Breaking news
উপসম্পাদকীয়

খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি : ৫৬ বছরের পথচলা ও আগামীর প্রত্যয়

ড. এম আব্দুল মোমিন
ড. এম আব্দুল মোমিন ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা ব্রি, গাজীপুর
অক্টোবর ২, ২০২৬ • 0

খাদ্য ঘাটতির দেশে বাড়তি উৎপাদন কীভাবে সম্ভব হলো, সে গল্প কি আমরা জানি? খাদ্য নিরাপত্তা এ দেশে চালের নিরাপত্তার সমার্থক। দিনে দুই থেকে তিনবার যে জাতির পাতে ভাত ওঠে, তার ভাতের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে, সেটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)।

 

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি গত ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি ৫৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদীয় আইনে নতুন নাম পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভদিনে ব্রির কয়েকটি যুগান্তকারী সাফল্যের গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে এই আয়োজন।

 

গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রির সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি উন্নীতকরণ। ব্রি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে মোট চালের উৎপাদন ছিল ৯.৭৭ মিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০.৬৩ মিলিয়ন টনে, অর্থাৎ চালের উৎপাদন গত সাড়ে পাঁচ দশকে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, আবাদি জমি কমেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির হাত ধরে। বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৫৩ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, ৪০ শতাংশ আমন থেকে এবং ৭ শতাংশ আউশ থেকে। কৃষকের মাঠেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। ব্রির তথ্যমতে, আউশ মৌসুমে ব্রির জাতের গ্রহণযোগ্যতা ৭৩.৩১ শতাংশ, আমনে ৫৮.৪৩ শতাংশ এবং বোরোতে ৫৭.২৯ শতাংশ। ব্রির জাত চাষ করে কৃষকের ফলন ৪০ শতাংশ এবং আয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

 

দেশি জাতের স্বল্প ফলন থেকে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাত বৈচিত্র্যে এসেছে এই কাঙিক্ষত সমাধান। ব্রি এ পর্যন্ত ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে ১১৭টি ইনব্রিড ও ১০টি হাইব্রিড। এর মধ্যে জলবায়ুর ঘাতসহনশীল ৪০টি, পুষ্টিসমৃদ্ধ ৩০টি, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের ১৪টি, জিংক সমৃদ্ধ ৭টি, স্বল্প গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের লো-জিআই চাল ৪টি এবং রোগ প্রতিরোধী ২টি। ব্রি উদ্ভাবিত ২৩টি জাত ১৪টি দেশে চাষ হচ্ছে, যা দেশের গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।

 

ব্রি উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত দেশের কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে। বিআর৩ ও বিআর১১, ৪৯, ৮৭, ১০৩ আমনে এবং ব্রি ধান২৮, ২৯, ৮৮, ৮৯, ৯২,১০২,১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ বোরোতে দশকের পর দশক ধরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবেলায় আগাম পাকা ব্রি ধান৩৩ গরিব চাষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে এটি ১০০ দিনের মধ্যেই পাকে, যা মঙ্গা দূরীকরণে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছে।

 

সাম্প্রতিক জাতগুলোতেও বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। ব্রি ধান১১৪ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। ব্রি ধান১১৬ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দেয়। লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান১১৭ উপকূলে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ জীবনচক্রে ১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করে। হাওরাঞ্চলের জন্য ঠান্ডাসহিষ্ণু ও আগাম জাত ব্রি ধান১১৮ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ বছর আগাম বন্যায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ হেক্টরপ্রতি ১০.৫ থেকে ১১ টন এবং লবণসহিষ্ণু ব্রি হাইব্রিড ধান১০ অনুকূল পরিবেশে ৯.৭ থেকে ১০.৭ টন ফলন দিতে সক্ষম।

 

ব্রি এখন ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কর্মসূচিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ৩২টি টার্গেট প্রোডাক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়েছে এবং প্রজনন চক্র সাড়ে তিন থেকে চার বছর কমানো হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার জেনোটাইপের পূর্ণ জিনোম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং সম্পন্ন হয়েছে। ৪ লাখেরও বেশি ফিক্সড লাইন উদ্ভাবিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ জাতের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে।

 

সম্পদ সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায়ও সরাসরি বপন পদ্ধতিতে (ডিএসআর) জলমগ্ন পদ্ধতির তুলনায় মিথেন নির্গমন ৩৪ শতাংশ হ্রাস করছে। যদিও ধান চাষে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের চেয়ে প্রশমন হয় বেশি। ব্রির দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রে ৩০-৩৫ শতাংশ সার সাশ্রয় হয়, ফলন ৫-১২ শতাংশ বাড়ে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে। সেচে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় এডব্লিউডি ব্যবস্থা কৃষকের খরচ সাশ্রয় করছে।

 

কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ৫৪টি যন্ত্র উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ বপন, রোপণ, আগাছা দমন ও মাড়াই যন্ত্র এবং কম্বাইন হারভেস্টার। বীজ বপনের পাওয়ার সিড সোয়ারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা এবং তা দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশীয় কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আমদানি নির্ভরতা কমেছে। যন্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

 

ডিজিটাল সেবায়ও ব্রি এগিয়েছে অনেকখানি। মাঠের পোকামাকড় ও রোগ পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রয়েছে ধানের জাতের স্মার্ট প্রোফাইলিং অ্যাপ ও বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক। ব্রির এগ্রামেট সেবা ও কল সেন্টারে জুন-জুলাই ২০২৬ সময়ে মোট ১ হাজার ৬৫৭টি কল এসেছে, যার বেশির ভাগই সহায়তা ডেস্কসংক্রান্ত। সার ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়েও কৃষকেরা প্রশ্ন করেছেন।

 

ভালো জাত মাঠে পৌঁছাতে চাই মানসম্পন্ন বীজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রি ১৩০টি জাতের নিউক্লিয়াস বীজ সংরক্ষণ করেছে এবং ২৩২ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৫টি সিডনেট অংশীদারকে প্রায় ২০০ টন বীজ প্রতিবছরই বিতরণ করা হচ্ছে। ধান বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে গত পাঁচ বছরে ব্রি মোট ৫১ হাজার ৪২০ জন অংশীজনকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে কৃষক ৪২ হাজার ২০৪ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রি মোট ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণ) এবং ব্র্যাক ব্যাংক ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ডস। ব্রির অবদান অর্থনৈতিক বিচারেও লাভজনক। ধান গবেষণায় বিনিয়োগের প্রতিদান নিয়ে পাঁচটি গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর হিসাবে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে ফেরত এসেছে ২৬ থেকে ৫৪ টাকা।

 

দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে ১.১২ শতাংশ হারে, আবাদি জমি কমছে ০.২৪ শতাংশ হারে, আর তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতি দশকে প্রায় ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্রির ভাষায়, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, একে টেকসই করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার তাগিদও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য ব্রি কয়েকটি কৌশল হাতে নিয়েছে। কৃষকের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন ধরে দেশের চাহিদা মেটাতে অন্তত ৬.২৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমি রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছে ব্রি। ব্রির মতে, জেনেটিক গেইনের গতি বছরে অন্তত ৪৪ কেজি বা হেক্টর হারে বাড়ানো দরকার। ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৩৮ মিলিয়ন হেক্টর পতিত জমিতে ধান চাষ করে বাড়তি ১.০৬ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ৪.৪৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উন্নত শস্যবিন্যাস চালু করে আরও ৪.০৪ মিলিয়ন টন বাড়তি ধান উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

 

গবেষণার অগ্রাধিকারে রয়েছে স্পিড ব্রিডিং, জিনোমিক প্রেডিকশন ও হ্যাপলোটাইপভিত্তিক প্রজননের মতো আধুনিক কৌশল। এ ছাড়া রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর জাত, জলবায়ু সহনশীলতা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। চলমান গবেষণায় সি৪ রাইস, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে লবণাক্ততা সহনশীলতা ও ব্লাস্ট প্রতিরোধ এবং টু-লাইন হাইব্রিড প্রজনন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চ আয়ের জন্য মূল্য সংযোজিত ধানজাত পণ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাইস ভ্যালু চেইন গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটির পরিধিও বাড়ছে। বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ এবং সদর দপ্তরের বাইরে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে আরও ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে । এতে স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের সমস্যার সমাধান আরও সহজ হবে।

 

তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা না বললেই নয়। এর মধ্যে অপর্যাপ্ত জনবল, পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতা, এবং গবেষণা বরাদ্দের অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। ব্রির অনুমোদিত ৩১৮টি বিজ্ঞানী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৭১ জন। যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি টাকার বিনিয়োগ বহুগুণ হয়ে ফেরে, তার গবেষণা ও জনবলে বিনিয়োগ বাড়ানোই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ৫৬ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান কয়েকজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা দেশের কোটি মানুষের পাতে ভাত পৌঁছানোর নেপথ্য শক্তি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্রির সব বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষককে অভিনন্দন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জমি সংকটের যুগে ব্রির ওপর প্রত্যাশা আরও বাড়বে, আর সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় সহায়তা।

 

ড. এম আব্দুল মোমিন

কৃষিবিদ ও কৃষি সাংবাদিক এবং

ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)

গাজীপুর

 

 

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের সংকট : একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মূল্যায়ন

বর্তমান বিশ্ব-ভূরাজনীতিতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবস্থান অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে। মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, আজ তার শাসনদণ্ডে আসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। অথচ একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল নির্যাস থেকে এই পার্টির দূরত্ব আকাশচুম্বী। যে রাষ্ট্রকে একসময় বৈশ্বিক শোষিত মানুষের আলোকবর্তিকা মনে করা হতো, তা আজ আন্তর্জাতিক সর্বহারা আন্দোলন এবং বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে প্রায় সম্পূর্ণ নির্বিকার।   মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং লেনিনীয়  তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক চীন আর কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এক নতুন রূপ, যা নিজের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বিশ্ব পুঁজিবাদের পরিকাঠামোকেই টিকিয়ে রাখছে এবং শক্তিশালী করছে।   মার্কসীয় তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের ওপর শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল, যাকে তারা ‘চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি করে, তা মূলত পুঁজিবাদেরই একটি পরিমার্জিত রূপ। ডেন জিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে চীন বিশ্ববাজারের জন্য সস্তা শ্রমের কারখানায় পরিণত হয়েছে। বহুজাতিক পুঁজির অবাধ প্রবেশ এবং দেশীয় পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে সেখানে উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাতের প্রক্রিয়াটি পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের মতোই নির্মম। একটি নামমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে সেখানে কোটিপতির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমিকরা তীব্র শোষণ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর মূল বাণী ছিল বুর্জোয়া শ্রেণির উচ্ছেদ এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। অথচ আধুনিক চীনে বুর্জোয়া শ্রেণিকে পার্টির সদস্যপদ দিয়ে শাসনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে, যা লেনিনীয় পার্টি কাঠামোর সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।   লেনিনের কালজয়ী গ্রন্থ ‘সাম্রাজ্যবাদ : পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’-এর মানদণ্ডে চীনের বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূমিকা বিচার করা অপরিহার্য। লেনিন দেখিয়েছিলেন কীভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ দেশকে উদ্বৃত্ত পুঁজি রপ্তানির দিকে ঠেলে দেয়, যা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জন্ম দেয়। চীনের বর্তমান ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পটিকে এই লেনিনীয় তত্ত্বের আলোকেই বুঝতে হবে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলোতে চীন যে বিশাল অঙ্কের ঋণ ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করছে, তার মূল উদ্দেশ্য বৈশ্বিক শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি বা সমাজতান্ত্রিক সংহতি নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো নিজের উদ্বৃত্ত পুঁজির বিনিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি করা, কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করা এবং নতুন বাজার দখল করা। ঋণফাঁদের এই কূটনীতি মূলত নব্য-সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, যা শোষিত দেশগুলোর শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণিকে পুঁজির নতুন এক আন্তর্জাতিক জাঁতাকলে পিষ্ট করছে।   আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের স্বার্থের প্রতি চীনের এই চরম উদাসীনতা ও নির্বিকার ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নীতির যৌক্তিক পরিণতি। মার্কসবাদ স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করে যে, শ্রমিকের কোনো দেশ নেই এবং মুক্তি কেবল আন্তর্জাতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই সম্ভব। লেনিনও তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল গঠনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সর্বহারা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান চীনা নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে কোনো সমাজতান্ত্রিক বা প্রগতিশীল আন্দোলনকে সমর্থন করা তো দূরের কথা, বরং অনেক দেশে প্রতিক্রিয়াশীল ও নিপীড়ক পুঁজিপতি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। যেখানেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে চীনের স্বার্থের সংঘাত ঘটছে, সেখানে চীন কোনো বিকল্প সমাজতান্ত্রিক আদর্শ তুলে ধরছে না, বরং অন্য একটি পুঁজিপতি শক্তি হিসেবে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে সংকীর্ণ বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা।   শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের চেয়ে চীনের কাছে আজ বড় হয়ে উঠেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং বৈশ্বিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা। চীন আজ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের প্রধান চালিকাশক্তি এবং মার্কিন ও ইউরোপীয় পুঁজির প্রধান অংশীদার। ফলে বিশ্ব পুঁজিবাদের যেকোনো সংকট চীনের নিজস্ব অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। এই আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে চীন কখনোই বিশ্ব পুঁজিবাদের পতন চায় না, বরং এই ব্যবস্থার সংস্কার করে সেখানে নিজের অংশীদারিত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শোষিত মানুষের বৈপ্লবিক চেতনাকে জাগ্রত করার পরিবর্তে চীন তাদের শান্ত রাখার এবং বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই মানিয়ে নেয়ার বার্তা দেয়। এটি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী সারবত্তাকে হরণ করে তাকে একটি নির্জীব, সংশোধনবাদী তত্ত্বে রূপান্তর করার শামিল।   পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে চীন যে ক্ষমতার প্রদর্শন করছে, তা সর্বহারা শ্রেণির ক্ষমতা নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পুঁজির ক্ষমতা। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন সর্বহারা শ্রেণির অগ্রগামী দল নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে।   বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ যখন মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও করপোরেট শোষণে জর্জরিত, তখন চীনের মতো একটি বিশাল শক্তির এই নির্বিকার ও সুবিধাবাদী ভূমিকা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য এক বড় ধাক্কা। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই সত্যকে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি যে, লাল পতাকার আড়ালে লুকানো এই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ কোনোভাবেই বিশ্ব মুক্তিকামী মানুষের বন্ধু হতে পারে না। সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে বৈশ্বিক সর্বহারা শ্রেণিকে চীনের এই সংশোধনবাদী ও নব্য-সাম্রাজ্যবাদী রূপকে চিনে নিয়েই নতুন করে বিপ্লবের পথ অন্বেষণ করতে হবে।  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

ছাদবাগান : গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিস্তারের উপায়

খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি : ৫৬ বছরের পথচলা ও আগামীর প্রত্যয়

গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া এবং আমাদের বাস্তবতা

‎‎নৈতিকতা, মানবতা ও শান্তির অনন্য আদর্শ‎ মহানবি (সা.)

‎মানবসভ্যতা আজ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সহিংসতা, বৈষম্য, অন্যায়, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজজীবনে নানা সংকট তৈরি করছে। মানুষের হাতে যোগাযোগের শক্তি বেড়েছে, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ সেই অনুপাতে বাড়েনি।   সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষ মুহূর্তে একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারলেও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতার ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রে বিভাজন বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা মানবতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দিশা। পবিত্র কোরআন তাঁকে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছে, “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (সুরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)‎‎‎   মহানবি (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সুরা আল-কলম, ৬৮:৪)। নবুয়তের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে চিনত। তিনি অশ্লীল ও কদর্যভাষী ছিলেন না। সহিহ বুখারিতে তাঁর সুন্দর চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা চরিত্রে সর্বোত্তম।” (সহিহ বুখারি, ৬০৩৫)। এতে স্পষ্ট হয়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সততা, আমানতদারি ও সুন্দর আচরণে।‎‎   আল্লাহ বলেন, “আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।” (সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)। তাঁর দয়া শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রাণীর প্রতিও তিনি মমতা প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন। শিশুদের প্রতি তাঁর স্নেহ ও দয়ার কথা সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (২৩১৮)। একটি বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার না দেয়ার কারণে এক নারীর শাস্তির ঘটনাও হাদিসে এসেছে। তাই শিশু, বৃদ্ধ, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা তাঁর শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।‎‎   কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর রহমতেই মহানবি (সা.) মানুষের প্রতি কোমল ছিলেন; তিনি কঠোর হলে মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। একই আয়াতে ক্ষমা, মানুষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও পরামর্শের নির্দেশ রয়েছে (সুরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি বহু নির্যাতনকারীকেও সাধারণ ক্ষমা করেন। তায়েফের কঠিন নির্যাতনের পরও তিনি তাদের ধ্বংসের বদলে হেদায়েতের প্রত্যাশা করেছিলেন। এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মতের অমিল মানেই শত্রুতা নয়।     শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ বুখারিতে এসেছে, জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতেন যে মহানবি (সা.) মনে করেছিলেন, প্রতিবেশীকে হয়তো উত্তরাধিকারী করা হবে (৬০১৪)। আরও এসেছে, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, তার ইমানের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে (৬০১৬)। তাই প্রতিবেশীর নিরাপত্তা, অধিকার ও বিপদে সহযোগিতা সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি।‎‎   মহানবি (সা.) পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর সন্তান ইবরাহিমকে কোলে নেয়া ও চুম্বন করার ঘটনা সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (২৩১৬)। বিদায় হজের ভাষণেও নারীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি যত্নশীল হওয়ার নির্দেশ পাওয়া যায় (সহিহ মুসলিম, ১২১৮)। পরিবারে নির্যাতন, অবহেলা ও অসম্মানের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা তাঁর শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।‎‎   মহানবি (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে মানুষের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় ঘোষণা করা হয় (সহিহ মুসলিম, ১৬৭৯)। এর মাধ্যমে মানবমর্যাদা ও অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আমানতদারি তাই অপরিহার্য।‎‎   একটি সমাজের মানবিকতা বোঝা যায় দুর্বল ও অসহায় মানুষের সঙ্গে তার আচরণে। মহানবি (সা.) মানুষের বংশ, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তে তাকওয়া ও চরিত্রের গুরুত্ব দিয়েছেন। অধীনস্থ মানুষের প্রতি সদাচরণ, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সামর্থ্যের বাইরে কাজের বোঝা না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও তাই গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব।     মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের কল্যাণের প্রতি দায়িত্ববোধ। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যে ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের প্রতি কঠোরতা করে, তার জন্য সতর্কতা রয়েছে; আর কোমলতা ও সদাচরণের জন্য কল্যাণের দোয়া করা হয়েছে (১৮২৮)। তিনি বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকের অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।” অর্থাৎ নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের দায়িত্বও।     ইসলাম বৈধভাবে সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং সৎ উপার্জন, আমানতদারি, ন্যায়সংগত লেনদেন ও অসহায়ের অধিকার রক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে সুদ বাতিল এবং মানুষের সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তার কথা এসেছে (সহিহ মুসলিম, ১২১৮)। নবুয়তের আগেও মহানবি (সা.) ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘হিলফুল ফুজুল’-এ অংশ নিয়েছিলেন। প্রতারণা, দুর্নীতি ও শোষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়ের পথে বাধা।   মহানবি (সা.)-এর জীবনে শান্তি, ন্যায় ও সহাবস্থানের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধি, মদিনা সনদ ও মক্কা বিজয়ের সাধারণ ক্ষমা তাঁর শান্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকৃত শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে নিরাপত্তা, অর্থনীতিতে ন্যায় এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠার সমন্বিত ফল।   মহানবি (সা.)-এর জীবন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি নৈতিক ও মানবিক জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, প্রতিবেশীর অধিকার, পারিবারিক মমতা, দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, পরামর্শ ও সংযম—এসব মূল্যবোধ আজও সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান শুধু আলোচনা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনে তাঁর শিক্ষার প্রয়োগে প্রকাশ পেতে পারে।‎‎   সর্বোপরি, মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন নৈতিকতা, মানবতা, ন্যায় ও শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নৈতিকতা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থতার ভিত্তি। তাই সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাই তাঁর আদর্শ অনুসরণের অন্যতম বাস্তব প্রকাশ।  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকারত্ব সংকট : পরিবর্তনের এখনই সময়

প্রবীণ দিবসে প্রবীণের ভাবনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই : উপকূলের বাঁচা-মরার প্রশ্ন

ডেঙ্গু : মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নাকি আমাদের উদাসীনতার বিরুদ্ধে

ডেঙ্গু আমাদের কাছে আর নতুন কোনো রোগ নয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা ডেঙ্গুর কথা ভাবি, মশা নিধন অভিযান দেখি, সচেতনতামূলক প্রচারণা শুনি। হাসপাতালগুলোতে বাড়ে রোগীর চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সতর্কবার্তা, বাসাবাড়িতে শুরু হয় মশারি, কয়েল ও স্প্রে ব্যবহারের তোড়জোড়। তারপর কিছুদিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু ডেঙ্গু ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে।   বাংলাদেশে চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৯০-এ পৌঁছেছে। শুধু ২১ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টাতেই ১,৬৫৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটছে। ফলে ডেঙ্গুকে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। প্রশ্ন হলো—প্রতিবছর একই সময়ে একই সংকটের মুখোমুখি হয়েও আমরা কেন স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারছি না?   ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অনেকটা এমন হয়ে গেছে, যেন আগুন লাগার পর আমরা শুধু আগুন নেভানোর চেষ্টা করছি; কিন্তু আগুন লাগার কারণটি দূর করছি না। রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসা দেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার আগেই প্রশ্ন করতে হবে—যে পরিবেশে এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে, সেটি আমরা কেন তৈরি হতে দিচ্ছি?   একটি ছোট প্লাস্টিকের পাত্রে জমে থাকা পানি, ছাদের টবে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনের পানি কিংবা অযত্নে পড়ে থাকা কোনো পাত্র—এসবই এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু হাসপাতালের বিছানায় হয় না; যুদ্ধটা শুরু করতে হয় আমাদের বাড়ির বারান্দা, ছাদ, রাস্তার পাশ, নির্মাণস্থল, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, মানুষের চলাচল এবং অপর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গু কেবল একটি ভাইরাস বা একটি মশার গল্প নয়। এটি পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানুষের আচরণের সম্মিলিত প্রতিফলন।   আমাদের আরেকটি বড় ভুল হলো—ডেঙ্গুকে কেবল ‘মশার কামড়ের রোগ’ হিসেবে দেখা। বাস্তবে এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। একজন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শুধু একজন রোগী আক্রান্ত হন না; একটি পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। একজন কর্মজীবী মানুষের কয়েক দিনের অসুস্থতা পরিবারের আয় কমিয়ে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে। আর একজন মানুষের মৃত্যু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই ডেঙ্গুর পরিসংখ্যানকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।   ১৯০টি মৃত্যু মানে ১৯০টি পরিবারের শোক। ৬৩ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি মানে হাজার হাজার পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। তবে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোও সমাধান নয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই যে গুরুতর অবস্থা হবে, তা নয়। কিন্তু অবহেলারও সুযোগ নেই। জ্বর হলে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে, রোগের গতিপ্রকৃতি ও সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। কারণ, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ, সতর্কতামূলক লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।   এখানে চিকিৎসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসকরাও একা এ যুদ্ধ জিততে পারবেন না। একজন চিকিৎসক রোগীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে পারে, কিন্তু বাইরে যদি প্রতিদিন নতুন নতুন এডিসের প্রজননস্থল তৈরি হয়, তাহলে হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে না। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।   শুধু অভিযান চালিয়ে, মাইকিং করে কিংবা কয়েক দিন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন নিয়মিত মশার উপস্থিতি ও প্রজননস্থল পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থলে দায়িত্বশীলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘Integrated Vector Management’-এর ওপর গুরুত্ব দেয়—অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধন নয়; একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের মশার সংস্পর্শ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে।   এখানে নাগরিকের ভূমিকাও কম নয়। নিজের বাসার আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা কোনো ছোট কাজ নয়। ছাদে, টবে বা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে পানি জমে থাকলে তাকে সতর্ক করাও দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ।   স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির, বাজার, অফিস, কারখানা ও নির্মাণস্থল—প্রতিটি জায়গাকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হতে হবে। WHO-এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশভিত্তিক আলোচনাতেও সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য খাত ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হাসপাতাল নয়—আমাদের নিজেদের ঘর ও আশপাশের পরিবেশ।   আজ যদি আমরা শুধু রোগী গুনতে থাকি, আগামীকাল সংখ্যাটা আরও বড় হতে পারে। কিন্তু আজ যদি প্রতিটি সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করি, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াই, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করি এবং চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিই, তাহলে ডেঙ্গুর বোঝা কমানোর বাস্তব সুযোগ রয়েছে।   ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে শুধু মশার বিরুদ্ধে নয়; এটি আমাদের অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধেও একটি যুদ্ধ। একটি এডিস মশা খুবই ছোট। কিন্তু সেই ছোট মশার জন্য যদি আমাদের অবহেলা বড় হয়ে ওঠে, তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।   ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, শুধু চিকিৎসকেরও নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু—‘কতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো?’—এটা নয়। প্রশ্ন হলো—পরবর্তী রোগীটি যেন আক্রান্ত না হন, তার জন্য আমরা আজ কী করলাম?  

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0

‎শিশু নিখোঁজ ও হত্যা শুধুই সংখ্যা নয়, একটি অশনিসংকেত

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

বিশ্বব্যাপী কমছে সুপেয় পানি : আমরা কতটুকু প্রস্তুত

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের সংকট : একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মূল্যায়ন

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0