Breaking news
উপসম্পাদকীয়

কাজের ঘণ্টা নয়, উৎপাদনশীলতাই হোক জাতীয় সমৃদ্ধির মাপকাঠি

জেমস আব্দুর রহিম রানা
জেমস আব্দুর রহিম রানা সাংবাদিক ও কলামিস্ট, মণিরামপুর, যশোর
আগস্ট ১৮, ২০২৬ • 0

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উন্নয়নের গুণগত মান নিশ্চিত করা। একটি দেশ কত দ্রুত এগিয়ে যাবে, কতটা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং কতটা টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করবে, তা নির্ভর করে তার উৎপাদনশীলতার ওপর। অর্থাৎ একটি সমাজ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তার সময়, শ্রম, পুঁজি ও সম্পদ ব্যবহার করে কতটা কার্যকর ফলাফল অর্জন করতে পারছে, সেটিই উন্নয়নের প্রকৃত সূচক।

 

আমাদের সমাজে কর্মমূল্যায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি মানসিকতা রয়েছে। আমরা প্রায়ই কোনো ব্যক্তির অবদানকে তার কর্মঘণ্টা, চাকরির মেয়াদ, পদমর্যাদা বা প্রতিষ্ঠানে কাটানো সময়ের ভিত্তিতে বিচার করি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই ধারণা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ, উন্নয়ন নির্ভর করে না কে কত সময় ব্যয় করেছে তার ওপর; বরং নির্ভর করে সেই সময়ে কে কতটা ফলপ্রসূ অবদান রাখতে পেরেছে তার ওপর।

 

মানবসভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে জাতিগুলো উৎপাদনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছে, তারাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে যেসব সমাজ কর্মের চেয়ে আনুষ্ঠানিকতা, ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বের চেয়ে সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, তারা দীর্ঘ মেয়াদে পিছিয়ে পড়েছে।

 

ধর্মীয় সাহিত্যেও কর্মের ফলপ্রসূতার গুরুত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাইবেলের মথি রচিত সুসমাচারের ২০ অধ্যায়ে দ্রাক্ষাক্ষেত্রের শ্রমিকদের একটি দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। সেখানে দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজে যোগদানকারী শ্রমিকদের সমান পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। এই দৃষ্টান্তের ধর্মীয় ব্যাখ্যা যেমন রয়েছে, তেমনি এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা নিহিত আছে—মানুষকে কেবল সময়ের পরিমাপে নয়, অবদান ও ফলাফলের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।

 

আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উৎপাদনশীলতার ঘাটতি। আমরা অনেক সময় ব্যয় করি, অনেক পরিকল্পনা করি, অসংখ্য সভা-সেমিনার করি, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল সব সময় অর্জন করতে পারি না। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। ফলে সময় ও সম্পদের অপচয় ঘটে।

 

একটি উন্নয়ন প্রকল্প যদি তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকে, কিন্তু সাত বছর লেগে যায়, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না; জনগণও দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। একইভাবে একটি সরকারি সেবা যদি কয়েক ঘণ্টায় দেয়া সম্ভব হয়, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতার দুর্বলতারই প্রতিফলন।

 

উৎপাদনশীলতার প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতি বা প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, সামাজিক উন্নয়ন এবং এমনকি ধর্মীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

 

শিক্ষা খাতের কথাই ধরা যাক। আমাদের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে, অসংখ্য পরীক্ষা দেয়। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর বাস্তব দক্ষতার ঘাটতিতে ভোগে। কারণ, শিক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ এখনো মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ আধুনিক বিশ্বে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল সনদ প্রদান নয়, দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি করা।

 

স্বাস্থ্য খাতেও উৎপাদনশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর মূল্যায়ন শুধু কর্মঘণ্টার ভিত্তিতে নয়; বরং তিনি কতটা কার্যকর ও মানবিক সেবা প্রদান করছেন, সেটির ভিত্তিতে হওয়া উচিত। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীই একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি। তাই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সরাসরি জাতীয় উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

কৃষি খাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কৃষিকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে হবে। একই জমিতে বেশি উৎপাদন, উন্নত বীজের ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—এসবই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপায়। কৃষকের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

 

শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প। যে দেশ প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনে এগিয়ে যাবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেতৃত্বও তার হাতেই থাকবে।

 

বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে রয়েছে। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার শক্তিতে। দক্ষিণ কোরিয়া কয়েক দশকের মধ্যে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি ও শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুর সীমিত ভৌগোলিক পরিসর ও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব সত্ত্বেও সুশাসন, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

 

ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও দেশটি উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্কৃতির ওপর জোর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের সাফল্যের পেছনে অন্যতম শক্তি হলো কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উৎপাদনমুখী মানসিকতা।

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। এই জনশক্তিকে যদি দক্ষ, উদ্ভাবনী ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু যদি এই জনশক্তি বেকার, অদক্ষ বা কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

 

সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতার ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। কোনো ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে কত বছর কাটিয়েছেন, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। তিনি কতজনকে জ্ঞান, নৈতিকতা, সুস্বাস্থ্য, শান্তি, মানবিকতা এবং আত্মনির্ভরতার পথে পরিচালিত করেছেন। কারণ, প্রকৃত সাফল্য সময়ের দৈর্ঘ্যে নয়, প্রভাবের গভীরতায় পরিমাপ করা হয়।

 

আমাদের জাতীয় জীবনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অজুহাতের সংস্কৃতি। আমরা প্রায়ই সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু সমাধান বাস্তবায়নে ততটা আগ্রহী নই। উন্নত দেশগুলোও নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে—যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা সম্পদের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু তারা সমস্যাকে অজুহাতে পরিণত না করে সমাধানের সুযোগে রূপান্তর করেছে। এ কারণেই তারা এগিয়ে গেছে।

 

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে প্রতিযোগিতা মূলত উৎপাদনশীলতার প্রতিযোগিতা। এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো দক্ষ মানবসম্পদ। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জ্ঞান। সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো উদ্ভাবন। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করা।

 

বাংলাদেশ যদি আগামী কয়েক দশকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় উৎপাদনশীলতাকে শীর্ষে স্থান দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে যুগোপযোগী করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কর্মঘণ্টার চেয়ে কাজের ফলাফল বেশি মূল্য পাবে।

 

জাতীয় সমৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফল নয়; এটি একটি মানসিকতা, একটি কর্মসংস্কৃতি এবং একটি সামাজিক অঙ্গীকারের ফল। সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রে থাকতে হবে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, জবাবদিহি ও ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন।

 

আজ সময় এসেছে নতুনভাবে ভাবার। আমরা কতক্ষণ কাজ করেছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কী অর্জন করেছি। আমরা কত বছর কোন পদে ছিলাম, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সময়ে আমরা কী পরিবর্তন এনেছি। আমরা কত পরিকল্পনা করেছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি।

 

যে জাতি এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার উন্নয়নকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না। আর তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা কত সময় ব্যয় করেছি, তা নয়; বরং আমরা কতটা উৎপাদনশীল হতে পেরেছি।

 

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
ছাদবাগান : গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিস্তারের উপায়

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করে। কিন্তু নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমির সংকটও বাড়ছে।   বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১.৬৬ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করে। ফলে সীমিত জায়গার মধ্যে খাদ্য উৎপাদনের নতুন উপায় খুঁজে বের করা প্রয়োজন।   এই অবস্থায় ছাদবাগান হতে পারে একটি কার্যকর উদ্যোগ। বাড়ির ছাদ কিংবা আশপাশের সামান্য খালি জায়গাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করা সম্ভব। অল্প জায়গাতেও টব, ড্রাম বা জিও ব্যাগে লালশাক, পুঁইশাক, করলা, পেঁপে, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা যায়। নিজের বাগানে উৎপাদনের ক্ষেত্রে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হওয়ায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে পরিবারের জন্য তাজা ও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ শাকসবজি পাওয়ার পাশাপাশি বাজারনির্ভরতা কিছুটা কমানো যায়।   ছাদবাগান এখন শুধু শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে নগর কৃষির একটি অংশ হয়ে উঠছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উদ্যোগেও নগর কৃষিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে অনেকেই ছাদবাগানকে কেন্দ্র করে চারা, কলম, ফল ও সবজি উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে আয় করছেন। ফলে ছাদবাগান একদিকে যেমন পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণে সহায়তা করছে, অন্যদিকে কিছু মানুষের জন্য আয়ের নতুন সুযোগও তৈরি করছে।   ছাদবাগানে এখন প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণের ব্যবহারও বাড়ছে। জিও ব্যাগ মাটির ভারী টবের তুলনায় হালকা হওয়ায় ছাদবাগানে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যবহার করে ছাদে পানি জমে থাকা ও আর্দ্রতাজনিত সমস্যা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও বাগানপ্রেমী আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সীমিত জায়গায় অধিক উৎপাদনের চেষ্টা করছেন। ‘শেকড় প্রযুক্তি’ নামের একটি নতুন পদ্ধতিও ছাদবাগানপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনায় এসেছে, যা উদ্ভিদের শেকড়ের ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রচার করা হচ্ছে।   ছাদবাগানে এখন শুধু সাধারণ শাকসবজি নয়, ড্রাগন ফল, থাই পেয়ারা, মাল্টা, বারোমাসি আম, ডালিমসহ বিভিন্ন ফলের গাছ চাষের উদাহরণও দেখা যায়। পাশাপাশি টমেটো, ক্যাপসিকাম, করলা, লাউসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে একটি পরিবারের খাদ্যতালিকায় তাজা শাকসবজি ও ফল যুক্ত করার সুযোগ বাড়ছে।   ছাদবাগানের গুরুত্ব শুধু খাদ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রমবর্ধমান কংক্রিটের শহরে ছাদে গাছপালা থাকলে বাড়ির পরিবেশ সবুজ ও সুন্দর হয়। গাছপালা ছাদকে তুলনামূলকভাবে শীতল রাখতে সহায়তা করতে পারে এবং নগরের সবুজায়নেও ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে গাছের পরিচর্যা মানুষের অবসর সময়কে আনন্দময় করে এবং মানসিক প্রশান্তিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।   তবে ছাদবাগানের বিস্তার ঘটাতে হলে প্রথমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ তৈরি করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ছাদবাগান বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কীভাবে কম জায়গায় সহজ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা যায়, কীভাবে নিরাপদ সার ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা করা যায় এবং কীভাবে ছাদের পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা যায়—এসব বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কম দামে বীজ, চারা, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হলে সাধারণ মানুষ আরও উৎসাহিত হবে।   পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে পরিকল্পিতভাবে বাগান করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিতে পারে। সফল ছাদবাগানিদের পুরস্কার ও স্বীকৃতি দেয়া এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফল উদ্যোগগুলো তুলে ধরাও মানুষের আগ্রহ বাড়াতে পারে।   নিরাপদ খাদ্য, পারিবারিক সাশ্রয়, নগর সবুজায়ন এবং সুন্দর জীবনযাপনের জন্য ছাদবাগানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তাই ছাদবাগানকে শুধু শখ হিসেবে না দেখে নগর কৃষির একটি কার্যকর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাড়ির সামান্য খালি ছাদকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন পরিবারের জন্য তাজা খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনি শহরের সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখা যায়। এখন প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করা।  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি : ৫৬ বছরের পথচলা ও আগামীর প্রত্যয়

গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া এবং আমাদের বাস্তবতা

‎‎নৈতিকতা, মানবতা ও শান্তির অনন্য আদর্শ‎ মহানবি (সা.)

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকারত্ব সংকট : পরিবর্তনের এখনই সময়

​আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন অনতিবিলম্বে প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আমরা একসময় গভীর সাগরের অতলে হারিয়ে যাব। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যেন কেবল গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার, যার সাথে বাস্তব জীবনের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।   ​আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয় কে প্লেন বানিয়েছে, কে গাড়ি তৈরি করেছে কিংবা কে কম্পিউটার আবিষ্কার করেছে—তাদের জীবনবৃত্তান্ত। অথচ এ তথ্যগুলো আমাদের বাস্তবিক জীবনে খুব একটা কাজে লাগে না। এর পরিবর্তে আমাদের শেখানো উচিত ছিল—কীভাবে একটি প্লেন তৈরি হয়, কীভাবে তা চালাতে হয় কিংবা কীভাবে গাড়ি বা কম্পিউটার তৈরি বা পরিচালনা করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রযুক্তির এ যুগে সেগুলোর আপডেট সংস্করণ বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কীভাবে করা সম্ভব, সেই কৌশলগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। যে শিক্ষা আমাদের জীবনের গতিধারা বাড়াতে সাহায্য করে না এবং প্রাত্যহিক জীবনে যার কোনো উপযোগিতা নেই, তা পড়িয়ে লাভ কী?   ​আমাদের প্রচলিত শিক্ষার অন্যতম বড় একটি ত্রুটি হলো, এটি পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীদের কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা বা সাপোর্ট দিতে পারে না। দীর্ঘ ২৭-২৮ বছর পড়াশোনা শেষ করে যখন একজন তরুণ সমাজের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন সে নিজেকে সমাজের কাছে বোঝা ছাড়া আর কিছু মনে করে না। চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে গেলেই সবার আগে দুই থেকে তিন বছরের পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। প্রশ্ন জাগে, ২৭-২৮ বছর ধরে পড়াশোনা করে যদি অভিজ্ঞতা অর্জনই না হলো, তবে এ শিক্ষার সার্থকতা কোথায়?   ​শিক্ষাজীবন শেষে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ থাকে মাত্র দুই থেকে তিন বছর। এই সীমিত সময়ে একবুক আশা নিয়ে বসে থাকার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত চাকরি মেলে না, তখন যুবকের পুরো জীবনটাই বরবাদ হয়ে যায়। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যদি এমন কিছু যুক্ত থাকত, যা দিয়ে চাকরি ছাড়াও জীবনযাপন করা সম্ভব হতো, কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি যদি কোনো নির্দিষ্ট কাজের ওপর দু-তিন বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকত, তবে পড়ালেখা শেষ করেই তরুণরা অনায়াসে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারত।   ​তাই কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন একজন শিক্ষার্থী অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে এবং চাকরির পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে নিজেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। শুধু তা-ই নয়, লেখাপড়া শেষ করে একজন শিক্ষার্থী যেন নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আরও দু-চারজন বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, সেই মানসিকতা ও দক্ষতাও তার মধ্যে তৈরি করতে হবে।   ​এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা শর্তে ও বিনা জামানতে মাইক্রোলোন বা সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই যদি আমরা নীতি ও কাঠামো পরিবর্তন করে সামনে এগোতে পারি, তবে দেশ ও দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে।   ​বেকারত্ব ও হতাশা কমার সাথে সাথে সমাজ থেকে অনেক বড় বড় অপরাধ দূর হয়ে যাবে। কারণ, এই বেকার যুবকেরাই একসময় চরম হতাশায় পড়ে মাদকের অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। পরবর্তী সময়ে মাদকের অর্থ সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি মাদকাসক্ত হয়ে মাতাল অবস্থায় খুন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধগুলোও তাদের দ্বারাই সংঘটিত হয়।   ​দেশের বেকারত্ব যত দ্রুত দূর হবে, দেশ ততই অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। সমাজ থেকে অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যা তখন শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। তাই রাষ্ট্র ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এখনই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

প্রবীণ দিবসে প্রবীণের ভাবনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই : উপকূলের বাঁচা-মরার প্রশ্ন

ডেঙ্গু : মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নাকি আমাদের উদাসীনতার বিরুদ্ধে

‎শিশু নিখোঁজ ও হত্যা শুধুই সংখ্যা নয়, একটি অশনিসংকেত

‎মানবাধিকার বলতে বোঝানো হয় সেই সব অধিকারকে, যা একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়া ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস অনুযায়ী মানুষের ৩০টি অধিকারের ধারা আছে, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। যেমন : স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার, কাউকে নির্যাতন না করা, কাউকে পরাধীনতার মধ্যে রাখা যাবে না ইত্যাদি। ‎ ‎সমাজ গঠন হয় পরিবার নিয়ে। আর সেই পরিবারের সূচনা হয় শিশু থেকে। শিশু সামাজিকীকরণের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে পরিবার গড়ে তোলে এবং সমাজ, দেশ গঠনে অবদান রাখে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১৪ বছর পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৮৬ লাখের মতো শিশু ও কিশোর আছে। তারা কোনো না কোনোভাবে মানবাধিকার সংকটে ভুগছে। ‎ ‎সম্প্রতি  অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে সারা দেশের মানুষের বিবেক স্তব্ধ হওয়ার পাশাপাশি স্তব্ধ হয়েছে মানবাধিকার। কেন এত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, আর হত্যা বেড়ে চলছে? শিশু নিখোঁজ আর হত্যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, তা জানিয়ে দিচ্ছে শিশুরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।   ‎শিশুদের বিকাশ শুরু হয় ছোটবেলা থেকে। চারপাশের পরিবেশ তাদের প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কের বিকাশ হয় প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ হওয়ার আগেই তারা নিখোঁজ হচ্ছে এবং হত্যাও হচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ০ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত শিশু নিখোঁজ হয়েছে ৪৭৪টি এবং ১০ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত নিখোঁজ হয়েছে ১৫,২৪৩টি। বিভিন্ন তথ্য বলছে, নিখোঁজের পর হত্যাসহ নানা কারণে গত আট মাসে ১৫৫টির মৃত্যু হয়েছে। তাই বলা যেতে পারে, শিশু ও কিশোররা মানবাধিকারের চরম সংকটের মুখে পতিত হচ্ছে। ‎ ‎কেন এত নিখোঁজ আর হত্যা হচ্ছে এ প্রশ্ন জাগেনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম আছে। মূলত এর পেছনে নানা রকম কারণ রয়েছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এই তিনটি দিকের সংহতি না থাকায় এমন ঘটনাপ্রবাহ প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। ‎ রাষ্ট্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে শিশু নিখোঁজ ও হত্যাকাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা দুর্বল নীতিমালার কারণে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। আর তাই নীতিমালা প্রয়োজনে পরিবর্তন করে হলেও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। হত্যার সাথে জড়িতরা যদি কিশোর বয়সেরও হয়, সে ক্ষেত্রে অপরাধের নীতিমালা সংশোধন করা প্রয়োজন। কেননা তারা পূর্ণ বালক তথা ১৮ বছরের আগেই যদি হত্যার মতো কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে নাবালকদের শর্ত তারা ধারণ করে না। এভাবে কিশোর বয়স থেকে তাদের এ ঘটনাপ্রবাহ থেকে একপর্যায়ে বড় বড় অপরাধের সাথে যুক্ত হওয়ার দিকে ধাবিত হয়। মানবাধিকার তখনই নিশ্চিত হবে, যখন যেকোনো বয়সের অপরাধী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য একই নীতিমালার অধীনে আইনের প্রক্রিয়ায় আসবে। অতীতের তুলনায় বর্তমান সময় ও পরিবেশ বিবেচনায় নীতিমালার সংশোধন করা যেতে পারে। ‎ ‎আবার শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে হারানোর পরে ১ ঘণ্টাকে বলা হয় গোল্ডেন আওয়ার। এ সময়ের মধ্যে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়া হতে পারে অন্যতম একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা।   ‎সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় আর প্রতিকূল পরিবেশ শিশু নিখোঁজ ও হত্যার পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে।নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ কখনো এসব কাজে জড়িত হতে পারে না। এমনকি সমাজে যখন সন্ত্রাস, মানুষের মাঝে হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট ইত্যাদি থাকে, তখন এ ধরনের মানবাধিকারবিরোধী কাজে মানুষ জড়িয়ে পড়ার একটি আশঙ্কা তৈরি হয়।   পরিবারকে ধরা হয় প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালিত হতে হবে। সে ক্ষেত্রে পিতা-মাতাসহ সবাইকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সাধারণ যারা ৯ বছর পর্যন্ত শিশু রয়েছে, তাদের মধ্যে নানাবিধ কারণে নিখোঁজ হলেও নিজেদের পরিচয় সঠিকভাবে বলতে না পারার কারণে পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে না। তাই প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান থেকে শিশুরা প্রকৃত শিক্ষা পেলে অবশ্যই নিখোঁজসংক্রান্ত বিষয়টিকে সহজে সমাধান করা যেতে পারে। ‎ ‎তাহলে এই শিশু নিখোঁজ ও হত্যা রোধ করতে কার বেশি দায়িত্ব? পরিবার, সমাজ নাকি রাষ্ট্রের? প্রথমত রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালা কঠোর হলে শিশু হত্যার মতো ঘটনা কমে আসবে। নিখোঁজের ক্ষেত্রে যদি বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করে গোল্ডেন আওয়ারকে কাজে লাগাানো যায়, তাহলে নিখোঁজসংক্রান্ত সমস্যা সহজে সমাধান হবে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে নিখোঁজ ব্যক্তিকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে সব জায়গায় যদি এ-সংক্রান্ত পাঠ ও করণীয় বিষয়ে ধারণা দেয়া হয়, তাহলে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক ধারণা থেকে শিশু অবস্থাতেই সতর্ক থাকবে। সভা, সেমিনার, টিভিতে শিশু নিখোঁজসহ হত্যাবিষয়ক বিভিন্ন প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন করা যেতে পারে। অভিভাবকদের ধাপে ধাপে এ-সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ‎ এ ক্ষেত্রে সমাজেরও দায়িত্ব আছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মসজিদ, গির্জা, মন্দির ইত্যাদি জায়গাতে মানবাধিকার বিষয়ে সবাইকে জানাতে হবে। বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। ভালো কাজগুলোতে মানুষকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে নৈতিকতার প্রসার ঘটাতে হবে। কিন্তু সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। নিজেদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক আরও বেশি দৃঢ় করতে হবে।মানবাধিকারের সঠিক দিকগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে, শিশু অবস্থা থেকে সেসব ধারণা তৈরি করত হবে। ‎ আমি মনে করি, এ সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়িত্ব সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলেই কেবল এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব। ‎  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

বিশ্বব্যাপী কমছে সুপেয় পানি : আমরা কতটুকু প্রস্তুত

বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যে প্রজন্ম

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

ছাদবাগান : গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিস্তারের উপায়

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0