Breaking news
উপসম্পাদকীয়

আঙিনার সবজি বাগান : পুষ্টি, সাশ্রয় ও স্বাবলম্বিতার হাতছানি

গাজী আরিফ মান্নান
গাজী আরিফ মান্নান শিক্ষক ও শিশুসাহিত্যিক, ফেনী
আগস্ট ১৪, ২০২৬ • 0

‘শাকসবজি করলে চাষ, আয় আসবে বারমাস’। — গ্রামবাংলার এই পরিচিত কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের পুষ্টি, সুস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সহজ সূত্র। বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে বাড়ির আঙিনা বা পতিত জমিতে শাকসবজি চাষ হতে পারে একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।

 

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশেই কিছু না কিছু খালি জায়গা পড়ে থাকে। সামান্য পরিকল্পনা, অল্প পুঁজি এবং কিছুটা শ্রমের মাধ্যমে এসব জায়গায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করা সম্ভব। এতে পরিবারের সারা বছরের সবজির চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হয়। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগও সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একটি ছোট সবজি বাগান একই সঙ্গে পুষ্টি, সাশ্রয় ও আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

 

আমার শৈশবের একটি স্মৃতি আজও উজ্জ্বল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমার মা বাড়ির চারপাশের খালি জায়গায় মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চাল কুমড়া, কলমি শাক, পালং শাক, ডাঁটা শাক, কচুশাক, শিম, ঢেঁড়স, মরিচ, বেগুন, করলা, টমেটো, পেঁপে, কচু ও অন্যান্য মৌসুমি সবজি চাষ করতেন। বছরের অধিকাংশ সময় আমাদের বাজার থেকে সবজি কিনতে হতো না। উৎপাদিত সবজি ছিল টাটকা, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে তেল, লবণ, পেঁয়াজ, চিনি কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা হতো। আজ বুঝতে পারি, সেটি ছিল একটি আত্মনির্ভরশীল পরিবারের বাস্তব চিত্র।

 

দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে অনেক বাড়িতে খালি জায়গা থাকলেও শাকসবজি চাষে আগ্রহ কমে গেছে। ফলে পরিবারের খাদ্য ব্যয় বেড়েছে, পুষ্টির ঘাটতিও দেখা দিচ্ছে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয়ে পুরো পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ বাড়ির আঙিনায় অল্প পরিসরে সবজি চাষ করলে মাসিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ সহজেই কমানো সম্ভব।

 

বর্তমানে বাজারে অনেক সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব সবজি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে নিজের উৎপাদিত শাকসবজি হয় টাটকা, নিরাপদ এবং অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন। ফলে পারিবারিক সবজি বাগান শুধু অর্থ সাশ্রয়ের নয়, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করারও একটি কার্যকর উপায়।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এসব প্রশিক্ষণে মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ, উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, রোগবালাই দমন, জৈব সার ব্যবহার এবং নিরাপদ কীটনাশক প্রয়োগ সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া হয়। এমন একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে আমিও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে আত্মীয়স্বজনদের মাঝেও সেই সবজি বিতরণ করতে পেরেছি। নিজের উৎপাদিত টাটকা সবজি খাওয়ার আনন্দ সত্যিই অনন্য।

 

দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষি অফিস রয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাঁদের সহযোগিতা নিয়ে উন্নত মানের বীজ ব্যবহার, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে ফলন যেমন বাড়বে, তেমনি উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। তাই কৃষকদের উচিত কৃষি বিভাগের সেবা আরও বেশি গ্রহণ করা।

 

বেকার যুবকদের জন্যও শাকসবজি চাষ হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থান। অল্প পুঁজি ও স্বল্প জায়গায় লাভজনকভাবে সবজি উৎপাদন সম্ভব। প্রয়োজন শুধু প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ। এতে তাঁরা আত্মকর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন।

 

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে প্রতিটি পরিবারের উচিত অন্তত নিজেদের খাদ্যের একটি অংশ নিজেই উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া। বাড়ির আঙিনায় একটি ছোট সবজি বাগান হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ এবং স্বাবলম্বী জীবনের সূচনা।

 

পরিশেষে বলা যায়, পারিবারিক শাকসবজি চাষকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যম যদি এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করে, তাহলে দেশের প্রতিটি পরিবারই পুষ্টিতে সমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হতে পারবে। কৃষির উন্নয়নই পারে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

 

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া এবং আমাদের বাস্তবতা

আইনের চোখে বিচারপূর্ব প্রত্যেক মানুষই নির্দোষ। অথচ আমাদের দেশে পেশাদার শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী কিংবা সাধারণ নাগরিকদের প্রায়ই হাতকড়া পরিয়ে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নেয়ার দৃশ্য নিয়মিত গণমাধ্যমে দেখা যায়, যা দৃষ্টিকটু ও চরম অপমানজনক।   ফৌজদারি কার্যবিধি বা পেনাল কোডে প্রতিটি গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া পরানো বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় এবং পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলের (পিআরবি) নির্দেশনা অনুযায়ী, হাতকড়ার ব্যবহার একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। এটি কেবল তখনই ব্যবহারযোগ্য, যখন আসামি অত্যন্ত হিংস্র, দুর্ধর্ষ অপরাধের সাথে জড়িত কিংবা পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।   অন্যদিকে নারী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণকারী বা জামিনযোগ্য অপরাধের আসামিদের ক্ষেত্রে হাতকড়া পরানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সর্বোচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে—গ্রেপ্তার মানেই আসামির ওপর অমানবিক বলপ্রয়োগ বা শাস্তিমূলক আচরণ নয়। অথচ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এই আইনি মারপ্যাঁচ বা ত্বরিত পদক্ষেপের নামে একধরনের সামাজিক হেনস্তা করা হয়।   বিচার নিশ্চিত করার আগেই অভিযুক্তকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মনে রাখতে হবে, আইনের প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান ও মানবাধিকার রক্ষা করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাতকড়া কোনো শাস্তির হাতিয়ার নয়, এটি কেবল নিরাপত্তার একটি বিশেষ ব্যবস্থা। তাই পেশাদার মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রেখে পুলিশ প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও আইনানুগ হতে হবে।    

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0

‎‎নৈতিকতা, মানবতা ও শান্তির অনন্য আদর্শ‎ মহানবি (সা.)

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকারত্ব সংকট : পরিবর্তনের এখনই সময়

প্রবীণ দিবসে প্রবীণের ভাবনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই : উপকূলের বাঁচা-মরার প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাবে আজ বিশ্বজুড়ে সংকট ঘনীভূত। এ সংকট উত্তরণে কার্বন নির্গমন কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সম্প্রতি বৈশ্বিক কর্মসূচি ‘গ্লোবাল উইক অব অ্যাকশন’-এর অংশ হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং আসন্ন কপ-৩১ এর প্রাক্কালে বরগুনার তিন উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো এক সুধী ও প্রতিবাদী মানববন্ধন। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই’—এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে বরগুনা সদর, পাথরঘাটা ও তালতলীর জনপদ।   ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’, ওয়াটার কিপারস বাংলাদেশ, ধ্রুবতারা ইউথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনসহ স্থানীয় বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি কেবল একটি সাধারণ মানববন্ধন ছিল না; এটি ছিল উপকূলীয় মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। বরগুনা সদর রোড, পাথরঘাটার সোনালী বাজার এবং তালতলীর শুভ সন্ধ্যায় হাজারও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সাধারণ মানুষ এখন পরিবেশ ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি আর দেখতে চায় না।   মানববন্ধনে বক্তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে কিছু সময়োপযোগী দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অর্থায়ন অবিলম্বে বন্ধ করা, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য তহবিল নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়ন। বক্তারা বলেন, উপকূলীয় জেলা বরগুনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজ মারাত্মক ঝুঁকিতে। অথচ ধনী দেশগুলোর অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহারের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের।   পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। বরগুনার এই মানবিক ও পরিবেশবাদী আন্দোলন প্রমাণ করে, দেশের প্রান্তিক জনপদের মানুষ আজ জলবায়ু ন্যায্যতা ও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো আমলে নেয়ার। জীবাশ্ম জ্বালানির অন্ধকার যুগ পেরিয়ে একটি সবুজ, নির্মল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।     মোঃ সাইফুল ইসলাম  সোহেল অ্যাডভোকেট জেলা আইনজীবী সমিতি বরগুনা এবং বিশেষ সংবাদদাতা  দৈনিক শেষ কথা, বরগুনা

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0

ডেঙ্গু : মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নাকি আমাদের উদাসীনতার বিরুদ্ধে

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

বিশ্বব্যাপী কমছে সুপেয় পানি : আমরা কতটুকু প্রস্তুত

বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যে প্রজন্ম

একসময় বিকেল নামলেই ছেলে-মেয়েদের হাতে দেখা যেত বই। কেউ গল্পের বই নিয়ে বারান্দায় বসত, কেউ পরীক্ষার পড়া শেষ করে ডুবে যেত কোনো উপন্যাসের পাতায়। বইয়ের পাতার শব্দে, কাগজের গন্ধে, চরিত্রগুলোর সঙ্গে কল্পনার ভ্রমণে কেটে যেত দীর্ঘ বিকেল। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। হাতে বইয়ের বদলে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন। চোখ আটকে থাকে ছোট্ট একটি পর্দায়, আর আঙুল ছুটে চলে এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে।   প্রযুক্তির এই সময়কে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কয়েক সেকেন্ডেই পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য দরজাও খুলে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তথ্যের এত দরজা খুলে যাওয়ার পরও আমরা কি বইয়ের দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিচ্ছি?   সমস্যাটি শুধু বই না পড়ার নয়; সমস্যাটি মনোযোগ হারানোরও। একটি বই পড়তে হলে দীর্ঘ সময় একই জায়গায় মন রাখতে হয়। একটি চরিত্রের সঙ্গে হাঁটতে হয়, একটি ঘটনার ভেতর ঢুকতে হয়, কখনো লেখকের একটি বাক্য নিয়ে থেমে ভাবতে হয়। বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট আমাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নতুন কিছু দেখার অভ্যাস তৈরি করছে। ফলে ধৈর্য ধরে দীর্ঘ লেখা পড়ার মানসিকতা অনেকের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।   আজকের তরুণের হাতে তথ্যের অভাব নেই। বরং তথ্যের আধিক্যই কখনো কখনো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্চ করলেই উত্তর পাওয়া যায়, ভিডিও দেখলেই কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যায়। কিন্তু তথ্য জানা আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। তথ্য আমাদের জানায় ‘কী’; বই অনেক সময় আমাদের ভাবতে শেখায় ‘কেন’ এবং ‘তারপর কী’।   বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। একটি ভালো উপন্যাস শুধু গল্প বলে না; মানুষের মন বুঝতে শেখায়। একটি ইতিহাসের বই শুধু অতীতের ঘটনা জানায় না; বর্তমানকে বোঝার চোখ তৈরি করে। একটি দর্শনের বই সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। আর কবিতার একটি পঙক্তি কখনো কখনো এমন অনুভূতির দরজা খুলে দেয়, যার অস্তিত্ব আমরা নিজের মধ্যেই আগে টের পাইনি।   পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও কিছু ভূমিকা আছে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বই মানেই পরীক্ষার বই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়া যেন অতিরিক্ত কাজ। পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার চাপ, কোচিং, অ্যাসাইনমেন্ট এবং নানা ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে আনন্দের জন্য বই পড়ার সময়টুকু হারিয়ে যায়। অথচ শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম হয়, তাহলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।   পরিবারের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু বই পড়বে কি না, তা শুধু তার ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে না। সে যদি ঘরে বড়দের বই পড়তে দেখে, বই নিয়ে আলোচনা শোনে, তাহলে তার মধ্যেও পাঠের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পরিবারের সবাই যদি অবসর পেলেই মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে, শিশুর কাছে বইকে আকর্ষণীয় করে তোলা কঠিন।   তবে প্রযুক্তিকে বইয়ের শত্রু হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। বরং প্রযুক্তিকে বইয়ের সহযোগী করা সম্ভব। এখন ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও ডিজিটাল প্রকাশনার মাধ্যমে বই পড়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি। একজন চাইলে নিজের মোবাইল ফোনেই হাজার হাজার বই বহন করতে পারে। প্রয়োজন শুধু ব্যবহারের অভ্যাসটি বদলানো।   প্রশ্ন হলো, আমরা দিনে কত সময় পর্দার দিকে তাকাই এবং তার কতটুকু সময় বইয়ের জন্য রাখি? দশ মিনিটের একটি ভিডিও দেখতে দেখতে কখন যে এক ঘণ্টা চলে যায়, আমরা অনেক সময় টেরই পাই না। অথচ দশ মিনিট বই পড়তে বসলে ঘড়ির কাঁটা যেন হঠাৎ ধীর হয়ে যায়। এই অভ্যাসের পরিবর্তনটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হতে পারে।   প্রতিদিন মাত্র পনেরো বা বিশ মিনিট বই পড়া দিয়ে শুরু করা যায়। প্রথমে হয়তো মন বসবে না। কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই মোবাইল হাতে নিতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু অভ্যাস তৈরি হলে বইয়ের জগৎ ধীরে ধীরে নিজের দরজা খুলে দেয়। তখন বই পড়া আর দায়িত্ব মনে হয় না; বরং দিনের কোলাহল থেকে কয়েক মুহূর্তের আশ্রয় হয়ে ওঠে।   একটি প্রজন্ম কোন বই পড়ছে, তা দিয়ে শুধু তার সাহিত্য রুচি বোঝা যায় না; বোঝা যায় সে পৃথিবীকে কীভাবে দেখতে শিখছে। বই মানুষের ভেতরের জন্য জায়গা তৈরি করে। যে মানুষ কোনো গল্পের চরিত্রের দুঃখে কাঁদতে পারে, সে বাস্তব জীবনের মানুষের কষ্টও হয়তো একটু গভীরভাবে অনুভব করতে শেখে।   তাই বই থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে শুধু লাইব্রেরির একটি তাক থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। কখনো কখনো এর অর্থ হতে পারে নিজের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের একটি দরজা বন্ধ করে দেয়া। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন পৃথিবী আমাদের ক্রমাগত কথা শোনাচ্ছে; বই আমাদের সেই ভিড়ের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরব হতে শেখায়।   হয়তো আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনটি সরিয়ে ফেলতে হবে না। শুধু তার পাশে একটি বই রাখতে হবে। স্ক্রল করার ফাঁকে একদিন যদি আমরা একটি পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর দুটি, তারপর দশটি, তাহলেই হয়তো পরিবর্তনের শুরু। কারণ, বই কোনো পুরোনো অভ্যাস নয়। বই এমন এক নীরব বন্ধু, যে আমাদের সময় নেয় ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় একটি গভীরতর মন, বিস্তৃততর পৃথিবী এবং নিজের ভেতর তাকানোর সাহস।  

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণ

পে-স্কেল : বেতন বাড়লেই কি মানুষ ধনী হয়ে যায়

সৌরবিদ্যুতেই মিলবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া এবং আমাদের বাস্তবতা

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0