Breaking news
উপসম্পাদকীয়

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড : আমাদের কিশোরসমাজের গভীর সংকটের আয়না

নূর-উন-নাহার বেগম
নূর-উন-নাহার বেগম আইনজীবী আফতাবনগর,  ঢাকা
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ 0
ছবি : সংগহীত
ছবি : সংগহীত

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে তেরো বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর এ প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজের কণ্ঠস্বর। অপ্রতিম সেদিন মায়ের আইফোনটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিল। আর বাড়ি ফেরেনি। এক দিন পর তাকে পাওয়া গেল নিথর, রক্তাক্ত অবস্থায়। যে সন্তানকে মা-বাবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বড় করছিলেন, এক মুহূর্তে সেই স্বপ্ন পরিণত হলো এক অসহনীয় শূন্যতায়।

 

ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং একটি আইফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক বক্তব্যে ফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যার কথা এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বা আদালতের রায় হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু আইনের তদন্তের পাশাপাশি সমাজেরও একটি তদন্ত প্রয়োজন।

 

শুরু কোথায়, শেষ কোথায়, মুক্তি কোথায়? অপ্রতিমকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বাইক, কোথাও টিকটক, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর দৃশ্য। এসব ছবি বা ভিডিওর সত্যতা, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল হবে না। এসবের সঙ্গে অপ্রতিমের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

 

অপ্রতিমকে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব দৃশ্য আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে। আমাদের কিশোররা আজ কোথায় বড় হচ্ছে?

 

একসময় একটি শিশুর পৃথিবী ছিল মাঠ, স্কুল, বই, বন্ধু, পাড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর পরিবারের উঠোন। এখন সেই পৃথিবীর বড় একটি অংশ চলে গেছে মোবাইলের পর্দায়। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, অসংখ্য ভিডিও, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অনলাইন স্বীকৃতির নেশা। সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন জগৎ।

 

প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। মোবাইল শিক্ষা দিতে পারে, যোগাযোগ তৈরি করতে পারে, প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভার্চুয়াল পৃথিবী বাস্তব পৃথিবীর বিকল্প হয়ে ওঠে। আর তখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট বাস্তব পৃথিবী তৈরি করেছি? দিয়েছি কি পর্যাপ্ত মাঠ? নিরাপদ আড্ডার জায়গা? পাঠাগার? খেলাধুলার সুযোগ? সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ? এমন একজন শিক্ষক, যাঁর কাছে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে? এমন একটি পরিবার, যেখানে ভুল করলে সন্তান শাস্তির ভয়ে নয়, বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথা বলতে পারে?

 

আমরা যখন এসব জায়গা সংকুচিত করেছি, তখন মোবাইলের পর্দা স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে উঠেছে।আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, একটি কিশোর যখন স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, তখন তার শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয় মাত্র। তার জীবন কিন্তু থেমে যায় না। এরপর তার সামনে কী থাকে, এ প্রশ্নের উত্তর কি আমরা প্রস্তুত রেখেছি?

 

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসা এক তরুণের শিক্ষাজীবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সে একাদশ শ্রেণিতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৫ সালে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। পড়াশোনা ছেড়ে দেয়া কোনো মানুষকে অপরাধী বানায় না। বরং প্রশ্ন হলো, একজন তরুণ যখন শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তখন তাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাই? কারিগরি শিক্ষা? কর্মমুখী প্রশিক্ষণ? খেলাধুলা? সংস্কৃতি? নাকি তাকে ছেড়ে দিই এমন এক জগতের হাতে, যেখানে সময় কাটানোর জন্য তার হাতে শুধু একটি মোবাইল থাকে?

 

এখানেই তৈরি হয় ঝুঁকি। কেউ ভুল বন্ধুত্বে জড়িয়ে যেতে পারে। কেউ মাদকের দিকে যেতে পারে। কেউ অপরাধী চক্রের প্রলোভনে পড়তে পারে। আবার অনেকে কোনো অপরাধে না জড়িয়েও শুধু দিশাহীনতায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু ‘অপরাধী কে?’ এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। আরেকটি প্রশ্ন করতেই হবে, ‘অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা কোথায় ছিলাম?’

 

আমরা কি সন্তানের পাশে ছিলাম? শুধু তার হাতে দামি ফোন তুলে দিয়েছি, নাকি ফোনের ওপারের পৃথিবী নিয়েও তার সঙ্গে কথা বলেছি? তার বন্ধুদের চিনেছি? তার ভয় শুনেছি? তার মন খারাপ বুঝেছি? তার ব্যর্থতার পর তাকে আবার দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছি?

 

একটি মাঠ হয়তো একজন কিশোরকে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে পারে। একটি বই হয়তো তাকে একটি নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। একজন ভালো শিক্ষক হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল প্রতিবেশী হয়তো একটি বিপদ আগেই দেখতে পারেন। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হয়তো তাকে অন্য রকম স্বপ্ন দেখাতে পারে। আর একটি পরিবার হয়তো তাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

একজন কিশোরকে বাঁচাতে সব সময় বড় কোনো প্রকল্প লাগে না। কখনো কখনো লাগে একজন মানুষের সময়, মনোযোগ ও বিশ্বাস। রাষ্ট্রের দায়িত্বও তাই শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলার অবকাঠামো, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং নিরাপদ জনপরিসর—এসব কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপাদান। কারণ, একটি সমাজ তার ভবিষ্যৎকে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে তৈরি করে না। তৈরি করে তার পরিবেশ দিয়ে।

 

অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের বুকের ভেতর একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ক্ষত যেন শুধু কয়েক দিনের শোক হয়ে না থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট লিখে, কিছুদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে, তারপর সব ভুলে গেলে চলবে না।

 

অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার মায়ের কোলে সে আর মাথা রাখবে না। বাবার সঙ্গে আর কোনো সাধারণ দুপুর ভাগ করে নেবে না। বন্ধুরা হয়তো আর কোনো দিন তাকে নিয়ে ছবি তুলবে না। কিন্তু অপ্রতিমের মতো আরও অসংখ্য কিশোর আমাদের চারপাশে আছে। কেউ হয়তো একা। কেউ হয়তো ভুল বন্ধুত্বের দিকে এগোচ্ছে। কেউ হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ হয়তো সারা দিন মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে। কেউ হয়তো পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ হয়তো শুধু একজন মানুষের অপেক্ষায় আছে যে তাকে বলবে, “তুমি একা নও।”

 

আমরা যদি সেই মানুষটি হতে না পারি, তাহলে কোনো এক সন্ধ্যায় আবার হয়তো কোনো মায়ের ফোনে আসবে একটি অচেনা কল। আবার কোনো বাবা ছুটবেন থানায়, হাসপাতালে, রাস্তায়। আবার কোনো পরিবার খুঁজবে তার সন্তানকে। আর আমরা আবার প্রশ্ন করব, ‘এমন হলো কেন?’

 

এই ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজতে হলে আজ থেকেই শুরু করতে হবে। শুরু কোথায়? স্ক্রিনে? একাকিত্বে? ভুল সঙ্গের কাছে? শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ায়? নাকি আমাদের উদাসীনতায়? শেষ কোথায়? একটি লাশের পাশে? একটি মায়ের আর্তনাদে? একটি বাবার শূন্য চোখে?

 

আর মুক্তি কোথায়? মুক্তি শুধু একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তারে নয়। বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের যথাযথ তদন্ত ও আইনগত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি বদলাতে হবে সেই পরিবেশ, যেখানে একজন কিশোর ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

 

অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য  দায় কার? তার উত্তর তদন্ত ও আদালত দেবে। কিন্তু অপ্রতিমদের আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকে দিতে হবে। কারণ, আজ অপ্রতিম। আগামীকাল কে?

 

একটি সন্তান হারানোর পর কান্না করার চেয়ে, তার আগে একজন সন্তানকে ধরে রাখা অনেক বেশি জরুরি। আমরা কি সেই হাতটি বাড়িয়ে দেব? নাকি আরেকজন অপ্রতিম হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকব? প্রশ্নগুলো আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, অপ্রতিম শুধু একটি নাম নয়। সে আমাদের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎকে আমরা কোন বাংলাদেশ দেব। সিদ্ধান্তটা আজ থেকে আমাদেরই নিতে হবে ।

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

২৪-এর সাতকাহন

শুরুটা ছিল কোটা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু জবাব চাইলেই কেন ওঠে রোষ? ছাত্রজনতা জবাব খুঁজতে যায় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে সত্যের দীপ্তি ছড়ায়।   কোটা নয় শুধু, ছিল অধিকার ছিল বঞ্চিতের কান্না, ইতিহাসের ভার। চোখে আগুন, মুখে প্রতিবাদ ২৪-এ জেগে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাধ।   চারপাশে পুলিশ, হাতে গ্যাস আর গুলি তাদের ভাষা যেন আতঙ্ক আর বুলি। গায়ে লাগে ধোঁয়া, বুকে বাজে ব্যথা তবুও পিছু হটে না ছাত্রের মাথা।   এক বন্ধু গেল পড়ে, আরেকজন ধরে স্লোগান রক্তমাখা পায়ে লেখা হলো মুক্তির গান। আমরা হারিনি, মরিনি ভয়েতে দাঁড়িয়েছি বুক পেতে দুঃসহ সহ্যশক্তির প্রহর গেঁথে।  

এক দিনের জন্য যদি সবাই সত্য কথা বলত

পৃথিবীতে এমন একটি দিন কল্পনা করা যাক, যেদিন কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারবে না। ইচ্ছা থাকলেও সত্যকে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না। মুখে যা আসবে, তা আড়াল করার আগেই প্রকাশ পাবে। সম্পর্ক, রাজনীতি, ব্যবসা, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা সেদিন হঠাৎ প্রকাশ্যে চলে আসবে। মিথ্যাগুলোর সত্যরূপ বের হয়ে যাবে। পৃথিবীটা ওই দিন চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ নিজের এবং অন্যের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে শিখবে। বাস্তব বিষয়টা জানবে।   মানুষের জীবনে মিথ্যার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক। মিথ্যাটাকে মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করা হয় নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে, কখনো নিজের দুর্বলতা লুকাতে। আবার কখনো মিথ্যা হয়ে ওঠে স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে থেকেই মানুষ শিখে যায় কোন সত্য বলা যায়, কোন সত্য গোপন রাখতে হয় এবং কখন একটি মিথ্যা পরিস্থিতিকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই সুযোগটি এক দিনের জন্যও না থাকে?   সকালের শুরুতেই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বহু প্রশংসা হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যাবে। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা সুবিধা পাওয়ার যে অদৃশ্য পথগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে। কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হবে, কেউ অন্যের প্রাপ্য কৃতিত্ব নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সুন্দর মুখোশের আড়ালে থাকা অসংগতি মানুষের সামনে চলে আসতে পারে। সত্যের পর্দায় আড়াল করা দুর্নীতি, অবিচার সব উন্মোচিত হয়ে যাবে।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়বে। ভালো ফলাফলের পেছনে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে চাপ, ভয়, তুলনা ও প্রত্যাশা কাজ করে, সেগুলো প্রকাশ পাবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো প্রথমবার স্বীকার করবে যে সব সময় ভালো থাকার অভিনয় তাদের কতটা ক্লান্ত করে। অভিভাবকেরাও বুঝতে পারবেন, সন্তানের ভালো ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কখনো কখনো সন্তানের নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেয়।   বন্ধুত্বের জায়গাটি সেদিন মোটেও সহজ থাকবে না। বহু বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিছু না বলা কথা, ছোটখাটো অভিমান কিংবা গোপন ঈর্ষার ওপর। সত্য প্রকাশের দিনে সেই আবেগগুলো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কিছু বন্ধুত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আবার কিছু বন্ধুত্ব আরও শক্ত হতে পারে। কারণ, সত্য কখনো কখনো সম্পর্ক শেষ করে, আবার কখনো সম্পর্ককে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচায়।   পরিবারের ক্ষেত্রেও দিনটি হতে পারে সবচেয়ে কঠিন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে অভিমান, প্রত্যাশা, ভয় ও না-পাওয়া জমিয়ে রাখে, সেগুলো সামনে আসবে। হয়তো কেউ প্রথমবার বুঝতে পারবে, তার কাছের মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। আবার কেউ উপলব্ধি করবে, ভালোবাসার নাম করে সে অন্যের ওপর কতটা চাপ, কতটা অভিনয় করেছে।    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও ব্যতিক্রম হবে না। সেদিন সাজানো জীবন দেখানোর সুযোগ থাকবে না। সাফল্যের ছবির পাশাপাশি ব্যর্থতার গল্পও প্রকাশ পাবে। আনন্দের পোস্টের আড়ালে থাকা একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থাকা ভয় কিংবা নিখুঁত জীবনের ছবির পেছনের বাস্তবতা সামনে চলে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে, পর্দায় দেখা জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তবে সত্যের সেই দিনটি শুধু অস্বস্তিকর হবে না; শিক্ষণীয়ও হবে।   মানুষ বুঝতে পারবে, সত্য সব সময় সুন্দর নয়। সত্য শুনলে কষ্ট হয়, কিছু সত্য সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মিথ্যার ওপর তৈরি শান্তি অনেক সময় সাময়িক। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পর যে সম্পর্ক টিকে যায়, সেটি আগের চেয়ে বেশি বাস্তব।   দিন শেষে পৃথিবী আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মানুষ আবার প্রয়োজনমতো কিছু কথা লুকাবে, কিছু কথা সাজিয়ে বলবে, কিছু সত্য নিজের ভেতরে রেখে দেবে। কিন্তু সেই এক দিনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যাবে।   হয়তো সবাই প্রতিদিন পুরোপুরি সত্য বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত নিজের কাছে সত্যি থাকার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী অনেক সময় অন্য কেউ নয় নিজের কাছেই নিজের বলা মিথ্যাগুলো   এক দিনের সত্য পৃথিবীকে বদলে দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষকে নিজের মুখোশের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে এটুকু নিশ্চিত। আর হয়তো সেই এক দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে, সত্য সম্পর্ক ভাঙার থেকে মিথ্যার তৈরি দেয়াল সরিয়ে সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলা।  

হিসাবের খাতা

ছোটবেলার অবুঝ হাত ছুঁতে যেত দিন ও রাত— আগুন, জল কিংবা ফুল ছিল না হিসেব, কোনটা ভুল। না বুঝেই কেউ অবহেলায় কাছে টেনে নেয় ভালোবাসায়। মোহের পর্দা যখন ওড়ে বাস্তবতা ধাক্কা মারে। চোখের সামনে স্পষ্ট হয় কার কী গুণ, কার কী ক্ষয়। ভুলগুলো সব চেনা যায় কিন্তু ফেরার সময় নাই। জীবন বুঝতে বুঝতেই শেষ উবে যায় সব রঙিন রেশ। হাতে থাকে শুধু ধূসর ছাই পেছনে ফেরার উপায় নাই।  

উপসম্পাদকীয়

View more
ছবি : সংগহীত
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড : আমাদের কিশোরসমাজের গভীর সংকটের আয়না

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে তেরো বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর এ প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজের কণ্ঠস্বর। অপ্রতিম সেদিন মায়ের আইফোনটি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিল। আর বাড়ি ফেরেনি। এক দিন পর তাকে পাওয়া গেল নিথর, রক্তাক্ত অবস্থায়। যে সন্তানকে মা-বাবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বড় করছিলেন, এক মুহূর্তে সেই স্বপ্ন পরিণত হলো এক অসহনীয় শূন্যতায়।   ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং একটি আইফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক বক্তব্যে ফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যার কথা এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বা আদালতের রায় হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু আইনের তদন্তের পাশাপাশি সমাজেরও একটি তদন্ত প্রয়োজন।   শুরু কোথায়, শেষ কোথায়, মুক্তি কোথায়? অপ্রতিমকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বাইক, কোথাও টিকটক, কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর দৃশ্য। এসব ছবি বা ভিডিওর সত্যতা, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল হবে না। এসবের সঙ্গে অপ্রতিমের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।   অপ্রতিমকে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব দৃশ্য আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে। আমাদের কিশোররা আজ কোথায় বড় হচ্ছে?   একসময় একটি শিশুর পৃথিবী ছিল মাঠ, স্কুল, বই, বন্ধু, পাড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর পরিবারের উঠোন। এখন সেই পৃথিবীর বড় একটি অংশ চলে গেছে মোবাইলের পর্দায়। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, অসংখ্য ভিডিও, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অনলাইন স্বীকৃতির নেশা। সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন জগৎ।   প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। মোবাইল শিক্ষা দিতে পারে, যোগাযোগ তৈরি করতে পারে, প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভার্চুয়াল পৃথিবী বাস্তব পৃথিবীর বিকল্প হয়ে ওঠে। আর তখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট বাস্তব পৃথিবী তৈরি করেছি? দিয়েছি কি পর্যাপ্ত মাঠ? নিরাপদ আড্ডার জায়গা? পাঠাগার? খেলাধুলার সুযোগ? সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ? এমন একজন শিক্ষক, যাঁর কাছে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে? এমন একটি পরিবার, যেখানে ভুল করলে সন্তান শাস্তির ভয়ে নয়, বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথা বলতে পারে?   আমরা যখন এসব জায়গা সংকুচিত করেছি, তখন মোবাইলের পর্দা স্বাভাবিকভাবেই বড় হয়ে উঠেছে।আর এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, একটি কিশোর যখন স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, তখন তার শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয় মাত্র। তার জীবন কিন্তু থেমে যায় না। এরপর তার সামনে কী থাকে, এ প্রশ্নের উত্তর কি আমরা প্রস্তুত রেখেছি?   অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসা এক তরুণের শিক্ষাজীবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সে একাদশ শ্রেণিতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৫ সালে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। পড়াশোনা ছেড়ে দেয়া কোনো মানুষকে অপরাধী বানায় না। বরং প্রশ্ন হলো, একজন তরুণ যখন শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তখন তাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাই? কারিগরি শিক্ষা? কর্মমুখী প্রশিক্ষণ? খেলাধুলা? সংস্কৃতি? নাকি তাকে ছেড়ে দিই এমন এক জগতের হাতে, যেখানে সময় কাটানোর জন্য তার হাতে শুধু একটি মোবাইল থাকে?   এখানেই তৈরি হয় ঝুঁকি। কেউ ভুল বন্ধুত্বে জড়িয়ে যেতে পারে। কেউ মাদকের দিকে যেতে পারে। কেউ অপরাধী চক্রের প্রলোভনে পড়তে পারে। আবার অনেকে কোনো অপরাধে না জড়িয়েও শুধু দিশাহীনতায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু ‘অপরাধী কে?’ এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। আরেকটি প্রশ্ন করতেই হবে, ‘অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা কোথায় ছিলাম?’   আমরা কি সন্তানের পাশে ছিলাম? শুধু তার হাতে দামি ফোন তুলে দিয়েছি, নাকি ফোনের ওপারের পৃথিবী নিয়েও তার সঙ্গে কথা বলেছি? তার বন্ধুদের চিনেছি? তার ভয় শুনেছি? তার মন খারাপ বুঝেছি? তার ব্যর্থতার পর তাকে আবার দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছি?   একটি মাঠ হয়তো একজন কিশোরকে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে পারে। একটি বই হয়তো তাকে একটি নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। একজন ভালো শিক্ষক হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল প্রতিবেশী হয়তো একটি বিপদ আগেই দেখতে পারেন। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হয়তো তাকে অন্য রকম স্বপ্ন দেখাতে পারে। আর একটি পরিবার হয়তো তাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।   একজন কিশোরকে বাঁচাতে সব সময় বড় কোনো প্রকল্প লাগে না। কখনো কখনো লাগে একজন মানুষের সময়, মনোযোগ ও বিশ্বাস। রাষ্ট্রের দায়িত্বও তাই শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলার অবকাঠামো, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং নিরাপদ জনপরিসর—এসব কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপাদান। কারণ, একটি সমাজ তার ভবিষ্যৎকে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে তৈরি করে না। তৈরি করে তার পরিবেশ দিয়ে।   অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের বুকের ভেতর একটি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ক্ষত যেন শুধু কয়েক দিনের শোক হয়ে না থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি পোস্ট লিখে, কিছুদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে, তারপর সব ভুলে গেলে চলবে না।   অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার মায়ের কোলে সে আর মাথা রাখবে না। বাবার সঙ্গে আর কোনো সাধারণ দুপুর ভাগ করে নেবে না। বন্ধুরা হয়তো আর কোনো দিন তাকে নিয়ে ছবি তুলবে না। কিন্তু অপ্রতিমের মতো আরও অসংখ্য কিশোর আমাদের চারপাশে আছে। কেউ হয়তো একা। কেউ হয়তো ভুল বন্ধুত্বের দিকে এগোচ্ছে। কেউ হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। কেউ হয়তো সারা দিন মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে। কেউ হয়তো পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ হয়তো শুধু একজন মানুষের অপেক্ষায় আছে যে তাকে বলবে, “তুমি একা নও।”   আমরা যদি সেই মানুষটি হতে না পারি, তাহলে কোনো এক সন্ধ্যায় আবার হয়তো কোনো মায়ের ফোনে আসবে একটি অচেনা কল। আবার কোনো বাবা ছুটবেন থানায়, হাসপাতালে, রাস্তায়। আবার কোনো পরিবার খুঁজবে তার সন্তানকে। আর আমরা আবার প্রশ্ন করব, ‘এমন হলো কেন?’   এই ‘কেন’-এর উত্তর খুঁজতে হলে আজ থেকেই শুরু করতে হবে। শুরু কোথায়? স্ক্রিনে? একাকিত্বে? ভুল সঙ্গের কাছে? শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ায়? নাকি আমাদের উদাসীনতায়? শেষ কোথায়? একটি লাশের পাশে? একটি মায়ের আর্তনাদে? একটি বাবার শূন্য চোখে?   আর মুক্তি কোথায়? মুক্তি শুধু একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তারে নয়। বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের যথাযথ তদন্ত ও আইনগত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি বদলাতে হবে সেই পরিবেশ, যেখানে একজন কিশোর ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।   অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য  দায় কার? তার উত্তর তদন্ত ও আদালত দেবে। কিন্তু অপ্রতিমদের আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকে দিতে হবে। কারণ, আজ অপ্রতিম। আগামীকাল কে?   একটি সন্তান হারানোর পর কান্না করার চেয়ে, তার আগে একজন সন্তানকে ধরে রাখা অনেক বেশি জরুরি। আমরা কি সেই হাতটি বাড়িয়ে দেব? নাকি আরেকজন অপ্রতিম হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকব? প্রশ্নগুলো আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, অপ্রতিম শুধু একটি নাম নয়। সে আমাদের ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যৎকে আমরা কোন বাংলাদেশ দেব। সিদ্ধান্তটা আজ থেকে আমাদেরই নিতে হবে ।  

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ 0

আর কত অপ্রতিমের মৃত্যু দেখবে বাংলাদেশ

নীরব মহামারির আত্মহত্যা প্রতিরোধে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ

মানবতার সংকট : সভ্যতার বড় চ্যালেঞ্জ

মৌলিক অধিকারের টানাপোড়েন

একটি দেশের নাগরিক হিসেবে জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। চিকিৎসা তার মধ্যে অন্যতম। মানুষকে সুস্থ সবলভাবে বাঁচতে হলে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার নানা জায়গায় সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। তবে কি শুধু হাসপাতাল নির্মাণেই জনগণ রোগ থেকে মুক্তি পাবে? না। জনগণকে তার প্রাপ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি হাসপাতালের সঠিক কার্য পরিচালনা। কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে জনগণের ভোগান্তি বাড়তে থাকে।   সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে টাকা খরচ করে নিজের চিকিৎসা করাতে পারে না। নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত লোকেদের রোগ হলে তাদের ভরসা কেবলই সরকারি হাসপাতালগুলো। তবে সরকারি হাসপাতালগুলো যেন অনিয়মের বেড়াজালে বন্দী। কেবল রোগীর আধিক্য বেশি, সেই অনুযায়ী ডাক্তার কম। রোগীকে পোহাতে হয় অসহ্য যন্ত্রণা অনিশ্চয়তার সাথে। কোনো সময় নেই সিট কিংবা নেই ডাক্তার। দিনের পর দিন রোগী ভর্তি থেকেও বড় ডাক্তারের দেখা নেই।   পাশাপাশি চলছে সিট বাণিজ্য, এ যেন সিন্ডিকেটের লীলাখেলা। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দালালের মাধ্যমে টাকা প্রদান করে একটি সিট পেতে হয়, নাহয় দিতে হয় কোনো রেফারেন্স। হাসপাতালের বারান্দায় কাটাতে হয় রাতের পর রাত। একটি তথ্য সংগ্রহ বা এক একটি টোকেন সংগ্রহ করতে রোগীকে দাঁড়াতে হয় ১০০, ২০০ জনের সিরিয়ালে। এ যেন রোগ ভালো করার বদলে আরও রোগী হওয়ার উপক্রম।   কোনো জটিল রোগের টেস্ট করানোর জন্য দৌড়াতে হয় প্রাইভেট হাসপাতালের দোরগোড়ায়; গুনতে হয় হাজার হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালের টেস্টের অপেক্ষায় বসে থাকলে রোগীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি বিভাগে নেই জরুরি বা ইনস্ট্যান্ট সমাধান, নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, যেখানে বসে রোগী অপেক্ষা করবে, নেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, যা খেয়ে রোগী বা তার স্বজন একটু পিপাসা মিটাবে, নেই স্বাস্থ্যকর কোনো পরিবেশ। হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর অবস্থান এবং যথাতথা অবাধ মানুষের যাতায়াত। এ কেমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ?   নেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনো ওয়াশরুম। হাসপাতালগুলোর ফ্রেশ রুমে ফ্রেশ হওয়ার বদলে যেতে হয় নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। নেই নিয়ম-নীতির বালাই। কোনো হাসপাতালে তো চলছে আরেকটি মরণ ফাঁদ। বহুতল হাসপাতালের ভবনের জন্য দেয়া হয়েছে লিফট, কিন্তু লিফটের ধারণক্ষমতার বাইরে রোগীরা উঠে যাচ্ছে। নেই জীবনের মায়া, দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতন হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই।   ডাক্তারদের অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতির মাঝে ভুগতে হয় রোগীকে। বিশেষ করে, সদর উপজেলা পর্যায়ের গ্রাম অঞ্চলের হাসপাতালে রোগীরা সুচিকিৎসার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এসে একরাশ হতাশা আর ভোগান্তি নিয়ে ফিরে যায়। এর সমাধান সম্ভব কেবলই সরকারের সজাগ দৃষ্টি আর সঠিক ব্যবস্থাপনায়।   রোগীর বিভিন্ন টোকেন সংগ্রহ পদ্ধতির কাজটা স্মার্টভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, যেন রোগীকে ২, ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়। হাসপাতালগুলোর ওয়াশরুম ব্যবস্থা আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। বহুতল ভবনবিশিষ্ট হাসপাতালে লিফটব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। হাসপাতালে মানুষের যাতায়াতে নিয়ম-শৃঙ্খলাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। জুতা নিয়ে প্রবেশ, মাস্ক পরিধান ইত্যাদি বিষয়গুলোতে আরও বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।   হাসপাতালে জটিল রোগ নির্ণয়ের টেস্ট করানোর ব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। সেই সাথে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সরকারি ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে, যাতে রোগীর চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়। জরুরি বিভাগগুলোর সেবা আরও উন্নত করতে হবে, যেন জরুরি রোগী সাথে সাথেই সেবা পেতে সক্ষম হয়।  

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0

মশার সঙ্গে নয়, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই নিজেদের অবহেলার সঙ্গে

নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় এবং উত্তরণে করণীয়

ছবি : সংগৃহীত

গণতন্ত্র ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং নির্বাচনব্যবস্থা জরুরি

‎‎বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা‎‎

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হলেও কৃষিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প, বাজার, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা এর গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো একসময় এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। আখচাষি, কৃষিশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, মিলশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিনের লোকসান, পুরোনো যন্ত্রপাতি, কাঁচামালের সংকট এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় কয়েকটি চিনিকলের কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে। বিএসএফআইসির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের কয়েকটির আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং সেগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে শুধু মিল চালু নয়, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত আখের সরবরাহ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সঠিক উদ্যোগে বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।‎‎   চিনিশিল্পের প্রাণ হলো আখচাষি। একটি চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় পড়েন সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকেরা। কারণ আখ এমন একটি ফসল, যার জন্য নির্দিষ্ট বাজার ও শিল্পভিত্তিক ক্রেতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিল বন্ধ থাকলে কৃষক বিকল্প বাজার খুঁজতে বাধ্য হন অথবা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আখচাষ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ উৎপাদনকাল, ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিক্রির ক্ষেত্রে জটিলতা। বন্ধ মিলগুলো আধুনিক ব্যবস্থাপনায় চালু করা গেলে কৃষকের জন্য আবার একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি হবে। এতে আখচাষে আগ্রহ বাড়বে এবং গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।‎‎   একটি চিনিকল শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মস্থল নয়; এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারও মানুষের জীবিকা জড়িয়ে থাকে। আখ কাটা, পরিবহন, লোডিং-আনলোডিং, যন্ত্রপাতি মেরামত, স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা—সবখানেই চিনিকলের প্রভাব রয়েছে। বন্ধ মিল পুনরায় চালু হলে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ব্যাপক পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে, গ্রামীণ যুবকদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কাজের সুযোগ বাড়বে। এতে কর্মসংস্থানের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে। সরকারও বন্ধ মিল পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়েছে।‎‎   গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় শক্তি হলো স্থানীয় পর্যায়ে অর্থের ঘূর্ণন। কৃষক আখ বিক্রি করে আয় করেন, সেই অর্থ দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটান, স্থানীয় দোকান থেকে পণ্য কেনেন এবং বিভিন্ন সেবায় ব্যয় করেন। অন্যদিকে মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের আয়ও স্থানীয় বাজারে প্রবাহিত হয়। চিনিকল বন্ধ হলে এই অর্থনৈতিক চক্র দুর্বল হয়ে পড়ে। দোকান, পরিবহন, হাটবাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে, একটি মিল উৎপাদনে ফিরলে কৃষকের আয় থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়। ফলে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরো এলাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে।‎‎   চিনিকল পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে কারণে মিলগুলো বন্ধ হয়েছিল, সেই সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান হয়েছে কি? বিএসএফআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সম্মিলিত নিট লোকসান ছিল প্রায় ৫০৮ কোটি টাকা। পুরোনো যন্ত্রপাতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, কম উৎপাদনশীলতা এবং আখের তীব্র সংকট ছিল এ লোকসানের প্রধান কারণ। তাই সুনির্দিষ্ট সংস্কার ছাড়া শুধু পুরোনো অবয়বে মিল চালু করলে আবারও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। সফল পুনর্জাগরণের জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি।‎‎   চিনিশিল্পকে লাভজনক ও টেকসই করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত মিল দীর্ঘদিনের পুরোনো ও প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রতুল যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে আখ থেকে চিনি আহরণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় মিলগুলোতে চিনি আহরণের হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল, যা আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক কম। আধুনিক যন্ত্রপাতি, রোগপ্রতিরোধী ও উচ্চ ফলনশীল আখের জাত এবং দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই বন্ধ মিল পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কেবল জোড়াতালির সংস্কার নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই, মিলগুলোর সামগ্রিক আধুনিকায়ন (বিএমআরই) এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।‎   চিনিশিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে আখের উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মানের ওপর। একই জমিতে কম সময়ে বেশি ফলন ও চিনি আহরণ সম্ভব হলে কৃষক ও মিল—উভয়েই লাভবান হবে। এ জন্য বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএসআরআই) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও চিনিসমৃদ্ধ আখের জাত মাঠপর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের আধুনিক চাষপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। আখচাষকে সনাতন কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত ই-পুঁজি ও সময়মতো অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে আখচাষে তাঁদের আগ্রহ ফিরবে। কারণ, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন জোগান ছাড়া কোনো চিনিকলই দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনকভাবে চালানো সম্ভব নয়।‎‎   চিনিকলের বড় সম্ভাবনা রয়েছে উপজাত পণ্যে। আখের ছোবড়া (ব্যাগাস) থেকে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিএসএফআইসি এই উদ্যোগ নিয়েছে; এতে মিলের বিদ্যুৎ ব্যয় কমার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। উত্তরবঙ্গ সুগার মিলসেও বন্ধ মৌসুমে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে অ্যালকোহল উৎপাদনও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অ্যালকোহল খাতে রেকর্ড ২২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। একই সময়ে চিনি উৎপাদনে ৬০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হলেও ডিস্টিলারি ও অন্যান্য ইউনিটের আয় প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ১৬৫ কোটিতে উন্নীত করেছে। এ ছাড়া প্রেসমাড থেকে জৈব সার এবং মোলাসেস থেকে ভিনেগার উৎপাদনেরও সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাতেও দেশের বন্ধ ও অচল কারখানাগুলো সচল করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।   সরকারি চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন, বহুমুখী উৎপাদন এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মাধ্যমে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাই ভবিষ্যতের চিনিকলকে শুধু চিনি উৎপাদনের কারখানা নয়, উপজাতনির্ভর সমন্বিত কৃষিভিত্তিক শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। এতে লোকসান কমার পাশাপাশি নতুন আয়, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির গতি বাড়বে।‎‎   ‎বন্ধ মিলগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বিপুল পরিমাণ পুঁজি ও বিনিয়োগের প্রয়োজন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার একাই সব মিলের আধুনিকায়ন ও পরিচালনার ব্যয় বহন করবে—এমন ধারণা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনস্বার্থবান্ধব সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) কার্যকর কাঠামো তৈরি করা। সাম্প্রতিক সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষও নতুন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বন্ধ মিল পুনরায় চালুর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জাতীয় সম্পদ ও কৃষকের মৌলিক স্বার্থ অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। যেকোনো যৌথ অংশীদারত্ব হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক সুরক্ষার ভিত্তিতে।‎‎   দেশের সব চিনিকলের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এক নয়। তাই সব মিলের জন্য ঢালাওভাবে একই ধরনের নীতি গ্রহণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কোন মিলে পর্যাপ্ত আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, কোথায় দ্রুত আধুনিকায়ন সম্ভব এবং কোন এলাকায় বহুমুখী কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা যাবে—এসব বিষয় পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো ধাপে ধাপে পুনরায় চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে প্রতিটি মিলের জন্য পৃথক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, কাঁচামালের নিশ্চয়তা এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদন কৌশল গ্রহণ করা গেলেই এই পুনর্জাগরণ বাস্তবসম্মত ও টেকসই হতে পারে।‎‎   সর্বোপরি, বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণ শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করার বিষয় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির হারানো গতি ফিরিয়ে আনার বড় সুযোগ। এর সুফল পাবেন আখচাষি, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত আখের জাত, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। চিনির পাশাপাশি মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে মিলগুলো আরও টেকসই ও লাভজনক হবে। তাই সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্ধ চিনিকলকে গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।  

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0

মদিনা সনদ : ১৪০০ বছর পেরিয়েও কেন প্রাসঙ্গিক

সংগীতশিল্পীর জীবন : শিল্পচর্চা ও জীবিকার বাস্তবতা

মহান শিক্ষা দিবস : আমাদের শিক্ষা হোক বিশ্ব মানের

সংশ্লিষ্ট খবর

ছবি : সংগহীত
উপসম্পাদকীয়

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড : আমাদের কিশোরসমাজের গভীর সংকটের আয়না

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ 0