Breaking news
সাহিত্য

ভোরের সূর্য

আশরাফুল আলম
আশরাফুল আলম শিক্ষক ও শব্দচাষী, গাজীপুর
আগস্ট ২৮, ২০২৬ • 0

আঁধার রাতে চোরের থাবা

আলোর ঘরে পাপ

লুটপাট শেষে দিয়ে গেল কপাটে

কালো লোহার চাপ।

 

মুখোশ ঢাকা কটা মুখ

লোভের ভরা মন

আঁধারকে ভালোবাসে, করে

আলোর বিসর্জন।

 

দরজায় দিয়ে ভারী শেকল

থমকে দিয়ে পথ

ভাবছে বুঝি থামিয়ে দিল

জ্ঞানের জয়রথ।

 

দিনের আলোয় ভয় পাওয়া দল

রাতেই খোঁজে পার

তালা মেরে কি রোখা যায়

ভোরের সূর্যটার?



 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

সাহিত্য

View more
ভোরবেলার মায়াবিনী

নিদ্রাহীন রাতের ভার মাঝে মাঝেই আমাকে ভোরের নিঃশব্দ আহ্বানে টেনে নেয় লেকের পাড়ে। রাত জাগা ছিল আমার অবসর। তবু ভোরের নির্মল হাওয়া, গুরুজনদের বাচ্য, হাজার টাকার দাওয়া! লেকের ধারে নিঃশব্দ হেঁটে চলা, সেও তো আমার প্রাপ্য।   তন্দ্রা পেরিয়েও প্রত্যুষের শান্তি আমি কি একটু নিতে পারি না? উত্তর পেয়েছি, পারি। তাই চরণ ফেলি লেকের উদ্দেশে। আর সে, তাকে প্রথম দেখি এক ভোরে।   লেকের পাশে নির্জন রাস্তায় ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছিল। চোখে ঘুমের চিহ্ন ছিল না, আমার মতোই। তবে সে নিশাচর নয়। মনে হচ্ছিল না, সে নিয়মিত জাগরণে অভ্যস্ত একজন। তার চোখে আমি যা দেখছিলাম, তা ভয়, আকুতি, অভিজ্ঞতা।   আমি সচরাচর অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলি, বেশিই বলি। তবে যদি বন্ধুত্ব জন্ম নেয়, এটিই ব্যতিক্রম। কিন্তু নারীদের বেলায় সে ব্যতিক্রমও ব্যতিক্রমী, সামান্য বন্ধুত্বে যেটি সম্ভব নয়।   সেদিন কেন জানি মনে হয়েছিল, কিছু ভেঙেছে নিজের মাথার ওপর। নিদ্রাহীনতায় নয়, বোধে। তাই অজান্তেই কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রোজ হাঁটেন? সে মাথা নাড়াল। হ্যাঁ কি না, বুঝে উঠতে পারিনি। আমি যে সত্যিই বুঝিনি, সেটা সে বুঝতে পেরেছিল। একরাশ নীরবতা তার মুখাবয়বে। নীরবতা চিরে হঠাৎ বেরিয়ে এল একটি বাক্য, “ওরা আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল।”   সকালবেলার ধোঁয়াটে আলো আর নিঃশব্দ হাওয়ার ভেতর একটি মলিন মুখ উচ্চারণ করল এক অতলস্পর্শী বাক্য, যা মুহূর্তে নাড়িয়ে দিল আমার ভেতর। তখনই বুঝলাম, সে কেবল আর পাঁচজনের মতো নয়, সত্যিই অনন্য।   আমি কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। বললাম, কীসের থামিয়ে দেয়া? কে থামিয়ে দিল? কীভাবে থামিয়ে দিল? সে বলল, “অনিচ্ছাতে।”   আমি আইন পড়ি। তাই ‘অনিচ্ছা’ শব্দটি অন্তত বোধ হয় কিছুটা ভিন্নভাবে বুঝি। আইনের পরিভাষা নয়, বরং আমার ফিলোসফি এটিই বলে, যেখানে ইচ্ছা থাকে বাদিনীর, সেখানে অনিচ্ছা জন্ম দেয় প্রতিরোধের, প্রতিকারের দাবিতে।   যার চোখে আমি দেখছিলাম একরাশ ঘন অন্ধকার। যেন সে নিজের শরীর ছেড়ে বহুদূরের কোনো শূন্যতায় বাস করে। সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত সকালে এখানে! রাতের অন্ধকারের ভাব কাটেনি ঠিকমতো। আপনার ভয় করে না?   সে মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “ভয় নয়। আমার মনে হচ্ছে, আমি লজ্জা নিয়ে জন্মাইনি। তবু এই সমাজ আমাকে লজ্জা শিখিয়েছে, স্বাভাবিকভাবে নয়, ভিন্নতায়। আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।   কিছু বলার ছিল না, কিছু বোঝার ভাষা ছিল না। কিন্তু আমার চোখ যে তাকে সাহস দিচ্ছিল, সেটি সে বুঝেছে। সে বলতে থাকে, “কাল রাত নামছিল। আমি ফিরছিলাম। তিনজন... পরিচিত মুখ, চেনা হাসি, বিকৃত রসনা। তারপরের অংশ মনে রাখতে চাই না। আর তারা বলেছিল, কাউকে বলবি না। কেউ বিশ্বাস করবে না তোকে।”   আমি বুঝেছিলাম, সে শিকার হয়েছে। জানোয়াররা শিকার করে বেঁচে থাকার জন্য, আর মানুষ নামের জানোয়াররা শিকার করে কাউকে ভেঙে দেয়ার জন্য। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মায়াবিনী। অথচ সমাজের চোখে সে এখন আর ‘মানুষ’ নেই। শোনা মাত্র হয়ে যাবে এটি একটা ঘটনা, একটা খবর, একটা গল্প। সেই গল্পে আসবে মেয়েটির দোষ।   সে লজ্জা শেখেনি। ছেলেদের স্পৃহা কি স্বাভাবিক নয়? এই তো নিয়ম। যখন মেয়েটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল, চোখে, মুখে, মনে, ঠিক তখনই কয়েকজন ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে তাদের কৌতূহল, কথায় দায়িত্বের ছায়া, অথচ ভেতরে অন্য কিছু। এই জায়গায় কী করছেন? ওনাকে চিনেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?   প্রথমে মনে হলো, ওরা বুঝি সাহায্য করতে এসেছে। কিন্তু না। সাহায্যের আড়ালে ছিল স্পষ্ট এক হিসাব। তাদের চোখ বলছিল, “এই মেয়ের মুখ মলিনতার ভারে আচ্ছন্ন। ভালো সুযোগ। এখন কিছু দিলে আমরা পাই, নাহয় কিছু বানিয়ে বলি, ভয় দেখাই।”   এমনই হয় আজকাল। একটা মেয়ের মলিনতা শুকায়নি, আর কিছু মুখ হাসি লুকিয়ে ভাবছে, কীভাবে মুনাফা করা যায়?   কেউ মুনাফা তো চায়, কিন্তু শরীরের মুনাফা কোন হিসাব? যেটিও হয় মাঝেমধ্যে। আবার কেউ শুধু ক্ষমতার অনুভূতি নিয়ে বাঁচে, এমন অনুভূতি যে, পুরো আলোকশূন্য। এ এক অদ্ভুত সময়ের মুখোমুখি আমরা। যেখানে যুবসমাজের বড় একটি অংশ ক্ষমতা বলতে বোঝে ভয়কে পুঁজি করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। পাশে কেউ দুর্বল থাকলে হয়ে ওঠে ঠিক সুযোগের সমানুপাতিক সমীকরণ। আর কোনো মেয়ে একা থাকলে তাদের মানসিকতায় হঠাৎ বদল ঘটে। ভদ্র মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে হিংস্র চোখ, বিকৃত হাসি, আর বিকল বিবেক।   এ কেমন ক্ষমতা? যা সৃষ্টির নয়, বরং চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়ার। যা বাঁচাতে নয়, শাসাতে চায়। যেখানে প্রভাব মানেই আরেকজনকে ভয় পাইয়ে রাখা। সে ভালো হোক, মন্দ হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। দরকার কেবল একপাক্ষিক শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি।   এই প্রজন্মের একাংশ যেন ভুলে যেতে বসেছে, মানুষের মাঝে শ্রদ্ধা জন্মায় সমবেদনায়, শোষণে নয়। তবু তারা চায়, তাদের কালোতে অন্যরা অন্ধ থাকুক, আলোতে নয়। এই ছেলেরাই একসময় রূপ নেয় সম্মতিহীনতার শিকারি হিসেবে।   শুরুটা হয় নীরব চাহনিতে, অনুমতির অনুপস্থিতি উপেক্ষা করে এগিয়ে যায় স্পর্শে। তারপর ধীরে ধীরে তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে অসম্মতির খেলায়। কখনো মুখোশ পরে আসে সহানুভূতির নামে। আসে ‘ভ্রাতৃত্ব’ হয়ে, তার পরই খোঁজে ফাঁকফোকর, একটি মুহূর্ত, যেখানে মেয়ে একা, প্রতিবাদ দুর্বল, অথবা সমাজ নীরব।   এই আলোকবর্জিত প্রাণীরা দূর কোনো অরণ্যের নেকড়ে নয়। তারা আমাদের চেনা ভিড়েই মিশে থাকে। মানুষের আড়ালে, চায়ের কাপে কিংবা ঠোঁট ছোঁয়ায়।   এসব ভাবছি, আর মেয়েটির মুখের দিকে তাকাচ্ছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ আমার মনের সঙ্গে কথা বলছে। যেন বলছে, সে বিচার চায় না, সে বদল চায়। কামনার দস্যুদের শাস্তি হোক, হোক আইনরক্ষার কঠোর প্রয়োগ। তবু তা যথেষ্ট নয়, যদি এই সমাজের মনোবৃত্তিই অপরিবর্তিত থাকে।   তার চোখে আমি খুঁজে পাইনি প্রতিশোধের আগুন। বরং ছিল এক ক্লান্ত যন্ত্রণার রেশ। যা আত্মচিৎকার করে বলছে, ‘বিচার নয়, আগে বদলাও মানুষগুলোকে। কারণ ধ্বংসের আগেও জন্ম নেয় অপচেতনা।’   আমি বুঝলাম, এই অপরাধের গোড়ায় কেবল একেকজন ধর্ষক নয়, আছে একটি প্রজন্ম, যা শেখেনি সম্মতি, শিখেছে শুধু দখল। যাদের নৈতিকতা তৈরি হয়ে ওঠেনি ভালোবাসায়, বরং গেঁথে গেছে ক্ষমতার বিকৃত বোধে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বিচার আদালতের বিষয়। কিন্তু পরিবর্তন? তা আমাদের ঘরে। যার জন্ম রক্তে, শিক্ষায়, নৈতিকতায়।  

অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0

সাহিত্য আছে, কিন্তু মানুষ কতটা আছে

একবিংশ শতাব্দীর প্রুফ্রক

বিচার

অ্যান কারসন, ছবি : দ্য ইকোনমিস্টের সৌজন্যে
২০২৬ নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের সাহিত্য : পুরাণ, আকাঙ্ক্ষা, ভাষা ও অর্থের অন্তর্গত যাত্রা

অ্যান কারসনকে শুধু কবি বললে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি অংশই ধরা পড়ে। তিনি একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং পরীক্ষামূলক লেখক। তাঁর সাহিত্য এমন এক সীমানাহীন পরিসর তৈরি করে যেখানে কবিতা, গদ্য, পুরাণ, দর্শন, অনুবাদ, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং একাডেমিক গবেষণা পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে কারসনের রচনাকে বুঝতে হলে কেবল ‘তিনি কী বলতে চেয়েছেন’ এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হয় তিনি কীভাবে অর্থ তৈরি করেন, কীভাবে অর্থকে ভেঙে দেন এবং কীভাবে পাঠককে অর্থের নির্মাণপ্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে যান।   ৮ অক্টোবর ২০২৬-এ সুইডিশ একাডেমি তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার ঘোষণা করে। পুরস্কারের সরকারি ব্যাখ্যায় তাঁর ‘সাহসী ও অভিনব সাহিত্যকর্মের’ কথা বলা হয়েছে—যে সৃষ্টিকর্ম ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে এক সৃজনশীল ও খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ নির্মাণ করেছে।   কারসনের সাহিত্যজগতের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—দূরত্ব। মানুষ যা চায়, তার সঙ্গে মানুষের একটি দূরত্ব থাকে; যে মানুষকে আমরা ভালোবাসি, সে সম্পূর্ণভাবে আমাদের অধিকারভুক্ত নয়; যে অতীতকে আমরা বুঝতে চাই, তা আমাদের কাছে কেবল ভগ্নাংশের মাধ্যমে উপস্থিত; আর যে শব্দের অর্থ আমরা ধরতে চাই, সেই অর্থও প্রসঙ্গ বদলালে পরিবর্তিত হয়। এই দূরত্বই কারসনের সাহিত্যকে চালিত করে।   ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ : আকাঙ্ক্ষার ভেতরে দূরত্ব কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’-এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার প্রশ্ন। কিন্তু এটি প্রচলিত প্রেমের কবিতা নয়; বরং প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, বিশেষত স্যাফো এবং অন্যান্য ধ্রুপদি লেখার আলোকে আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি নিয়ে একটি গভীর অনুসন্ধান।   কারসনের একটি মৌলিক উপলব্ধি হলো, আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ উপস্থিতির মধ্যে জন্মায় না; আকাঙ্ক্ষার জন্য প্রয়োজন দূরত্ব। আমি যে মানুষটিকে চাই, সে আমার থেকে পৃথক। এই পৃথকতাই আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। যদি প্রিয় মানুষটি সম্পূর্ণভাবে আমার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে আকাঙ্ক্ষার সেই টান আর থাকে না।   এ ধারণা কেবল প্রেমের ক্ষেত্রে নয়, ভাষা ও অর্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি শব্দ তার অর্থের সঙ্গে কখনো সম্পূর্ণ এক হয়ে যায় না। শব্দ ও অর্থের মধ্যে একটি ব্যবধান থাকে। পাঠক সেই ব্যবধান অতিক্রম করতে চান, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করতে পারেন না। এখানেই কারসনের সাহিত্য ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক হয়ে ওঠে। প্রেমে যেমন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় দূরত্ব থেকে, ভাষাতেও অর্থের অনুসন্ধান তৈরি হয় শব্দ ও অর্থের মধ্যবর্তী দূরত্ব থেকে।   ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ : পুরাণের পুনর্জন্ম ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ কারসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। প্রাচীন গ্রিক কবি স্তেসিকোরাসের গেরিয়ন-পুরাণকে তিনি আধুনিক সময়ে পুনর্লিখেছেন। এখানে গেরিয়ন আর শুধু পুরাণের দানব নয়। সে একজন তরুণ, একজন প্রেমিক, একজন শিল্পীসুলভ মানুষ—যে নিজের শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও পরিচয়ের সঙ্গে লড়াই করে।   কারসনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টিশীল কৌশল হলো তিনি পুরাণকে পুনর্নির্মাণ করেন, কিন্তু পুরাণের মূল কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করেন না। ফলে পুরোনো ও নতুন দুটি পাঠ একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। এখানে আন্তঃপাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এক অর্থে নিজের পরিচয় আবিষ্কারের কাহিনি; অন্য অর্থে এটি অন্যের চোখে নিজের পরিচয় কীভাবে নির্মিত হয়, তার কাহিনি।   ‘দ্য গ্লাস এসে’ : ব্যক্তিগত শোক ও সাহিত্যপাঠ ‘দ্য গ্লাস এসে’-তে কারসনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং এমিলি ব্রন্টির ‘ওয়াদারিং হাইটস’ একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। এখানে একটি অসাধারণ সাহিত্যিক প্রক্রিয়া কাজ করে। একজন নারী নিজের ব্যর্থ প্রেমের দিকে তাকাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি ব্রন্টির উপন্যাস পড়ছেন। ফলে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সাহিত্যের অভিজ্ঞতা আলাদা থাকে না। তিনি যেন অন্য একটি বইয়ের ভেতর নিজের জীবনকে দেখতে পান। এখানে সাহিত্য হয়ে ওঠে একধরনের আয়না। কিন্তু আয়নাটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি দেয় না। বরং প্রতিফলনের সঙ্গে পরিবর্তনও ঘটে। ব্রন্টির চরিত্রদের প্রেমকে পড়তে পড়তে কারসনের বক্তা নিজের প্রেমকে নতুনভাবে বুঝতে শেখেন। এ কারণে ‘দ্য গ্লাস এসে’ শুধু বিচ্ছেদের কবিতা নয়। এটি প্রশ্ন করে, আমরা কি নিজের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি জানতে পারি, নাকি অন্যের ভাষার মধ্য দিয়ে নিজেদের চিনতে হয়? প্রশ্নটি কারসনের সমগ্র সাহিত্যেই ফিরে আসে।   ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ : বিবাহ, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয় ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’-এ বিবাহ ও বিচ্ছেদকে কারসন একটি জটিল ভাষিক ও নৈতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখান। এখানে স্বামী শুধু একজন ব্যক্তি নয়; সে বক্তার আত্মপরিচয়েরও একটি অংশ। ফলে সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যায় না—একটি পরিচয়ও ভেঙে যায়।   এ গ্রন্থের আকারও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি একই সঙ্গে কবিতা, প্রবন্ধ, কাহিনি এবং নৃত্যের কাঠামো ব্যবহার করে। অর্থাৎ বিষয়বস্তুর বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে রচনার রূপের বিচ্ছিন্নতাও যুক্ত। এখানে কারসন দেখান যে ভাঙা সম্পর্ককে সব সময় একটি সরল, ধারাবাহিক কাহিনি দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। স্মৃতি যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে ফিরে আসে, তাঁর লেখার রূপও তেমন লাফিয়ে ওঠে।   ‘ডিক্রিয়েশন’ : ‘আমি’-কে ভেঙে দেয়া ‘ডিক্রিয়েশন’ কারসনের সবচেয়ে দার্শনিক গ্রন্থগুলোর একটি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘আমি’। সাধারণ আত্মজীবনী বলে, ‘আমি কে?’   কারসন তাঁর বিপরীতে প্রশ্ন করেন, ‘আমি-কে কি ভেঙে দেওয়া সম্ভব?’ এখানে সিমোন ভেইলের চিন্তার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিসত্তা সবকিছুকে নিজের চারপাশে সংগঠিত করতে চায়। কিন্তু অন্য মানুষকে সত্যিই উপলব্ধি করতে হলে কখনো কখনো নিজের কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সরে যেতে হয়।   কারসনের ‘ডিক্রিয়েশন’ তাই আত্মবিলোপের সরল ধারণা নয়। এটি বরং আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ও নান্দনিক অবস্থান। এ কারণেই তাঁর লেখায় ‘আমি’ কখনো স্থির নয়। ‘আমি’— একবার প্রেমিক একবার পাঠক একবার অনুবাদক একবার শোকাহত ব্যক্তি আবার একবার কেবল একটি কণ্ঠ।   ‘নক্স’ : স্মৃতির ভগ্নাংশ   ‘নক্স’ সম্ভবত কারসনের স্মৃতি ও শোকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশগুরোর একটি। ভাইয়ের মৃত্যু তাঁকে এ কাজের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এখানে শোককে সরাসরি ধারাবাহিক গল্প হিসেবে বলা হয় না। বরং থাকে—ছবি, নোট, অনুবাদ, খণ্ডিত বাক্য, স্মৃতি, নীরবতা। এই ভাঙা কাঠামোটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শোক নিজেই ভাঙা।   মৃত মানুষকে আমরা একটি সম্পূর্ণ গল্পের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারি না। আমাদের কাছে থাকে তাঁর কিছু ছবি, কিছু কথা, কিছু স্মৃতি, কিছু অনুপস্থিতি। অতএব ‘নক্স’-এর রূপ ও বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শোকের ভাষা খণ্ডিত—তাই শোকের বইও খণ্ডিত। কারসন এখানে দেখিয়ে দেন যে সাহিত্য শুধু বিষয়কে প্রকাশ করে না; কখনা কখনো বিষয়ের প্রকৃতি নিজেই সাহিত্যিক রূপকে নির্ধারণ করে।   ‘ফ্লোট’ : বইয়ের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে ‘ফ্লোট’-এ কারসন বইকে একটি সরল, ধারাবাহিক বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন না। বহু পৃথক ছোট রচনা একত্র হয়ে একটি গ্রন্থ তৈরি করে। এখানে পাঠের নির্দিষ্ট পথ নেই। ফলে পাঠককে লেখক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন না। পাঠক নিজেই একটি পথ তৈরি করেন। এটি আধুনিক পাঠতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—পাঠের অর্থ শুধু লেখকের ইচ্ছায় নির্ধারিত হয় না; পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণেও অর্থ তৈরি হয়। কারসনের বই তাই শুধু পড়ার বস্তু নয়; পাঠকের জন্য একটি অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র।   অনুবাদ : পুরনো ভাষার মধ্যে নতুন জীবন কারসনের সাহিত্য বোঝার জন্য তাঁর অনুবাদকে আলাদা করে দেখা যায় না। তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি ও নাট্যকারদের অনুবাদ করেছেন। কিন্তু তাঁর অনুবাদ নিছক শব্দের প্রতিস্থাপন নয়। একটি প্রাচীন শব্দের সঙ্গে তার সময়, সংস্কৃতি এবং আবেগ জড়িয়ে থাকে। সেই শব্দকে আধুনিক ভাষায় আনলে শুধু ভাষা বদলায় না—তার সাংস্কৃতিক অবস্থানও বদলে যায়। তাই অনুবাদ একটি পুনর্সৃষ্টি। এ কারণে কারসনের কাছে অনুবাদক ও কবির কাজের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দুজনই অন্য একটি ভাষা বা পাঠের সঙ্গে সংলাপ করেন।   রূপ ও অর্থ : কারসনের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা কারসনের সাহিত্য নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। রূপ কি অর্থের বাহন, নাকি রূপ নিজেই অর্থ তৈরি করে? কারসনের রচনায় দ্বিতীয় উত্তরটি বেশি কার্যকর। খণ্ডিত বাক্য কেবল খণ্ডিত বাক্য নয়—তা ভাঙনের অনুভূতি তৈরি করে। শূন্যস্থান কেবল ফাঁকা জায়গা নয়—তা অনুপস্থিতিকে দৃশ্যমান করে। অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়—তা দুই সময়ের দূরত্বকে প্রকাশ করে। পুরাণের পুনর্লিখন কেবল পুরোনো গল্পের নতুন সংস্করণ নয়—তা অতীত ও বর্তমানের সম্পর্ককে প্রশ্ন করে। অতএব কারসনের কাছে রূপ ও অর্থকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায় না। রূপ অর্থকে ধারণ করে না শুধু; রূপ অর্থের জন্ম দেয়। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়—অর্থ কখনো সম্পূর্ণ স্থির নয়। পরিচয় কখনো সম্পূর্ণ একক নয়। স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ নয়। অনুবাদ কখনো সম্পূর্ণ সমাপ্ত নয়। আর সাহিত্যও কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়। এ কারণেই অ্যান কারসনের সাহিত্যকে শুধু কবিতা হিসেবে পড়লে তার একটি অংশ বোঝা যায়। তাঁকে পড়তে হয় একই সঙ্গে কবি, অনুবাদক, ধ্রুপদি গবেষক, দার্শনিক চিন্তক এবং পরীক্ষামূলক লেখক হিসেবে।   কারসনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—তিনি আমাদের কোনো একটি অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করেন না। বরং তিনি আমাদের এমন একটি অবস্থায় নিয়ে যান, যেখানে আমরা নিজেরাই প্রশ্ন করতে বাধ্য হই : একটি শব্দের অর্থ কোথায় শেষ হয়? একটি স্মৃতি কোথায় শুরু হয়? একটি পুরাণ কখন বর্তমান হয়ে ওঠে? আর একটি ‘আমি’ কতটা সত্যিই ‘আমি’?   এ প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। আর সম্ভবত সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই অ্যান কারসনের সাহিত্যের সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য নিহিত।  

অক্টোবর ১৩, ২০২৬ 0

জাপানি সাহিত্যের ইতিহাস

একটি অভিযোগপত্র

সন্ধ্যার প্রান্তর

কাদামাটি

গ্রামে এক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। ছেলের বিয়ে। বিয়ে উপলক্ষে বাড়িকে যেমন সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল, ঠিক তেমনি সুন্দর দুধে আলতা গায়ের বরণ লাস্যময়ী এক বউ এনেছে। বাড়ির সবার নতুন বউকে নিয়ে মাতামাতি। শুধু কি বাড়ির লোক, আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকেই নতুন বউ দেখার জন্য এসেছে।   বউয়ের রূপ লাবণ্য নিয়ে তাদের প্রশংসার কোনো কমতি নেই। বাংলাদেশের চিরাচরিত সমাজব্যবস্থায় নতুন বউ নিয়ে মাতামাতি সব সময়ই হয়। নতুন বউয়ের জন্য নতুন পোশাক, নতুন জিনিসপত্র, এককথায় তার জন্য সবই স্পেশাল। সকাল বেলা নতুন বউকে নদীর ঘাট থেকে পানি আনতে বলা হয়েছে। দেয়া হয়েছে বাহারি রঙে রাঙানো মাটির কলস।   গ্রামের ছোট মাঠ পেরিয়ে ইছামতি নদী। নতুন বউ, দুধে আলতা গায়ের বরণ, মেহেদি রাঙা হাত, আলতা মাখা পা, তার রূপে প্রকৃতিও যেন নতুন সাজে সেজেছে। নদীর ঘাট থেকে নতুন বউ যখন কলসে পানি ভরছিল, তখন নদীর পানি ও নদীর মাটি যেন নতুন বউয়ের ছোয়ায় নিজেদের ধন্য মনে করে। একসময় ঘাটের কাদামাটি আফসোসের সুরে বলে, “হায় রে মাটির কলস। তুমিও মাটি আমিও মাটি, অথচ তোমার কী কপাল আর আমারই-বা কী কপাল! তখন মাটির কলস বলে— কপালের আবার কী দেখলে তুমি? কপাল নয়? তুমিও মাটি আমিও মাটি। অথচ তুমি আজ নতুন বউয়ের কোলে, আর আমি তার পায়ের তলে। ঠিকই বলেছ। আমার এটা কপাল। তবে এই কপাল এমনি হয়নি। এই কপালের গল্প যদি তুমি শোনো, তাহলে আর আফসোস করবে না। কী এমন গল্প, বলো দেখি! তুমি কি এমন কর্ম করেছ, যার জন্য আজ নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পারলে। তাহলে শোনো, আমিও একদিন তোমার মতোই নদীর ঘাটে পড়ে ছিলাম। কত লোক আসছে, পায়ে মাড়াইছে। আবার দুষ্টু ছেলেরা মনে চাইলে খাবলা দিয়ে উঠিয়ে ছুড়ে মারছে অন্যের দিকে। দুঃখ ও কষ্টের কোনো শেষ ছিল না। তো তুমি কী এমন কর্ম করলে যে সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে একেবারে নতুন বউয়ের কোলে উঠে গেলে! হ্যাঁ, সেই কথা বলছি শোনো। একদিন কুমারবাড়ির এক লোক এসে নদীর পাড় থেকে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল। নিয়ে চৈত্র মাসের রোদে ফেলে রাখল বেশ কিছুদিন। সূর্যের তাপে পুড়ে গায়ের রং সাদা হয়ে যায়। হঠাৎ একদিন কুমার বেটা একটা হামার নিয়ে এসে সেটা দিয়ে পেটাতে শুরু করে। হামারের আঘাতে শক্ত মাটি আমি পাউডারের মতো গুঁড়ো হয়ে যাই। তারপর তাতে পানি দিয়ে আটার খামিরের মতো করে মেশায়। মিশ্রণটা যখন অনেকটা নরম ও স্বচ্ছ হয়, তখন আমাকে মেশিনে দেয়া হয়। মেশিনের চাপ ও কুমারনীর হাতের কারুকাজে আমি একটা কলসের রূপ পাই। এ তো একটু কাজ, কয়টা হামারের আঘাত, এরপর একটু রোদের তাপ আর মেশিনের চাপ, তারপর নতুন বউয়ের কোল। না ভাই, আরও আছে, একটু ভালো করে শোনো। এরপর আমাকে আবার রোদে শুকাতে দেয়া হয়। রোদের তাপে পুড়ে আবার সাদা হয়ে গেলাম। তারপর একদিন কুমার বেটা এসে সেখান থেকে নিয়ে আগুনে পোড়াতে দিল। আগুনে পুড়তে পুড়তে প্রথমে কালো, এরপর কালো থেকে লাল হলাম। লাল হওয়ার পর আগুন নেভানো হলো। আগুন নেভালে যখন ঠান্ডা হলাম, তখন কুমার বেটি এসে থাপড়ে থাপড়ে দেখে কোথাও ভাঙা না ফাটা আছে কি না। এ দফায় আমার সাথে থাকা অনেক কলস রোদ ও আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে বা ফেটে গেছে। তাদের ফেলে দেয়া হলো। আমি এ দফায় টিকে যাওয়ায় আমাকে রেখে দিল। কোনো এক হাটবারে কুমার বেটা আমাদের হাটে নিয়ে গেল বিক্রি করার জন্য। হাটে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপত্তিতে। কত লোক হাটে আসে হাঁড়ি-পাতিল কেনার জন্য! কেউ কেনে কেউ কেনে না। তবে যারাই আসে, থাপ্পড় মারে। থাপড়ে থাপড়ে দেখে কোথাও ফাটা আছে কি না। এখান থেকেও অনেককে ফেলে দেয়া হলো ভেঙে বা ফেটে যাওয়ার কারণে। আমি এ দফায়ও বেঁচে গেলাম।  আজ আমি যে নতুন বউয়ের কোলে, এরই কোনো এক আত্মীয় আমাকে কিনে আনে। বাড়ি এনে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে নতুন বউয়ের কোলে তুলে দেয়। আর হাজারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাজারও যাচাই-বাছাইয়ের পর আমি নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পেরেছি।   কলসের কথা শুনে ঘাটের কাদা বলে— আমি ভুল ভেবেছিলাম। তুমি তোমার কর্মগুণেই নতুন বউয়ের কোলে উঠতে পেরেছ। তোমার জন্য শুভকামনা।    আসলে আমরা প্রত্যেকেই কাদামাটির শরীর নিয়ে পৃথিবীতে আসি। হাজারও প্রতিকূলতা, হাজারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাজারও যাচাই-বাছাইয়ের পর যারা টিকে থাকে, তারাই সমাজের মাঝে আত্মমর্যাদা, সম্মান ও সমৃদ্ধি নিয়ে জীবন যাপন করতে পারি। আর যারা জীবনযুদ্ধে, বিভিন্ন প্রতিকূলতা, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তারা ভাঙা কলসের মতো অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে যায়। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত, জীবনের শুরুর সময়টা, ছাত্রজীবন বা যৌবনকালটা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে পরিবার, সমাজ ও দেশকে সুন্দরভাবে গড়তে অবদান রাখা।

অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0

লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতি

ন-নামা

আমি কে