Breaking news
উপসম্পাদকীয়

তথ্য অধিকার আছে, তথ্য পাওয়ার অধিকার কতটা কার্যকর

শফিকুল ইসলাম খোকন
শফিকুল ইসলাম খোকন সাংবাদিক, কলাম লেখক ও গবেষক পাথরঘাটা, বরগুনা
অক্টোবর ৫, ২০২৬ • 0

তথ্য শব্দের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। তথ্য বলতে কোনো ব্যক্তি, বিষয়, ঘটনা, প্রতিষ্ঠান বা বস্তুর সম্পর্কে পাওয়া জ্ঞান, বিবরণ, উপাত্ত বা সংবাদকে বোঝায়। সহজভাবে বললে, কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য যে তথ্য বা বিবরণ পাওয়া যায়, সেটিই তথ্য।

 

তথ্য শুধু কিছু কাগজপত্র, পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি নথির নাম নয়। তথ্য হলো নাগরিকের ক্ষমতা। একজন নাগরিক যখন জানতে পারেন তাঁর এলাকার রাস্তা নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, একটি প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হওয়ার কথা, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, কিংবা জনস্বার্থের কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছে—তখন তিনি শুধু একটি তথ্য জানছেন না; তিনি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইবার সক্ষমতা অর্জন করছেন।

 

এ কারণেই ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের গুরুত্ব এত বেশি। জাতিসংঘ ২০১৯ সালে ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘International Day for Universal Access to Information’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। UNESCO-ও তথ্যপ্রাপ্তিকে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নতুন নয়। ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার রয়েছে এবং অনুরোধের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে বাধ্য। একই আইনে সরকারি কর্তৃপক্ষকে তাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকের কাছে সহজলভ্য করার কথাও বলা হয়েছে। আইনের কাগজে-কলমে এই অধিকার যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাস্তবে নাগরিক কতটা সেই অধিকার ভোগ করতে পারছেন? জনগণও এ বিষয়ে কতটা জানে? তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন দপ্তরে যেতে হবে, কোন প্রক্রিয়ার তথ্য পেতে হবে, আদৌ কি জনগণ সেটা জানে?

 

তথ্য অধিকার আইনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো, নাগরিককে তথ্যের জন্য অনুগ্রহপ্রার্থী না রেখে অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক নাগরিক এখনো সরকারি অফিসে তথ্য চাইতে গেলে মনে করেন, তিনি যেন কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন। কোথায় আবেদন করতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে, কত দিনের মধ্যে তথ্য পাওয়ার কথা, তথ্য না পেলে কোথায় আপিল করতে হবে—এসব বিষয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা সীমিত। আইন অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার জন্য লিখিত, ইলেকট্রনিক বা ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। সাধারণ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেয়ার কথা; একাধিক ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট হলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবস্থা আছে। প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থাটি কি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে যথেষ্ট সহজ, পরিচিত ও কার্যকর হয়ে উঠেছে?

 

আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা কাজ করেছে—সরকারি তথ্য মানেই যেন অফিসের সম্পদ। নাগরিক চাইলে কিছু তথ্য দেয়া যাবে, না চাইলে দেয়া হবে না। তথ্য অধিকার আইন এ ধারণার জায়গায় একটি ভিন্ন দর্শন দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প এবং জনস্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখাই স্বাভাবিক নয়; বরং নির্দিষ্ট আইনগত ব্যতিক্রম ছাড়া তথ্য উন্মুক্ত রাখাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা।

 

আইনের ৬ ধারায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে—এমন ব্যবস্থা আইনটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুশাসনের জায়গায় এখানেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার : তথ্য চাওয়ার পর দেয়া নয়, প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই প্রকাশ করা।

 

এখানেও আইনে পথ দেখানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়া গেলে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আপিলের সুযোগ রয়েছে। এরপর প্রয়োজন হলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে। তথ্য কমিশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যও দেখায় যে তথ্য অধিকার নিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন, অভিযোগ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের একটি প্রতিবেদনে মোট ৩৬,২৭৭টি বিষয়ে নিষ্পত্তির তথ্য রয়েছে; সেখানে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য চাওয়া আইনটির আওতাভুক্ত নয়, কোথাও যথাযথ কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়নি, কোথাও আপিল করা হয়নি—এমন নানা কারণও উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তথ্য অধিকার এখন আর কেবল সেমিনার বা দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা নয়; নাগরিকরা বাস্তবেই এই আইনি কাঠামো ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায়, আইনটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে নাগরিকের জ্ঞান, সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

সমস্যাটি শুধু তথ্য না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তথ্যের অস্তিত্বই নাগরিকের কাছে অজানা। কোনো দপ্তরে কী তথ্য আছে, কে সেই তথ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কোন তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করার কথা—এসব পরিষ্কার না হলে তথ্য অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

আরেকটি বিষয় হলো তথ্যের ভাষা। কোনো সরকারি ওয়েবসাইটে শত শত পৃষ্ঠার নথি আপলোড করা হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি বুঝতেই না পারেন সেখানে কী আছে, তাহলে সেটিকে কার্যকর তথ্যপ্রকাশ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? তথ্য প্রকাশের সঙ্গে তাই তথ্যের ব্যবহারযোগ্যতা যুক্ত করতে হবে।

 

একটি প্রকল্পের বাজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা খরচ, কাজের অগ্রগতি কত, ঠিকাদার কে, কাজের মেয়াদ কত—এসব তথ্য যদি সহজ ভাষায়, নিয়মিত এবং অনুসন্ধানযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়, তখনই তথ্য জনগণের কাজে লাগে।

 

গত ২৮ সেপ্টেম্বর সভা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, সেমিনার হয়েছে, ব্যানার-ফেস্টুনে তথ্য অধিকারের কথা লেখা হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু দিবসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন সাধারণ নাগরিক কি কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই তথ্য চাইতে পারেন? তিনি কি জানেন, তথ্য না পেলে তাঁর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী? তিনি কি জানেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে? তিনি কি এমন তথ্য সহজেই অনলাইনে পান, যা তাঁকে আলাদা করে আবেদন করতে হয় না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তথ্য চাওয়ার কারণে তিনি কি নিজেকে হয়রানির শিকার বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি মনে করেন? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে, আমরা আইন কতটা পেয়েছি আর অধিকার কতটা পেয়েছি।

 

তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য তিনটি জায়গায় পরিবর্তন জরুরি—

প্রথমত, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ বাড়াতে হবে। জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট, ক্রয়, প্রকল্প, সিদ্ধান্ত, জনবল, সেবা ও ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত এবং সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা দরকার।

দ্বিতীয়ত, তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে হবে। একজন গ্রামের কৃষক, একজন শিক্ষার্থী, একজন সাংবাদিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক যেন তথ্য চাওয়ার জন্য জটিল প্রশাসনিক ভাষা বা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল না হন।

তৃতীয়ত, তথ্য দিতে অনীহার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। তথ্য গোপন করার প্রবণতা নয়, তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতিই হতে হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক আচরণ।

কারণ তথ্য অধিকার কোনো বিশেষ শ্রেণির অধিকার নয়। এটি সাংবাদিকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন কৃষকেরও প্রয়োজন; একজন গবেষকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন শিক্ষার্থী বা স্থানীয় নাগরিকেরও প্রয়োজন।

 

আন্তর্জাতিকভাবে ২০২৪ সালের তথ্য অধিকার দিবসের মূল আলোচনায়ও সরকারি খাতে তথ্য অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। UNESCO বলেছে, তথ্য অধিকারকে সরকারি সংস্থাগুলোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মধ্যে মূলধারায় নিয়ে আসাই বাস্তব অগ্রগতির অন্যতম লক্ষ্য।

 

পরিশেষে তথ্য অধিকার দিবসে তাই শুধু এ প্রশ্ন করলে হবে না—‘তথ্য অধিকার আছে কি?’ উত্তর আমরা জানি—আছে। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে, তথ্য কমিশন আছে, তথ্য চাওয়ার বিধান আছে, আপিল ও অভিযোগের ব্যবস্থাও আছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এই অধিকার কতটা সহজে, কতটা নির্ভয়ে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণকে তথ্য দেয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানো। কারণ অন্ধকারে গুজব জন্ম নেয়, সন্দেহ বাড়ে।

 

আলোয় আসে প্রশ্ন। আর প্রশ্নের উত্তরদায়ী রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তাই ২৮ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে জরুরি বার্তা হতে পারে একটাই, ‘তথ্য দেয়ার দরজা খোলা’ বললেই হবে না; সেই দরজা দিয়ে সাধারণ নাগরিক যেন সত্যিই ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন—সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
বিশ্ব শিক্ষক দিবস : দায়িত্ব, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই দিনটি মূলত সেই সত্যটিকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।   একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন চিকিৎসক মানুষের শরীর সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষকে, যে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য সব দায়িত্ব পালন করবে। তাই শিক্ষকের অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা বা পদমর্যাদার মাপকাঠিতে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না। মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর মূল্যায়ন, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ কম পাচ্ছে। মুখস্থনির্ভরতা, অতিরিক্ত গাইডনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা এবং ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে। ফলে শিক্ষাকে শুধু ভালো ফল অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।   শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলেন। তিনি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করেন, সম্ভাবনাকে বিকশিত করেন এবং ব্যর্থতার পরও নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন।   আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাঁদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত। তবে এ দায়িত্ব পালন করতে হলে শিক্ষককেও হতে হবে দক্ষ, আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রযুক্তিবান্ধব, নৈতিক ও মানবিক। শিক্ষককে যদি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষ আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। আমাদের সমাজে শিক্ষককে ঐতিহাসিকভাবেই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। ‘শিক্ষক জাতির বিবেক’—এই কথাটি আমাদের সামাজিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই সামাজিক মর্যাদার অনেক সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়।   একদিকে শিক্ষককে জাতি গঠনের প্রধান কারিগর বলা হয়, অন্যদিকে অনেক শিক্ষককে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক কাজ, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও নানা সামাজিক চাপ সামলাতে হয়। এতে শিক্ষকতার মূল কাজ—শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীকে সময় দেয়া—ব্যাহত হতে পারে। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, নীতিনির্ধারণ, কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারেন—এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। শিক্ষক যদি আর্থিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে তার পেশাগত মনোযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নানা ধরনের আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজের চাপ, সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্বের মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রয়োজন। শিক্ষকের সম্মানী শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়; এটি শিক্ষার মানে বিনিয়োগ। একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ শুধু বেঞ্চ, চেয়ার, বোর্ড ও ভবনের সমষ্টি নয়। সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ, আনন্দময়, প্রশ্নবান্ধব ও বৈষম্যহীন পরিবেশ। শিক্ষার্থী যেন ভুল করতে ভয় না পায়, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ না করে এবং নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়—এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একইভাবে শিক্ষককেও এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন।   প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ও ভাষা-ল্যাব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ শিক্ষার পরিবেশকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনো শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ক শক্তি। শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব। শিক্ষককে সময়নিষ্ঠ হতে হবে, নিয়মিত পাঠ প্রস্তুতি নিতে হবে, শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষককে শুধু বইয়ের জ্ঞান জানলেই চলবে না। তাঁকে জানতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, মানসিক স্বাস্থ্য, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের প্রয়োজনীয়তা। শিক্ষকদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, পেশাগত নিরাপত্তা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ এবং সামাজিক মর্যাদা। তাঁরা চান না যে শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হোক। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালো মানুষ হলো, কতটা যুক্তিবাদী হলো, কতটা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠল—এসবও শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হোক। একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় কোনো পদোন্নতি, পুরস্কার বা আর্থিক সুবিধা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—একদিন তাঁর কোনো শিক্ষার্থী এসে বলবে, “স্যার, আপনার কথা আমি আজও মনে রেখেছি।”   একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজের জন্য কাজ করছে, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে—তখন সেই আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো অর্জনের তুলনা চলে না। তবে এই মানসিক প্রাপ্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও প্রয়োজন। ভালো কাজের জন্য শিক্ষককে সম্মাননা, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষকতা আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার শিক্ষার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য জানলেই হবে না; তাকে হতে হবে সমস্যা সমাধানকারী, সৃজনশীল, যোগাযোগে দক্ষ, প্রযুক্তিবান্ধব এবং নৈতিকভাবে সচেতন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবেন শিক্ষক। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে শুধু ‘বিষয়ের শিক্ষক’ নয়, বরং শিক্ষার্থীর মেন্টর, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর একটি দিন নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতে হবে, কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে, ন্যায্য সম্মানি নিশ্চিত করতে হবে এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে—তাঁরা শুধু একটি চাকরি করছেন না; তাঁরা একটি প্রজন্ম নির্মাণ করছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিক্ষককে শুধু সম্মান নয়, সম্মানজনক অবস্থান দিতে হবে; শুধু প্রত্যাশা নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগও দিতে হবে; শুধু দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই শিক্ষক দিবসের উদযাপন হবে অর্থবহ, আর শিক্ষার ভবিষ্যৎ হবে আরও আলোকিত।   

অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0

তথ্য অধিকার আছে, তথ্য পাওয়ার অধিকার কতটা কার্যকর

ছবি : বিবিসির সৌজন্যে

মুয়াম্মার গাদ্দাফি : শাসন, ষড়যন্ত্র ও পতন

আত্মহত্যা : নেপথ্যে কারণ, সংকট ও প্রতিকার

বাংলাদেশে বিরল খনিজের সন্ধান : বহু খাতের অর্থনৈতিক বিপ্লবের সম্ভাবনা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সম্ভাব্য উপস্থিতি চিহ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রজুড়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফল বলছে—বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অজানা খনিজ সম্পদের দেশ হিসেবে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে চলেছে।   এ ক্ষেত্রে সোনাদিয়া খনিজ সম্পদের ওপর একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জার্নাল ডিসকভার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টান বিশ্ববিদ্যালয়; এবং বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোঃ সাকাউথ হোসেন, মোঃ শাহরিয়ার রহমান,গোলাম তকি এবং মাফতিহা জাহান। তাঁদের গবেষণা বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপের ভারী খনিজ পদার্থের ভূ-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং রিজার্ভ অনুমান শীর্ষক দ্বীপের নানান দিক অন্বেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এর ভারী খনিজ সম্পদের আয়তন। গবেষকদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক মূল্য এবং লুকানো মজুদের ভূতাত্ত্বিক তাৎপর্য নিম্নরূপ : সোনাদিয়া কক্সবাজার জেলার মহেশখালী থানার ছোট একটি দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় নয় বর্গকিলোমিটারের বিস্তৃত। দ্বীপটি ম্যানগ্রোভ। উপকূলীয় সমন্বয়ে গঠিত এবং এর চারদিকে পানি। এর পৃষ্ঠের নিচে ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল ও মোনাজাইটের মতো ভারী খনিজ পদার্থের মজুদ আছে। সোনাদিয়ায় এই মূল্যবান খনিজ পদার্থের অনুমানিক মজুদ প্রায় ৭ লাখ টন, যার মধ্যে গারনেট ও ইলমেনাইট সবচেয়ে বেশি।   বাংলাদেশে ১৯৮০ দশক থেকে ভূতাত্ত্বিক জরিপের কাজ শুরু হয়। তবে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) প্রায় ২০ বছর ধরে খনিজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে খনিজের সন্ধান পেয়েছেন। জিএসবি গবেষকদের মতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের পাহাড়ি ঢলের আসা পলি, নদী অববাহিকার বালু, জেগে ওঠা চর এবং কয়লা খনি থেকে বিরল বা ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে।   জিএসবির অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, “২০১৬ সালে যুমনা নদীর বালুতে আমরা ভারী আকরিকের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিরল বা ভারী মৃত্তিকা মৌল পেয়েছি। এবং সঙ্গে কিছু মাত্রায় লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম ও থরিয়াম পেয়েছি।” শুধু তা-ই নয়, দেশের সব কটি নদীতেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমনকি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে পাওয়া কয়লা ও ছাইয়েও বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর পরে ধরলা নদীর বালু পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে জিএসপির গবেষকরা স্যামারিয়াম, ইউরেনিয়াম,গ্যাভালিয়াম, টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মত বিরল মৃত্তিকা মৌলের সন্ধান পাওয়া গেছে।   গবেষক মোঃ আলী আকবর বলেন, মূলত বালুতে থাকা খনিজ মোনাজাইট ও জিরকনের সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা মৌলের উপস্থিতি প্রমাণ মিলেছে। প্রতি কেজি বালুতে ৬০ থেকে ১৭৬ মিলিগ্রাম এসব মৌলের উপস্থিতি পেঁয়েছেন। তবে ধরলা নদীতে পাওয়া বিরল খনিজ বাণিজ্যিকভাবে কতটা উত্তোলনযোগ্য, তা জানাতে পারেননি জিএসবি গবেষকরা। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ১০০ মিলিগ্রামের ওপর হলে উত্তোলনযোগ্য হয়। দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়ায় গবেষকরা কয়লা গবেষণা করে দেখেছেন, পোড়া কয়লা ছাইয়ের ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিগ্রাম বিরল খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকরা সোনাদিয়ার বালি গবেষণা করে দেখেছেন ৫১.৫২ শতাংশ গারনেট, ৩৮.১৪ শতাংশ ইলমেনাইট, ৫.৭৪ শতাংশ ম্যাগনেটাইট, ১.০১ শতাংশ জিরকন, ৩.৫৭ শতাংশ রুটাইল এবং ০.১ শতাংশ মোনাজাইট পাওয়া যায়।   বেশ কয়েক বছর যাবৎ স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ে জরিপে ব্রহ্মপুত্র ও যুমনা নদীর বালুতে রুটাইল, গারনেট, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থের উপস্থিতির নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এরপর সোনাদিয়া দ্বীপের টিলাগুলোতে গবেষণা করে দেখা গেছে, ভারী খনিজের পদার্থের ঘনত্ব সমুদ্রের সৈকতের অংশের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলের  তুলনায়। গবেষকদের অনুমান অনুসারে টিলাগুলোতে প্রায় গারনেট ২৭৬,৮৬৮ টন, ইলমেনাইট আছে ১০,২৫,৫৫৮ টন, জিরকন ১৫৮,১১৭ টন, লিউকক্সিন ৯৬৭০৯ টন, ম্যাগনেটাইট ৮০,৫৯৯ টন, মোনাজাইট ১৭৩৫২ টন। তবে উপকূল অঞ্চল ও পশ্চাৎপসরণ অঞ্চলের পরিমাণে তারতম্য রয়েছে।   গবেষণা করে দেখা গেছে যে সমুদ্রের স্রোত, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার  কারণে ক্রমাগত পলি জমা হওয়ার ফলে সোনাদিয়া খনিজ মজুতকে ভবিষ্যতে আরও আশাব্যঞ্জক করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। দেশের প্রয়োজনের তুলনায় আহরণের পরিমাণ খুব কম। এর ফলে দেশের প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, চিনামাটি, তামা, সিলিকা বালু, পারমাণবিক খনিজ পদার্থ জিরকন, মোনাজাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, লিউকক্সিন প্রভৃতি। এ ছাড়া গন্ধক, নুড়িপাথর, খনিজবালি, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ লবণ, কঠিন শিলা, সর্বাপেক্ষা সহজ ও হালকা হাইড্রো- কার্বন মিথেন। আন্তর্জাতিকভাবে ১৭টি মৌলের একটি গ্রুপ হলো বিরল বা ভারী খনিজ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির নামকরণ অনুযায়ী, পর্যায় সারণির ল্যান্থানাইড সিরিজের ১৫টি মৌলের ল্যান্থানাম, সিরিয়াম, প্লাসিয়োডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রমিথিয়াম, স্যারিয়াম, ইউরোপিয়াম, গ্যাডোলিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হোলসিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম,  লুটোশিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম একত্রে বিরাল খনিজ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওসায়েন্স ইনস্টিটিউট সংস্থাটি।   আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প প্রতিরক্ষা খাতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিরল খনিজের ব্যবহার আছে। যেমন মুঠোফোন, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড, টেলিভিশনের এলইডি ডিসপ্লে তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি যেমন লেজার, রাডার, সোলার সিস্টেম, জেট ইঞ্জিন, মিশাইল সিস্টেম, যুদ্ধবিমান, রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বেশ কয়েকটি দেশের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ১৭টি বিরল মৌলের মধো ৮ থেকে ১১টি মৌল বিদ্যমান। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বিরল মৌল নেই। তার মধ্যে বর্তমান বিশ্বে ৮০ শতাংশ খনিজ চীন নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটিতে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ মজুদ আছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্রাজিল, যার মজুদ আছে ২ কোটি ১০ লাখ টন। তা ছাড়া ভারতের ৬৯ লাখ  টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৫৭ লাখ টন, রাশিয়ার ৩৮ লাখ টন, ভিয়েতনামের ৩৫ লাখ টন মজুত আছে। ২০২৪ সালে চীন খনিজ উৎপাদন করেছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন। আমেরিকা উৎপাদন করেছে মাত্র ৪৫ হাজার টন।   বিশ্বের যে সব দেশে খনিজ সম্পদ  আছে এবং উত্তোলনে সক্ষম, সে দেশের অর্থনীতি সাসটেইনেবল। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যারা খনিজের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সৌদি আরবে খনিজ তেল জিডিপির ৫০ শতাংশ অবদান রাখে। রাশিয়ায় জিডিপির ২০ শতাংশ, ইরান জিডিপির ২৩ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে বিশাল অর্থনীতির দ্বার উন্মোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, জিএসবি দেশে আট ধরনের আবিষ্কৃত আর্থিক বাজার মূল্যের হিসাব নিরূপণ করেছে ২ কোটি ২৬ হাজার ১৪০ কোটি ডলার, বাংলা টাকায় কনভার্ট করলে দাঁড়ায় ২৪১.৯৭ ট্রিলিয়ন টাকা।   বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে কয়লা মজুদ আছে, যার পরিমাণ ৭২৫ কোটি টন। যার বর্তমান বাজার মূল্য আসবে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। পিট কয়লা মজুদের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। চুনা পাথর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫২৭ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে ৭৫ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। এভাবে আর অন্য সব খনিজের পরিমাণ যোগ করলে বিশাল পরিমাণ অর্থ দাঁড়াবে।   জিএসবি গবেষকদের মতে, ভারী খনিজ ও অন্যান্য খনিজ  উত্তোলন ও প্রক্রিজাত করা সম্ভব হলে দেশে প্রতিবছর ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। ভারী বা বিরল ও অন্য সব খনিজ গবেষণা ও প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে আনা সম্ভব হলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশে পরিগণিত হবে।  

অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0

প্রকৃতির ভারসাম্যে টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ : ইআইএর ভূমিকা

পথশিশু : ঠিকানাহীন শৈশবের অসমাপ্ত সমীকরণ

প্রবৃত্তির টানে নয়, পবিত্রতার পথে হোক শারীরিক সম্পর্ক

চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের সংকট : একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মূল্যায়ন

বর্তমান বিশ্ব-ভূরাজনীতিতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবস্থান অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে। মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, আজ তার শাসনদণ্ডে আসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। অথচ একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল নির্যাস থেকে এই পার্টির দূরত্ব আকাশচুম্বী। যে রাষ্ট্রকে একসময় বৈশ্বিক শোষিত মানুষের আলোকবর্তিকা মনে করা হতো, তা আজ আন্তর্জাতিক সর্বহারা আন্দোলন এবং বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে প্রায় সম্পূর্ণ নির্বিকার।   মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং লেনিনীয়  তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক চীন আর কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এক নতুন রূপ, যা নিজের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বিশ্ব পুঁজিবাদের পরিকাঠামোকেই টিকিয়ে রাখছে এবং শক্তিশালী করছে।   মার্কসীয় তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের ওপর শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল, যাকে তারা ‘চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি করে, তা মূলত পুঁজিবাদেরই একটি পরিমার্জিত রূপ। ডেন জিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে চীন বিশ্ববাজারের জন্য সস্তা শ্রমের কারখানায় পরিণত হয়েছে। বহুজাতিক পুঁজির অবাধ প্রবেশ এবং দেশীয় পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে সেখানে উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাতের প্রক্রিয়াটি পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের মতোই নির্মম। একটি নামমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে সেখানে কোটিপতির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমিকরা তীব্র শোষণ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর মূল বাণী ছিল বুর্জোয়া শ্রেণির উচ্ছেদ এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। অথচ আধুনিক চীনে বুর্জোয়া শ্রেণিকে পার্টির সদস্যপদ দিয়ে শাসনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে, যা লেনিনীয় পার্টি কাঠামোর সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।   লেনিনের কালজয়ী গ্রন্থ ‘সাম্রাজ্যবাদ : পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’-এর মানদণ্ডে চীনের বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূমিকা বিচার করা অপরিহার্য। লেনিন দেখিয়েছিলেন কীভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ দেশকে উদ্বৃত্ত পুঁজি রপ্তানির দিকে ঠেলে দেয়, যা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জন্ম দেয়। চীনের বর্তমান ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পটিকে এই লেনিনীয় তত্ত্বের আলোকেই বুঝতে হবে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলোতে চীন যে বিশাল অঙ্কের ঋণ ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করছে, তার মূল উদ্দেশ্য বৈশ্বিক শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি বা সমাজতান্ত্রিক সংহতি নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো নিজের উদ্বৃত্ত পুঁজির বিনিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি করা, কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করা এবং নতুন বাজার দখল করা। ঋণফাঁদের এই কূটনীতি মূলত নব্য-সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, যা শোষিত দেশগুলোর শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণিকে পুঁজির নতুন এক আন্তর্জাতিক জাঁতাকলে পিষ্ট করছে।   আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের স্বার্থের প্রতি চীনের এই চরম উদাসীনতা ও নির্বিকার ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নীতির যৌক্তিক পরিণতি। মার্কসবাদ স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করে যে, শ্রমিকের কোনো দেশ নেই এবং মুক্তি কেবল আন্তর্জাতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই সম্ভব। লেনিনও তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল গঠনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সর্বহারা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান চীনা নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে কোনো সমাজতান্ত্রিক বা প্রগতিশীল আন্দোলনকে সমর্থন করা তো দূরের কথা, বরং অনেক দেশে প্রতিক্রিয়াশীল ও নিপীড়ক পুঁজিপতি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। যেখানেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে চীনের স্বার্থের সংঘাত ঘটছে, সেখানে চীন কোনো বিকল্প সমাজতান্ত্রিক আদর্শ তুলে ধরছে না, বরং অন্য একটি পুঁজিপতি শক্তি হিসেবে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে সংকীর্ণ বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা।   শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের চেয়ে চীনের কাছে আজ বড় হয়ে উঠেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং বৈশ্বিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা। চীন আজ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের প্রধান চালিকাশক্তি এবং মার্কিন ও ইউরোপীয় পুঁজির প্রধান অংশীদার। ফলে বিশ্ব পুঁজিবাদের যেকোনো সংকট চীনের নিজস্ব অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। এই আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে চীন কখনোই বিশ্ব পুঁজিবাদের পতন চায় না, বরং এই ব্যবস্থার সংস্কার করে সেখানে নিজের অংশীদারিত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শোষিত মানুষের বৈপ্লবিক চেতনাকে জাগ্রত করার পরিবর্তে চীন তাদের শান্ত রাখার এবং বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই মানিয়ে নেয়ার বার্তা দেয়। এটি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী সারবত্তাকে হরণ করে তাকে একটি নির্জীব, সংশোধনবাদী তত্ত্বে রূপান্তর করার শামিল।   পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে চীন যে ক্ষমতার প্রদর্শন করছে, তা সর্বহারা শ্রেণির ক্ষমতা নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পুঁজির ক্ষমতা। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন সর্বহারা শ্রেণির অগ্রগামী দল নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে।   বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ যখন মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও করপোরেট শোষণে জর্জরিত, তখন চীনের মতো একটি বিশাল শক্তির এই নির্বিকার ও সুবিধাবাদী ভূমিকা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য এক বড় ধাক্কা। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই সত্যকে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি যে, লাল পতাকার আড়ালে লুকানো এই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ কোনোভাবেই বিশ্ব মুক্তিকামী মানুষের বন্ধু হতে পারে না। সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে বৈশ্বিক সর্বহারা শ্রেণিকে চীনের এই সংশোধনবাদী ও নব্য-সাম্রাজ্যবাদী রূপকে চিনে নিয়েই নতুন করে বিপ্লবের পথ অন্বেষণ করতে হবে।  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

ছাদবাগান : গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিস্তারের উপায়

খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি : ৫৬ বছরের পথচলা ও আগামীর প্রত্যয়

গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া এবং আমাদের বাস্তবতা

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

বিশ্ব শিক্ষক দিবস : দায়িত্ব, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0