একাধারে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব এবং শক্ত হাতে দলীয় সংকট মোকাবেলা করে দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যাক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজপথ থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর মনোনয়ন রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিকূল রাজনৈতিক স্রোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির হাল ধরে রাখা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার অধিষ্ঠিত হয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১৩ আগস্ট দলের প্রার্থী হিসেবে তাঁর মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হয়েছিল। বেলা আড়াইটার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা এই মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর আগে বঙ্গভবনের এই সর্বোচ্চ পদের জন্য মনোনীত হওয়ার পরপরই মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর নাম প্রস্তাব করলে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেন। নির্বাচনে তাঁর পক্ষে প্রস্তাবক হয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক হয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
গত ২৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করায় পদটি শূন্য হয়, যার পর থেকে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া একদম সহজ ছিল। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পক্ষে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদও মনোনয়নপত্র জমা দেয়ায় ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০ আগস্ট ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। এরপর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোট গণনায় দেখা যায়, ৩৪৯ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট আর অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
জাতীয় সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবং সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ১৯তম ব্যক্তি এবং মেয়াদ ও সময়ক্রমের বিচারে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মাঠের রাজনীতির একজন ক্লান্তিহীন সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর এই উত্তরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করছে।
ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বর্ণাঢ্য জীবন
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবারে জন্ম নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যও রাজনৈতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ এবং ধমনীতে রাজনীতির রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রেই। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন দেশভাগের আগে ও পরে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।
কেবল পিতাই নন, মির্জা ফখরুলের পারিবারিক পরিমণ্ডল ছিল দেশের ইতিহাসের নানা বাঁকের সাথে যুক্ত। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা এবং দেশের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ। তিনি শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ভূমিমন্ত্রী, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পিকার এবং পরবর্তী সময়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের ‘ডাইরেক্টরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্প’-এর পরিচালক হিসেবে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখে মির্জা ফখরুল পড়াশোনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তাঁর ভেতরে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। ষাটের দশকের সেই উত্তাল সময়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সক্রিয় সদস্য হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মেধা ও নেতৃত্বের কারণে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন।
ছাত্ররাজনীতি শেষে তিনি সরাসরি মূলধারার রাজনীতিতে না গিয়ে বেছে নেন আলো ছড়ানোর পেশা শিক্ষতার জীবন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নিজের স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও দক্ষতার সাথে কাজ করেন।
১৯৭৯ সালে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মির্জা ফখরুল তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করলে এবং উপপ্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম পুনরায় তাঁর প্রিয় শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তরুণদের আলো ছড়াতে থাকেন।
শৈশব ও কৈশোরের রাজনৈতিক চেতনা মির্জা ফখরুলকে বেশি দিন চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষে আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে চিরদিনের মতো ইস্তফা দিয়ে সরাসরি নামেন জনমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং তৃণমূলের মানুষের মন জয় করেন। পরবর্তী সময়ে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিতে যোগ দেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সাথে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদীয় রাজনীতির শুরুর পথটা মির্জা ফখরুলের জন্য মসৃণ ছিল না। ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। তবে দমে না গিয়ে তিনি মাঠের সংযোগ ধরে রাখেন। যার সুফল মেলে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট পেয়ে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়িত হয়। তিনি প্রথমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হাওয়ায় তিনি পরাজিত হলেও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সাথে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান এবং বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তবে দলীয় কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি সে সময় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
২০০৮ সালের পর বিএনপির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয়। আর ঠিক এই সময়েই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি দলের ও বিরোধী জোটের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে অত্যন্ত মার্জিত, যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো বক্তব্য দিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমাদর পান। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুর পর এক রাজনৈতিক শূন্যতার তৈরি হয়। দলীয় প্রধান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন মির্জা ফখরুল ইসলামকে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হিসেবে ঘোষণা করেন। শুরুতে এই পদায়ন নিয়ে দলে কিছুটা আলোচনা-বিভ্রান্তি তৈরি হলেও ২০১১ সালের ২১ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বিদেশ সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে পুনরায় তাঁর ওপর আস্থা পুনর্ব্যক্ত করলে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে। দীর্ঘ পাঁচ বছর দক্ষতার সাথে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
বিএনপির কঠিন সময়ে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান টার্গেট ছিলেন তিনি। এমন বাস্তবতায় সহ্য করেছেন হামলা-মামলা-কারাবরণ। গত চার দশক রাজপথের আন্দোলন আর দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে অনবদ্য ভূমিকা রেখে এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা জাতিকে পথ দেখিয়েছে গভীর সংকটময় মুহূর্তে।
২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান সমন্বয়ক ও সাংগঠনিক নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন। বিগত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হয়ে উঠেছেন এক ক্লান্তিহীন লড়াকু এবং চরম সহনশীলতার প্রতীক। বিরোধী দলের শীর্ষ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্রমাগত রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বিশাল অংশ কেটেছে আদালতের বারান্দায় অথবা কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে। গাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের কাজে বাধা, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কিংবা বোমাবাজির মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ১০০টিরও বেশি মামলা দেয়া হয়েছে তাঁর নামে। রাজপথের লড়াই পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে অন্তত ১১ বার কারাগারে যেতে হয়েছে এবং জীবনের মূল্যবান প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় কাটাতে হয়েছে কারান্তরালে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময় যেমন তাঁকে মাসের পর মাস বন্দী রাখা হয়েছে, তেমনি ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার ঠিক পরদিনই একটি পুরোনো মামলায় তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল।
এমনকি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনের সমাবেশের আগে গভীর রাতে উত্তরার বাসভবন থেকে ডিবি পুলিশ কর্তৃক তাঁকে তুলে নেয়া কিংবা ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের সমাবেশের পরদিন ভোরে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস কারাগারে থাকার ঘটনাগুলো তাঁর ওপর নেমে আসা ধারাবাহিক নিগ্রহেরই প্রমাণ। বয়স ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, হৃদ্রোগের জটিলতা এবং নানা শারীরিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে দিনের পর দিন স্যাঁতসেঁতে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। রাজপথে বহুবার টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং তাঁর গাড়িবহরে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সমস্ত নির্যাতন, উসকানি আর কারাবাসের পরও রাজনীতি থেকে পিছিয়ে না গিয়ে ধীরস্থির, মার্জিত ও অহিংস নীতি অবলম্বন করে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন।
রাজনৈতিক ঝড়-ঝাঁপটার মাঝে মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত জীবন শান্ত ও ছিমছাম। তিনি রাহাত আরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান রয়েছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে ঢাকার একটি নামি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন।
শ্রেণিকক্ষের অর্থনীতি পড়ানোর অধ্যাপক থেকে রাজপথের তপ্ত রোদে স্লোগান দেয়া, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে কোটি মানুষের দলের নেতৃত্ব দেয়া—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন যেন এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। দলীয় রাজনীতি এবং মহাসচিবের পদ ছেড়ে তিনি পদার্পণ করতে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে, দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে। বিএনপি একজন যোগ্য মানুষকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ, বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর অসামান্য অবদান ছিল। জাতির প্রত্যাশা—এই সুযোগ তিনি দায়িত্বশীলতা, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও সাংবিধানিক মর্যাদার সঙ্গে কাজে লাগাবেন।
আশা করি, তিনি দক্ষতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করবেন। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একজন সর্বজনগ্রাহ্য, অভিজ্ঞ এবং সহনশীল অভিভাবক হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এমনটাই প্রত্যাশা দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ জনগণের।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে যদি স্পষ্টভাবে লেখা থাকে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত চর্বি’—তাহলে একজন ভোক্তা পণ্য কেনার আগে কয়েক সেকেন্ডেই তাঁর পুষ্টিগত ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। এ ধারণা থেকেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আলোচনা চলছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৬ সালের খসড়া প্রবিধানকে ঘিরে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। গত ২৬ জানুয়ারি বিএফএসএ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। এতে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ/সোডিয়াম ও সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে তা সহজে বোঝানোর জন্য সতর্কতামূলক চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। অংশীজনদের মতামত দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপরই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খসড়াটির পরবর্তী যাত্রাপথ। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, মতামত গ্রহণের পর খসড়াটি নিয়ে আরও কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ হয়েছে। মার্চে খসড়াটির সমন্বিত বা ‘হারমোনাইজকৃত’ সংস্করণ নিয়ে কাজের তথ্য পাওয়া যায়। বিএফএসএ সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েবের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ৩০ জুন খসড়াটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর এর গতিপথ কতদূর এগিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কোন পর্যায়ে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, কোন কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা এতে যুক্ত হয়েছে, অংশীজনদের আপত্তি ও প্রস্তাবের কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং খসড়ার কোন কোন ধারা পরিবর্তিত হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গভাবে নেই। আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আবারও বলা হয়েছে, এফওপিএলের খসড়া তখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ বছরের শুরুতে আলোচনা শুরু হয়ে, মতামত গ্রহণ, সমন্বিত খসড়া তৈরি এবং মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরও প্রবিধানটি গেজেট আকারে চূড়ান্ত হয়নি। অথচ বিএফএসএর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক এফওপিএল দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর উত্তর খুঁজতে অন্তত চারটি নথি পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২৬ জানুয়ারির মূল খসড়া, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া অংশীজনদের মতামত, মার্চের সমন্বিত খসড়া এবং ৩০ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সংস্করণ। এসব নথি তুলনা করলে বোঝা যেতে পারে, মতামত গ্রহণের পর খসড়ায় কী পরিবর্তন এসেছে এবং কোন প্রস্তাবগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে আছে। এ ছাড়া বিএফএসএর কারিগরি কমিটির আলোচনায় শিল্পখাতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তি, দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক বাস্তবায়নের প্রস্তাব, ছোট প্যাকেটের জন্য ছাড় এবং ডব্লিউটিও-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো খসড়ার পরবর্তী সংস্করণে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নথিপত্র ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এফওপিএলের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য শুধু একটি প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। হৃদ্রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। দেশের খাদ্যবাজারেও প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপস্থিতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ৯৭৪ জন অংশগ্রহণকারীর ৯৭ শতাংশ আগের সপ্তাহে অন্তত একটি প্রক্রিয়াজাত বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেছিলেন। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি খাদ্যপণ্যের ৬৩ শতাংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সোডিয়াম বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি সোডিয়াম পাওয়া যায়। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে লেবেলে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষিত সোডিয়ামের মাত্রার অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে। এই বাস্তবতায় ভোক্তার জন্য সহজবোধ্য তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক পণ্যে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য থাকলেও তা প্যাকেটের পেছনে, ছোট অক্ষরে অথবা সংখ্যাভিত্তিকভাবে দেওয়া হয়। ফলে একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। এখানেই এফওপিএল ও জিডিএ—অর্থাৎ নির্দেশিকা দৈনিক পরিমাণ—পদ্ধতির পার্থক্য। জিডিএ ব্যবস্থায় ভোক্তাকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ দৈনিক প্রয়োজনের সঙ্গে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অন্যদিকে সামনের সতর্কতামূলক চিহ্ন তুলনামূলকভাবে সরল। একটি স্পষ্ট প্রতীক দেখেই বোঝা যায় কোনো পুষ্টি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় রয়েছে কি না। বিশেষ করে, সীমিত পুষ্টিজ্ঞানসম্পন্ন ভোক্তাদের জন্য এই সরলতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শিল্পখাতের উদ্বেগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থা চালু করতে প্যাকেটের নকশা পরিবর্তন, নতুন মোড়ক তৈরি, পুরোনো প্যাকেটের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জিডিএ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা এবং বাধ্যতামূলক করার আগে দীর্ঘ সময়ের স্বেচ্ছামূলক পর্যায়ের প্রস্তাব এসেছে। সংশ্লিষ্ট আলোচনায় অন্তত পাঁচ বছর স্বেচ্ছামূলকভাবে ব্যবস্থা চালুর দাবিও উঠে এসেছে। এই পাঁচ বছরের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাস্তবায়নের জন্য যৌক্তিক প্রস্তুতির সময় কতটা প্রয়োজন, আর কতটা সময় নীতির বাধ্যতামূলক প্রয়োগ পিছিয়ে দিতে পারে। শিল্পের বাস্তব ব্যয় ও সক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন; তবে একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যও যেন দুর্বল না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। পণ্যের আকার ছোট হলেও অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বির স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে যায় না। তাই কোনো ছাড়ের প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার সুরক্ষা এবং বাস্তব বাজারপরিস্থিতি একসঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ডব্লিউটিও নোটিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গতিও অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাস্তব কারিগরি বা আইনি ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রক্রিয়া যেন জনস্বাস্থ্য নীতি চূড়ান্ত করার অনির্দিষ্ট বিলম্বের কারণ না হয়, সেটিও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফওপিএল কোনো খাদ্যপণ্য নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নয়। এর মূল উদ্দেশ্য ভোক্তাকে সহজবোধ্য তথ্য দেওয়া, যাতে তিনি পণ্য কেনার আগে নিজের জন্য সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই এটি ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য দুইয়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত। এখন প্রয়োজন বিতর্ককে ‘শিল্প বনাম জনস্বাস্থ্য’ এই সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিএফএসএ থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ফাইলে কী মতামত দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো সংস্থা কী বলেছে, শিল্পসংগঠনগুলোর লিখিত প্রস্তাবের কোন অংশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে কোন সংস্করণটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে। বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা যখন বাড়ছে এবং প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহারও বিস্তৃত হচ্ছে, তখন প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগত তথ্য সহজবোধ্য করার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে শিল্পের যৌক্তিক বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত উদ্বেগও শুনতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা। কোনো পক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা কোনো একক প্রশাসনিক জটিলতা যেন নীতির গতিপথ এককভাবে নির্ধারণ না করে, এটাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য। প্যাকেটের সামনে একটি কালো অষ্টভুজ হয়তো দেখতে ছোট একটি চিহ্ন। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন ভোক্তা কী কিনবেন, কী খাবেন এবং নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন সেই বড় প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, সেই সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত প্যাকেটের সামনে জায়গা পায়, নাকি নীতিনির্ধারণের ফাইলেই আটকে থাকে। almamunrabbi21@gmail.com
একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা নিরাপদ, আনন্দময় ও সম্ভাবনাময়। তার হাতে থাকার কথা বই, খেলনা ও স্বপ্ন—শ্রমের বোঝা নয়। বিদ্যালয়ের পথে থাকার কথা তার পা—ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে নয়। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু শিশুর শৈশব এখনো দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও সহিংসতার মতো সংকটে আটকে আছে। এ সংকট কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; দেশের শিশুদের জীবনমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রকাশিত পরিসংখ্যানও তা স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারির ভিত্তিতে দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ—মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো প্রান্তিক সামাজিক উদ্যোগ নয়; এটি দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় দায়িত্ব। শিশুর অধিকার কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের বেঁচে থাকা, বিকাশ, সুরক্ষা ও অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আইনে অধিকার স্বীকৃত হওয়া আর বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করতে পারা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রতিটি শিশুর কাছে এই অধিকারগুলো কতটা পৌঁছাচ্ছে? দারিদ্র্য শিশুর জীবনে শুধু অভাব তৈরি করে না; অনেক সময় তার শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের স্বাধীনতাও সংকুচিত করে। পরিবারের আয় কমে গেলে কোনো শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যায়, কেউ দীর্ঘ সময় শ্রম দেয়, আবার কোনো মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে পরিবারের সংকটের সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিবিএস ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক অগ্রগতির পাশাপাশি শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। ইউনিসেফে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের জরিপের তুলনায় শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ বেড়েছে। এ সংখ্যা কেবল শ্রমে যুক্ত শিশুর হিসাব নয়; এর পেছনে রয়েছে হারানো পড়াশোনা, সীমিত অবসর, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংকুচিত সুযোগ। তাই শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, পরিবারের আয় বৃদ্ধির সুযোগ এবং মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময়টি তার শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। অথচ বাল্যবিবাহ অনেক মেয়েশিশুকে সেই সময়ের আগেই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দায়িত্বে ঠেলে দেয়। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণেও দীর্ঘমেয়াদি বাধা তৈরি করতে পারে। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছিল। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু প্রায় অর্ধেক তরুণীর বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা এখনো বাস্তবতার একটি বড় অংশ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু আইন বা সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়। মেয়েশিশুর বিদ্যালয়ে থাকা, নিরাপদ পরিবেশ, পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। শিক্ষা শিশুর অধিকার; কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই শিক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। শিশু সেখানে থাকছে কি না, কী শিখছে এবং তার শেখার পরিবেশ কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের MICS ২০২৫-ভিত্তিক বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। একই তথ্যসূত্রে প্রাথমিক স্তরের সমাপনী হার ৮৩.৭ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৪৩.৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। সব শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করছে না, আর শিক্ষার উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর পথে অনেকেই পিছিয়ে পড়ছে। তাই শিক্ষানীতির লক্ষ্য শুধু ভর্তি বাড়ানো নয়; শেখার মান উন্নত করা, ঝরে পড়া কমানো এবং মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করাও হতে হবে। শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব। কিন্তু ঘরকেও সব সময় শিশুর জন্য নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ জরিপের আগের এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৮৮.৮ শতাংশ। হার কিছুটা কমলেও বিপুলসংখ্যক শিশুর জীবনে সহিংস শাসন এখনো উদ্বেগজনক বাস্তবতা। শারীরিক শাস্তি, নির্যাতন, বুলিং ও অনলাইন হয়রানি শিশুর আত্মবিশ্বাস, মানসিক সুস্থতা এবং অন্যের ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেক শিশু ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশও করতে পারে না। তাই শিশুকে শুধু অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হবে, গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে এবং অভিযোগের কারণে তাকে দোষারোপ বা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে না। একটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম ধাপগুলোর একটি হলো তার আইনগত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। জন্মনিবন্ধন শুধু একটি সনদ নয়; এটি পরিচয়ের প্রমাণ এবং বিভিন্ন সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। MICS ২০২৫ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫৯.২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন রয়েছে। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর জন্ম এখনো সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। এই ব্যবধান কমাতে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ, সহজলভ্য এবং প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের মতামত শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। বয়স কম বলে কোনো শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্বহীন মনে করা উচিত নয়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে বয়স ও পরিপক্বতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মতামত প্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। শিশু শুধু সুরক্ষার প্রয়োজনীয় একজন মানুষ নয়; সে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও প্রত্যেক নাগরিকের। সরকারকে আইন ও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং মানসম্মত জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়কে হতে হবে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। গণমাধ্যমকে শিশুকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তার মর্যাদা, গোপনীয়তা ও সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল জগতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ইন্টারনেট শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, প্রতারণা, হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। তাই শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের শিশুদের বিষয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যান একদিকে অগ্রগতির চিহ্ন দেখায়, অন্যদিকে স্পষ্ট করে যে কাজ এখনো অনেক বাকি। বাল্যবিবাহের হার কমেছে, কিন্তু এখনো প্রায় অর্ধেক তরুণীর বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়েছে। একই সময়ে শিশুশ্রমের হার বেড়েছে এবং ঘরে সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতা এখনো ব্যাপক। এই পরিসংখ্যানগুলোকে কেবল প্রতিবেদনের সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর জীবন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুস্থ, কতটা শিখছে এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে—তাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমাদের প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান, পরিবারের আয়, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে সীমাবদ্ধ হবে না। শিশুর অধিকার রক্ষা কোনো একক প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়—একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে রক্ষা করা।
কখনো কখনো একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না। সেটি আমাদের চারপাশের সমাজকে নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনে দেয়। কুমিল্লার ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের দায় যার, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে, হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়? নিরাপত্তা কি শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব? একজন মা তাঁর সন্তানকে যতই সতর্ক করুন, তিনি তো প্রতিটি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। একজন বাবা সন্তানকে বিপদ চিনতে শেখাতে পারেন, কিন্তু সন্তানের চারপাশের প্রত্যেক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। শিশু যখন বাড়ির বাইরে যায়, তখন তার নিরাপত্তার একটি অংশ অদৃশ্যভাবে নির্ভর করে সেই সমাজের ওপর, যার মধ্য দিয়ে সে চলাচল করে। পাশের দোকানদার তাকে চেনেন কি না। প্রতিবেশী তাকে দেখলে খেয়াল করেন কি না।স্কুলের শিক্ষক জানেন কি না সে কার সঙ্গে মিশছে। স্থানীয় মানুষজন কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে সেটি গুরুত্ব দেন কি না। অর্থাৎ একটি শিশুর চারপাশে নিরাপত্তার একটি সামাজিক বলয় থাকার কথা। প্রশ্ন হলো, সেই বলয় কি আগের মতো শক্ত আছে? শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে, ঝুঁকি সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির যুব সহিংসতা-বিষয়ক গবেষণা-ভিত্তিক কাঠামোতে ব্যক্তি, পরিবার, সম্পর্ক, স্কুল, কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সমাজ — সব স্তরের ঝুঁকি ও সুরক্ষামূলক বিষয় বিবেচনা করা হয়। একই গবেষণায় দেখা যায়, পরিবার বা পরিবারের বাইরের দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারা এবং স্কুলে ইতিবাচক সম্পর্ক কিশোরদের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু নজরদারির বিষয় নয়। সংযোগও নিরাপত্তা। একটি শিশু যদি জানে, বিপদে পড়লে কার কাছে যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে এবং কে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, তাহলে তার চারপাশে একটি অদৃশ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি হয়। এই জায়গাটিই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। তবে আগের দিনের সমাজকে নিখুঁত করে দেখার কোনো কারণ নেই। তখনো অপরাধ ছিল, ঝুঁকি ছিল, শিশু নির্যাতন ছিল। তবু একটি বিষয় ছিল, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ একে অন্যকে চিনত। একটি শিশু কার সন্তান, কোন বাড়িতে থাকে, কোন স্কুলে পড়ে, এসব তথ্য অনেকের জানা থাকত। এখন শহুরে জীবনে আমরা একই ভবনে থাকি, কিন্তু একে অন্যকে চিনি না। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে জানি না। আমাদের সন্তানের সঙ্গে কারা মিশছে, সব সময় জানি না। আমাদের সন্তানের বন্ধুর বড় ভাই কে, সে কোথায় যায়, কী করে—এসবও অনেক সময় আমাদের অজানা থেকে যায়। এটি শুধু সামাজিক পরিবর্তন নয়; এটি নিরাপত্তার কাঠামোকেও বদলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার থেকে কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ পর্যন্ত একাধিক স্তরে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিশুর সুরক্ষা কোনো একক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের আরেকটি বিষয় ভাবায়, প্রথম দিকে ঘটনাটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তদন্তে অপ্রতিমের সঙ্গে তার চেয়ে বয়সে বড় কয়েকজনের যোগাযোগ, কথিত বন্ধুত্বের বিষয়ও সামনে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে। তদন্তকারীরা এ সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এ তথ্যগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শিশুর নিরাপত্তা শুধু অপরিচিত মানুষ থেকে তাকে দূরে রাখার বিষয় নয়। আমাদের পরিচিত মানুষদের সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কার কথায় কোথাও যাচ্ছে, কে তাকে প্রভাবিত করছে—এসব নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে এমন সম্পর্ক থাকা দরকার, যেখানে শিশু ভয় না পেয়ে সত্যি কথা বলতে পারে। কারণ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কখনো কখনো শিশুকে আরও গোপনীয় করে তুলতে পারে। নিরাপত্তার জন্য তাই শুধু নজরদারি নয়, প্রয়োজন বিশ্বাসের সম্পর্ক। একটি শিশুকে রক্ষা করার জন্য আমাদের হয়তো আরও বেশি সিসিটিভি দরকার, আরও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা দরকার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার মানুষ। এমন শিক্ষক, যিনি বুঝতে পারবেন কোনো শিশু হঠাৎ বদলে গেছে। এমন বাবা-মা, যাঁদের সঙ্গে সন্তান নিজের অস্বস্তির কথা বলতে পারে। এমন প্রতিবেশী, যিনি কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে ‘এটা আমার বিষয় নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। এমন কমিউনিটি, যেখানে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে মানুষ প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবে না; এবং এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে একটি শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ, নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা তৈরি হয় সম্পর্ক দিয়ে। অপ্রতিমের মৃত্যুর পর হয়তো অনেক বাবা-মা সন্তানকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করবেন। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যাবে, কখন ফিরবে—সবকিছু আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করবেন। তাঁদের ভয়কে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমরা যদি প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর শিশুদের স্বাধীনতা কমিয়ে দিই, অথচ সমাজের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন না তুলি, তাহলে আমরা সমস্যার বোঝা শিশুর ওপরই চাপিয়ে দিই। একটি শিশু কেন স্বাধীনভাবে বাইরে যেতে পারবে না? কেন তাকে সব সময় ভয় নিয়ে চলতে হবে? কেন নিরাপদ থাকার জন্য তার পৃথিবী ছোট করতে হবে? বরং আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি না, যেখানে একটি শিশু স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠবে এবং একই সঙ্গে তার চারপাশে থাকবে দায়িত্বশীল মানুষের একটি নিরাপত্তার বলয়? অপ্রতিমকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। তার পরিবার যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, সেটিও কোনো বিচার পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যদি আমরা শুধু অপরাধীর শাস্তি দাবি করে থেমে যাই, তাহলে একটি বড় সুযোগ হারাব। আমাদের দেখতে হবে কোথায় কোথায় সামাজিক সংযোগ দুর্বল হচ্ছে। কোথায় শিশুরা বড়দের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কোথায় কমিউনিটি একে অন্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে। কোথায় আমরা নিরাপত্তাকে শুধু ক্যামেরা, তালা আর পাহারার মধ্যে সীমাবদ্ধ করছি। কারণ, একটি শিশুর নিরাপত্তার প্রথম প্রাচীর সব সময় দেয়াল নয়। কখনো সেটি একজন মা। কখনো একজন শিক্ষক। কখনো একজন প্রতিবেশী। কখনো একজন বন্ধু। কখনো এমন একজন অপরিচিত মানুষ, যিনি বিপদ দেখে এগিয়ে আসেন। অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে না; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোরও হিসাব চায়। আমরা কি এখনো এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে পথে একটি শিশুকে দেখলে তাকে শুধু ‘অন্যের সন্তান’ বলে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে নিজের সন্তানের মতো নিরাপদে বাড়ি ফেরার দায়িত্বটুকু অনুভব করি? নাকি পাশাপাশি বসবাস করতে করতে আমরা এতটাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি যে, একটি শিশুকে ঘিরে আজও অনেক মানুষ থাকে, অথচ তাকে আগলে রাখার মতো একটি সামাজিক নিরাপত্তার বলয় থাকে না? অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। তবে একই সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক নিরাপত্তার বলয়টিকেও পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ, একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা কেবল তার ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ, যেখানে একটি শিশুর নিরাপত্তা তার পরিবারের একার দায়িত্ব না হয়ে আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে।