁড়াবে। তাহলেই সেই দেশ হবে শান্তিপূর্ণ, সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্র। কিন্তু আমরা মানুষরা আজ বেশি অসভ্য ও বর্বর হয়ে উঠেছি। স্বাধীনতার এত বছর পর এসেও যদি একটি শিশুর জীবন একটি মোবাইল ফোনের লোভের কাছে এত তুচ্ছ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের সভ্যতার অহংকার কোথায়? যেই যুগ বিজ্ঞানের, যেই যুগ কম্পিউটারের, যেই যুগ মোবাইলের, যেই যুগ ডিজিটালের, ইন্টারনেটের, যেই যুগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের—সেই যুগে এত বর্বরতা মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টের। ওপরে যেসব যুগের কথা বললাম, সবই তো মানুষের উপকারের জন্য। বিজ্ঞান মানুষের জীবন সহজ করেছে, প্রযুক্তি মানুষকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছে। ইন্টারনেট জ্ঞানকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এআই মানুষের চিন্তা ও কাজের নতুন নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবুও কেন এত নিষ্ঠুরতা? এত অজ্ঞতায় মোড়ানো এখনো মানুষের মন? মানুষের জন্যই তো এ পৃথিবী। মানুষ না থাকলে পৃথিবী নামের গ্রহের আর কোনো মূল্য আছে কি? তবুও আমরা রোজ মানুষ হয়ে মানুষকে মারছি। মানুষের হাতে মানুষ নিরাপদ নয়—এর চেয়ে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে? আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাপনায় যেমন ভুল আছে, তেমনি বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাতেও মারাত্মক ভুল আছে। তাই তো বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ লেগে আছে। কি পূর্ব, কি পশ্চিম, কি উত্তর, কি দক্ষিণ—সবখানেই কোথাও না কোথাও যুদ্ধের তাণ্ডব চলছে। মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে, শিশুরা বাবা-মাকে হারাচ্ছে, মায়েরা সন্তান হারাচ্ছেন। দুনিয়াজুড়ে যখন মানুষ মানুষকে মেরে রাজ্য দখল, সম্পদ দখল, চাঁদ দখল, মহাকাশ দখলে ব্যস্ত, সেখানে আমাদের মতো দেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? কিন্তু আমরা তো মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণের বিসর্জন দিয়েছি। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত স্ত্রী স্বামী হারিয়েছে, কত সন্তান পিতৃহীন হয়েছে! এরপর এসেছে স্বাধীনতা। এত রক্ত, এত কান্নার পরও কেন আরও হাজার হাজার প্রাণের সমাপ্তি হচ্ছে? কেন রক্ত ঝরছে? কেন কান্নার রোল পড়ে যাচ্ছে ঘরে ঘরে? অপ্রতিম শুধু তার বাবা-মায়ের সন্তান নয়। অপ্রতিম বাংলাদেশের সন্তান, আমাদের সন্তানও। কারণ, ওর মতো হাজারও অপ্রতিম আছে আমাদের সবার ঘরে। ওর মুখটার দিকে তাকালে নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ে যায়। ওর বাবা-মায়ের কান্নার আওয়াজ যেন আমাদের প্রত্যেক বাবা-মায়ের অশ্রুপাতের করুণ ব্যঞ্জনা। হাহাকারের ধ্বনি, বেদনার বিউগল। প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপ্রতিম হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের থেকে—মায়ের কোল থেকে, বাবার বুক থেকে। আর কত? আর কত? কত অপ্রতিমের বলিদান হলে আমাদের মানসিকতা বদলাবে? কত প্রাণের বিনিময়ে আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, সমাজ ব্যবস্থাপনা, পরিবার ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সুষম উন্নতি ঘটবে? কোথায় সেই সমাজ, যেখানে খুন, গুম, হত্যা, রাহাজানি, অসভ্যতা, অমানবিকতা, চরম বর্বরতা, মিথ্যাচার, হিংসা, বৈষম্য, নির্মমতা, লোভ, অনাচার ও অবিচারের বলিদান হবে? মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। নিজের মতো করে বাঁচবে। বাঁচার মতো বাঁচবে। অপ্রতিম গত সপ্তাহেও এমন দিনে দিব্যি হেসে-খেলে মায়ের কোলজুড়ে ছিল। গত সপ্তাহেও সে স্কুলে গিয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে কত মজা করেছিল। বাবা-মায়ের কাছে কত বায়না করেছিল। হয়তো তারও অনেক স্বপ্ন ছিল। বড় হয়ে কী হবে, কী করবে—হয়তো সে-ও তার ছোট্ট মনে ভবিষ্যতের ছবি আঁকছিল। অথচ আজ সব শেষ। সব আনন্দের মৃত্যু দিয়ে দিল মানুষরূপী হায়েনারা। আজকের এই প্রজন্মের হাতেই তো আগামীর বাংলাদেশ। তারাই তো একদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তারাই শিক্ষক হবে, চিকিৎসক হবে, প্রকৌশলী হবে, প্রশাসক হবে, ব্যবসায়ী হবে, সমাজের নেতৃত্ব দেবে। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু যারা একটি আইফোনের লোভ সামলাতে পারে না, তারা গোটা একটি রাষ্ট্রের লোভ সংবরণ করে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে? অবশ্যই সবাই এমন নয়। অসংখ্য ভালো মানুষ এখনো আছেন, যারা মানবিকতা, নৈতিকতা ও বিবেককে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ মনে করেন। কিন্তু অল্প কিছু মানুষের লোভ ও বর্বরতাও যে কত বড় ক্ষতি করতে পারে, অপ্রতিমের মৃত্যু তার নির্মম উদাহরণ। যেহেতু এই প্রজন্মের হাতেই আগামীর দেশ, সেহেতু তাদের গড়ে উঠতে হবে খুব সুন্দর করে। তাদের থাকতে হবে মানবিকতা, সাহস, ধৈর্য, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, অহিংসা ও বৈষম্যহীনতার চেতনা। তাদের হতে হবে বর্বরতাহীন, মিথ্যাহীন, নির্লোভ ও সত্যবাদী। থাকতে হবে চরিত্র, মমত্ববোধ, আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা ও মূল্যবোধ। তাদের হৃদয়ে থাকতে হবে দেশপ্রেম। মাতৃভূমি এবং মাতৃভূমির তথা গোটা বিশ্বের মানুষের প্রতি থাকতে হবে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব। শুধু বই পড়ে শিক্ষিত হলেই হবে না। মানুষের দুঃখ বুঝতে হবে। অন্যের চোখের জল দেখতে হবে। অন্যের অধিকারকে নিজের অধিকারের মতো সম্মান করতে হবে। মনে রাখতে হবে—একটি জীবন কোনো বস্তু নয়, কোনো মোবাইল ফোনের মূল্য দিয়ে যার দাম নির্ধারণ করা যায় না। একটি শিশুর হাসি একটি পরিবারের স্বপ্ন। একটি শিশুর জীবন একটি মায়ের পৃথিবী। একটি সন্তানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের মৃত্যু নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যতেরও মৃত্যু ঘটে। তাই অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের জন্য শুধু শোকের বিষয় নয়, একটি গভীর প্রশ্নও। আমরা কি সত্যিই মানুষ হতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ একটি সমাজ তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে একটি শিশু বন্ধুদের সঙ্গে বের হলে তার মা নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করতে পারবেন? যদি না পারি, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গল্প কোথায়? রাস্তা, সেতু, ভবন, প্রযুক্তি—সবই দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার মানুষের হৃদয়ের উন্নয়ন। কারণ, হৃদয়ে মানবিকতা না থাকলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষ ততই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। অপ্রতিম ফিরে আসবে না। তার মায়ের কোলে আর সেই মুখটি হাসবে না। তার বাবার চোখে আর সেই শিশুটির স্বপ্ন ফুটে উঠবে না। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যু যেন বৃথা না যায়। তার মৃত্যু আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলুক। তার মায়ের কান্না আমাদের হৃদয়ে পৌঁছাক। তার নিষ্পাপ মুখ আমাদের মনে করিয়ে দিক—একটি জীবন কোনো সম্পদের চেয়ে ছোট নয়। আর কোনো অপ্রতিম যেন হারিয়ে না যায়। আর কোনো মা যেন সন্তানের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন না করেন, ‘আমার সন্তানকে কেন মেরে ফেললে?’ আর কোনো বাবা যেন বুক চাপড়ে না বলেন, ‘আমার সন্তান তো কারও ক্ষতি করেনি!’ আর কোনো ঘরে যেন এমন কান্না না ওঠে। আমরা চাই, বাংলাদেশে মানুষ মানুষের জন্য বাঁচুক। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক। লোভের চেয়ে ভালোবাসা বড় হোক, প্রতিহিংসার চেয়ে ক্ষমা বড় হোক, হিংসার চেয়ে মানবিকতা বড় হোক। আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের স্বাভাবিক সংবাদ হয়ে না দাঁড়ায়। আর কত অপ্রতিমের মৃত্যু দেখবে বাংলাদেশ? আর কত মায়ের কান্না শুনবে বাংলাদেশ? আর কত বাবার বুক খালি হবে? আর কত রক্ত ঝরলে আমরা সত্যিকারের মানুষ হব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে। আজ না হলে কাল, কাল না হলে পোরশু, কিন্তু একদিন আমাদের বদলাতেই হবে। অপ্রতিমের জন্য, আমাদের সন্তানদের জন্য, আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য। তাহলেই প্রিয় মাতৃভূমি হয়ে উঠবে সত্য, সুন্দর, সভ্য, মানবিক ও মূল্যবোধের বাংলাদেশ। অপ্রতিম বাবা আমার, আমাদের ক্ষমা করে দিস। স্বাধীনতার এত বছর পরও তোদের জন্য একটি নিরাপদ জন্মভূমির ব্যবস্থা করতে পারিনি বলে। আজ আমি লজ্জিত, আমরা সবাই লজ্জিত তোকে তোর বাবা-মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিতে না পারায়। যেখানে থাকিস ভালো থাকিস বাবা অপ্রতিম। বিশ্বজিত পাল সহকারী শিক্ষক টেকনাফ বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল টেকনাফ, কক্সবাজার।
হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে এখন আর শুধু অসুখের ক্লান্তি থাকে না, সেখানে যোগ হয় একধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক। জ্বর নিয়ে আসা মানুষটি ডেঙ্গু রোগী কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে, হাসপাতালের একটি শয্যা পাওয়া যাবে তো? একটি মশার কামড় কখন যে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকে হাসপাতালের বিছানায় এনে থামিয়ে দেবে, তার কোনো পূর্বঘোষণা নেই। ডেঙ্গু আমাদের কাছে নতুন কোনো নাম নয়। বর্ষা আসে, মশার উপদ্রব বাড়ে, হাসপাতালের সামনে ভিড় বাড়ে, আর সংবাদপত্রের পাতায় মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘ হয়। তারপর একসময় আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই। বিপদটা সম্ভবত সেখানেই—যে মৃত্যুকে প্রতিদিনের খবর হিসেবে পড়তে পড়তে একসময় স্বাভাবিক বলে মনে হয়, সেটিই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। গত ২৪ ঘণ্টার হিসাবটি সেই অস্বস্তিটাই আবার সামনে এনে দিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে ১,৪৮৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মৃত পাঁচজনের মধ্যে দুজন পুরুষ ও তিনজন নারী; চারজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং একজনের রংপুর বিভাগে। এর ঠিক আগের ২৪ ঘণ্টার চিত্রটি ছিল আরও ভারী। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১,৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গেছেন সাতজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৬। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৫৮,৪০০ জন। সংখ্যাগুলো কাগজে খুব সহজে লেখা যায়। ১৭৬, ৫৮,৪০০। কিন্তু ১৭৬টি মৃত্যু মানে ১৭৬টি পরিবারে একজন করে অনুপস্থিত মানুষ। ৫৮,৪০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানে অসংখ্য পরিবারের উৎকণ্ঠা, কাজ থেকে ছুটি, পড়াশোনায় ছেদ, চিকিৎসার খরচ আর রাত জেগে হাসপাতালের করিডরে বসে থাকা। একটি জ্বরের থার্মোমিটারে হয়তো এসব কিছু দেখা যায় না। দেখা যায় না সেই বাবাকে, যিনি ওষুধের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে হিসাব করছেন এই মাসের বাকি খরচ কীভাবে চলবে। দেখা যায় না সেই শিক্ষার্থীকে, যার কয়েক দিনের অসুস্থতায় ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা স্বাভাবিক জীবন থেমে গেছে। দেখা যায় না হাসপাতালের বিছানার পাশে বসে থাকা মানুষটির চোখে ঘুমহীনতার যে রেখা তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান প্রয়োজনীয়, কিন্তু পরিসংখ্যান কখনো পুরো গল্পটি বলে না। তাহলে প্রশ্ন আসে, এত পরিচিত একটি রোগের কাছে আমরা বারবার অসহায় হয়ে পড়ছি কেন? এডিস মশার জীবনচক্র আমরা জানি। জমে থাকা পানির কথা জানি। বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নালা কিংবা আবর্জনার মধ্যে পানি জমে থাকার ঝুঁকির কথাও জানি। ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণার অভাব নেই। অথচ রোগটি ফিরে আসে, আরও বড় হয়ে ফিরে আসে। সমস্যাটি সম্ভবত মশার চেয়ে বড়। একটি ছাদে পড়ে থাকা ভাঙা বালতিতে পানি জমে আছে। একটি নির্মাণাধীন ভবনের কোণে বৃষ্টির পানি আটকে আছে। বাসার পেছনের পরিত্যক্ত পাত্রে কয়েক দিন ধরে পানি জমে আছে। কোথাও নালা পরিষ্কার হয়নি, কোথাও আবর্জনা পড়ে আছে। এগুলোকে আমরা আলাদা আলাদা ছোট ঘটনা হিসেবে দেখি। কিন্তু শহরের অসুস্থতা এমন হাজার হাজার ছোট ঘটনার সমষ্টি। একটি বাড়ির অবহেলা আরেকটি বাড়ির নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। একটি এলাকার অপরিষ্কার ড্রেনের দায় শেষ পর্যন্ত অন্য এলাকার হাসপাতালের বিছানায় এসে পড়ে। এ কারণেই ডেঙ্গুকে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা, স্থানীয় সরকারের সমস্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং নাগরিক আচরণেরও সমস্যা। সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু নাগরিকদেরও নিজেদের চারপাশের কয়েক ফুট জায়গাকে রাষ্ট্রের বাইরের কোনো ভূখণ্ড মনে করলে চলবে না। তবে নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলার আগে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথাটিও স্পষ্ট করে বলা দরকার। একজন মানুষ হয়তো তার বাসার সামনে জমে থাকা পানি সরাতে পারেন, কিন্তু তিনি পুরো শহরের ড্রেনব্যবস্থা বদলাতে পারেন না। তিনি নিজের ছাদ পরিষ্কার করতে পারেন, কিন্তু নির্মাণাধীন ভবনের জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার নেই। তাই ‘সচেতন হোন’ বলেই দায়িত্ব শেষ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু দৃশ্যমান তৎপরতা যথেষ্ট নয়। মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয়েছে কি না, কতবার অভিযান হয়েছে—এসবের পাশাপাশি কোথায় রোগী বাড়ছে, কোন এলাকায় মশার প্রজননস্থল বেশি, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে —এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, কিন্তু হাসপাতাল পর্যন্ত মানুষকে পৌঁছাতে হবে কেন এ প্রশ্নও সমান জরুরি। আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে বড় সড়ক, উঁচু ভবন, নতুন প্রকল্প কিংবা ব্যস্ত শহরের দৃশ্য দিয়ে মাপি। অথচ একটি শহর কতটা মানবিক, তার একটি সহজ পরীক্ষা হতে পারে সেখানে একটি শিশুর জ্বর হলে তার পরিবার কতটা নিরাপদ বোধ করে। ডেঙ্গুর সবচেয়ে নির্মম দিক এখানেই। রোগটি দরজায় কড়া নাড়ার আগে কোনো শ্রেণি, পেশা বা ঠিকানা দেখে না। কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার পর তার অভিঘাত সমান হয় না। কারও জন্য ভালো হাসপাতাল ও চিকিৎসা সহজলভ্য, কারও জন্য কয়েক দিনের চিকিৎসাই সংসারের হিসাব পাল্টে দেয়। ফলে মশা সবার শরীরে একইভাবে বসতে পারে, কিন্তু রোগের বোঝা সবার কাঁধে সমান পড়ে না। প্রতিবছর মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশিত হয়। আমরা কিছুদিন উদ্বিগ্ন হই। মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয়, অভিযান হয়, সচেতনতামূলক প্রচারণা চলে। তারপর জীবন আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। পরের বর্ষায় আবার একই প্রশ্ন ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তির ভেতরেই আমাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে পরিষ্কার চিহ্নটি লুকিয়ে আছে। এই চক্রটি ভাঙতে হলে ডেঙ্গুকে মৌসুমি আতঙ্ক হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি নগর ও জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিরোধমূলক কাজের সময় জ্বরের মৌসুম নয় তার অনেক আগেই। শহরের নালা, নির্মাণস্থল, বর্জ্য, জলাবদ্ধতা, আবাসিক এলাকা সবকিছুকে একই ব্যবস্থাপনার ভেতরে আনতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও জনসম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়েছে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সত্যিকারের সাফল্য হয়তো সেদিনই বোঝা যাবে, যেদিন সন্ধ্যায় কোনো মা সন্তানের কপালে হাত রেখে জ্বর মাপবেন, কিন্তু মনের মধ্যে প্রথমেই ডেঙ্গুর ভয় জেগে উঠবে না। হাসপাতালের করিডরে স্বজনেরা শয্যার জন্য ছুটবেন না। কোনো বাবা ওষুধের প্রেসক্রিপশন হাতে দাঁড়িয়ে ভাববেন না এই মাসের খরচটা কীভাবে চলবে। সেই দিনটি শুধু মশা কমে যাওয়ার দিন হবে না। সেটি হবে এমন একটি শহর গড়ে ওঠার দিন, যে শহর তার নাগরিকের অসুখ হওয়ার পর চিকিৎসা করে না শুধু, বরং অসুখটি হওয়ার আগেই তাকে রক্ষা করতে শেখে। কারণ, শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই মশার সঙ্গে নয়, আমাদের নিজেদের অবহেলার সঙ্গে।
বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু দলিল রয়েছে, যেগুলোর গুরুত্ব শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণত সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সব দলিলের কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। কিন্তু এদিক থেকে মদিনা সনদ ব্যতিক্রম। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে, প্রায় ১৪০০ বছর আগে। অথচ এখনো এ চুক্তির গুরুত্ব নেহাতই কম নয়। এ চুক্তির মাধ্যমে একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণা পাওয়া যায়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় মুসলিম, আনসার, মুহাজির ছাড়াও ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করত। যে দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাস, সে দেশের সব ধর্মের প্রতি সহনশীলতা প্রয়োজন। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি নীতি ছিল—‘নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও’। মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। মদিনা সনদের গুরুত্ব শুধু এর রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে চুক্তি রক্ষা ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মু’আহিদকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।” (সহিহ বুখারি, ৩১৬৫)। [এখানে ‘মু’আহিদ’ বলতে চুক্তির অধীনে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অমুসলিম ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে।] অনেক ঐতিহাসিক ও লেখকের মতে, মদিনা সনদ বিশ্বের প্রাচীনতম লিখিত সংবিধানগুলোর অন্যতম। কেউ কেউ আবার মদিনা সনদকেই বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, “এটি পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান।” এই সনদে মোট ৪৭টি ধারা ছিল এবং এই ধারাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই মদিনা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ধারা নিচে আলোচনা করা হলো : ১. ইসলামি কমনওয়েলথ : মদিনা সনদের স্বাক্ষরকারী প্রতিটি জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ সকলে সমান অধিকার ভোগ করবে এবং মিলেমিশে একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে। সনদের এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা, কারণ সেই সময় প্রতিটি জাতির মধ্যে সব সময় যুদ্ধ লেগেই থাকত। এমনকি একটি জাতির ভেতরেও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে নিয়মিত সংঘাত হতো। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের একটি কমনওয়েলথ বা যৌথ রাষ্ট্র গঠন ছিল মহানবি (সা.)-এর একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ২. রাষ্ট্রপ্রধান : হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের সভাপতি এবং পদাধিকারবলে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। একটি নতুন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়ায় আশপাশের সবার নজর ছিল এর দিকে। বিশেষ করে, মক্কার কুরাইশদের বাণিজ্য করতে মিসর বা সিরিয়ায় যেতে হলে মদিনার ওপর দিয়েই যাতায়াত করতে হতো। কুরাইশদের অত্যাচারের শিকার মুসলমানরা মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, যা কুরাইশদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। ৩. ধর্মীয় স্বাধীনতা : মদিনা সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতা। যেহেতু মদিনা সনদে মুসলমানসহ ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকরাও স্বাক্ষর করেছিল, তাই মুসলমানসহ প্রতিটি সম্প্রদায় বিনা দ্বিধায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে এবং কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না—এটিই ছিল এই রাষ্ট্রের সৌন্দর্য। আল-কোরআনেও রয়েছে, “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৬)। ৪. পারস্পরিক সমঝোতা ও যৌথ দায়িত্ব : স্বাক্ষরকারী কোনো সম্প্রদায় বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে, সমবেত প্রচেষ্টায় সবাই মিলে সেই আক্রমণ প্রতিহত করবে। বহিঃশত্রুর আক্রমণে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়গুলো নিজ নিজ অংশের যুদ্ধভার গ্রহণ করবে। মদিনার ভেতরে যেসব দুর্বল ও অসহায় মানুষ রয়েছে, তাদের সর্বাত্মকভাবে সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে। এতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়। ৫. সন্ধির শর্ত : মদিনা সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—কেউ কুরাইশদের সাথে কোনো প্রকার সন্ধি করতে পারবে না এবং মদিনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কুরাইশদের সাহায্য করতে পারবে না। লক্ষণীয় যে, সে সময় মদিনাবাসীদের প্রধান শত্রু ছিল কুরাইশরা, তাই কেউ যেন তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক না রাখে, সে জন্যই এই শর্তটি রাখা হয়েছিল। ৬. বিচার বিভাগ : মদিনা সনদের বিচার বিভাগ-সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি ধারা ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো—স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা কেবল তার ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, এর জন্য পুরো সম্প্রদায় দায়ী থাকবে না। তৎকালীন সময়ে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায় পুরো গোত্রের ওপর পড়ত, যার ফলে গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হতো। এই বিধানের মাধ্যমে সেই প্রথার অবসান ঘটানো হয়। আরেকটি শর্ত ছিল, অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে। ন্যায়বিচার সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।” (সুরা মায়েদা, আয়াত ৮)। ৭. মদিনার পবিত্রতা : মদিনা সনদে মদিনা শহরকে একটি পবিত্র এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং সেখানে রক্তপাত, হত্যা, বলাৎকার ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। মদিনা শহরে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। ৮. হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষমতা : হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান বিচারপতি ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর কিছু বিশেষ ক্ষমতা ছিল; যেমন—তাঁর অনুমতি ব্যতীত মদিনাবাসী কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারত না। স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তার মীমাংসা করে দিতেন। ৯. শর্ত ভঙ্গ : মদিনা সনদের পরিশেষে বলা হয়েছিল, এই শর্ত ভঙ্গকারীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য ছিল চুক্তির পবিত্রতা রক্ষা করা এবং কেউ যেন সহজে তা লঙ্ঘন করার সাহস না পায়। মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী বিরোধ ছিল। কিন্তু এই সনদের প্রভাবে তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মদিনা সনদের ধারাগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় থাকে। মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুহাজির এবং মদিনার আনসারদের বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এই সনদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সপ্তম শতকে আরবে ন্যায়বিচার বলতে কিছু ছিল না বললেই চলে; তারা ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিতে চলত। কিন্তু মদিনা সনদ মদিনার সকল বাসিন্দাকে সমান অধিকার দিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। মদিনা সনদ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রেখেছিল, কারণ এটি ছিল একটি লিখিত সংবিধান এবং এতে মদিনায় বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেছিল। তৎকালীন সময়ে আরববাসীর পরিচয় ছিল মূলত গোত্রভিত্তিক; কিন্তু মদিনা সনদ বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একত্র করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় আনার পথ দেখিয়েছিল, যা তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। আজকের পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে আমরা ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্যের কারণে সংঘাত দেখতে পাই। অনেক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সহাবস্থান নিয়ে সংকট তৈরি হয়, যা প্রায়শই গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। অথচ ১৪০০ বছর আগেই মদিনা সনদের এক চমৎকার সমাধান উপহার দিয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মের ও গোত্রের মানুষ কীভাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে বসবাস করতে পারে, তার এক উৎকৃষ্ট ঐতিহাসিক দলিল হলো মদিনা সনদ। এই সনদে সব ধর্মের মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল। এ কারণেই মদিনা সনদ শুধু ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি বিষয় নয়, বরং বহুত্ববাদী সমাজ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এটি কেবল সপ্তম শতকের মদিনার রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলার দলিলই ছিল না, বরং এর মধ্যে এমন কিছু শাশ্বত নীতি রয়েছে, যেগুলো আজও যেকোনো বহুজাতি ও বহুধর্মের সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও আলোচনার যোগ্য।